নটবরবাবু মোটেই উত্তেজিত হলেন না। শান্তভাবে সোমনাথকে বললেন, “এ-লাইনে কে ভদ্রলোকের ছেলে নয়, বলুন? আমি, শ্রীধরজী, মিস্টার গোয়েঙ্কা সবাই। ভদ্দরলোকের ছেলেরাই তো এদেশের পলিটিকস, গভরমেন্ট এবং বিজনেস চালাচ্ছে। শুনেন মশাই, আমি যে প্রপোজাল গোয়েঙ্কার কাছে দিয়ে এসেছি তার মধ্যে একটুও অভদ্রতা নেই—যস্মিন, দেশে যদাচার, কাছা খুলে নদী পার।”
“অসম্ভব, দাঁতে দাঁত চেপে সোমনাথ বললো। অন্য কেউ হলে এতোক্ষণ লোকটার থ্যাবড়া নাকে এক ঘষি বসিয়ে দিতো সোমনাথ।
নিজেকে বহু কষ্টে শান্ত করে সোমনাথ বললো, “এসব নোংরামির মধ্যে আমাদের বংশে কেউ কখনও থাকেনি। আপনি লোকটাকে এখনই বারণ করে দিন।”
মুখের হাসি বজায় রেখে নটবরবাবু বললেন, “লাও বাবা! যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর! যাকগে। বলা যখন হয়ে গেছে, তখন চারা নেই। গোয়েঙ্কা যেদিন আপনাকে ফোন করে জানাবেন আসছেন, টেলিফোনে সোজাসুজি বলে দেবেন—আপনি ব্যস্ত আছেন, সন্ধ্যেবেলায় কোনোরকম কো-অপারেশন করতে পারবেন না। তাহলে গোয়েঙ্কাজী বুঝে নেবেন।”
সোমনাথ আর এক মুহূর্তও দেরি না করে নটবরবাবুর অফিস থেকে বেরিয়ে এলো। রাগে তার সর্বশরীর জলছে।
কিন্তু যার কোনো মুরোদ নেই, তার শরীর জললে দুনিয়ার কী এসে যায়? যে সাপের বিষ নেই, তার কুলোপানা চক্করে কে ভয় পাবে—মা বলতেন। কোন দিকে যায় সোমনাথ? ইচ্ছে করছে, কোথা থেকে যদি একটা এটম বোমা পাওয়া যেতো মন্দ হতো না—চানক সাহেবের এই জারজ সৃষ্টির ওপর বোমাটা ফেলে দিতো সোমনাথ। চিরদিনের মতো সমস্যার সমাধান হতো। কিন্তু শক্তি কোথায়? এটম বোমা তো দুরের কথা, কলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে দ-একটা হারামজাদার গালে থাপড় মারবার মতো সাহসও ঈশ্বর দেননি সোমনাথকে।
মনের ঠিক এমন অবস্থার সময় সেনাপতি ডাকলো, “বাবু আপনার ফোন।”
“হ্যালো, আমি তপতী বলছি।”
তপতী আর ফোন করবার সময় পেলো না? সোমনাথের গম্ভীর গলা শোনা গেলো, “বলো।”
“একটু আগেও তোমাকে ফোন করেছিলাম—শুনলাম, তুমি কোন এক মিস্টার নটবর মিত্রের অফিসে গিয়েছে।”
“অনেক কাজ-কর্ম থাকে, তপতী।” ওর প্রশ্নটা সোমনাথ এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলো।
তপতী বললো, “কই সেদিনের পর তুমি তো আমার খোঁজ করলে না?”
কী বলবে সোমনাথ? শেষ পর্যন্ত উত্তর দিলো, “তপতী, কয়েকজন ভদ্রলোকের সঙ্গে মিটিং চলছে—ওঁরা বসে রয়েছেন। পরে একদিন দেখা করা যাবে।”
“কাল আমি থাকছি না। শ্রীরামপুরে যাচ্ছি। অলমোস্ট যেতে বাধ্য হচ্ছি। পরশ, তোমার ওখানে যাবো। দেখা হলে, সব বলবো। বেশ সিরিয়াস।”
ফোন নামিয়ে রাখলো সোমনাথ। ইংরাজী ও বাংলা তারিখ মেশানো ক্যালেন্ডারটা দেওয়ালে সামনেই ঝলছে। পরশ, ১৬ই জন। অর্থাৎ ১লা আষাঢ়।
২১. জন্মদিনটা আনন্দের কেন
জন্মদিনটা আনন্দের কেন, এই প্রশ্ন সোমনাথের আগে প্রায়ই মনে হতো। জন্মগ্রহণ করে শিশ, তো কাঁদে-তার সমস্ত জীবনের দুঃখ ও যন্ত্রণার সেই তো শুর। তবু সবাই বলে জন্মদিনে আনন্দ করতে হয়। অনেকদিন আগে মাকে এই প্রশ্ন করেছিল সোমনাথ। “জন্মদিনে আমি তো তোমায় অনেক কষ্ট দিয়েছিলাম, তবু তুমি ১লা আষাঢ়ে আনন্দ করো কেন?”
মা বলেছিলেন, “তুই চুপ কর। অন্যদিন হলে তোকে বকতাম।” জন্মদিনে ম কাউকে বকতেন না। বরং পায়েস রাঁধতেন।
তারপর এই বাড়িতে ১লা আষাঢ়ের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। জন্মদিনেই একদিন মৃত্যুর ঘন অন্ধকার নেমে এসেছিল যোধপর পার্কের বাড়িতে। ১লা আষাঢ় এখন শুধু সোমনাথের জন্মদিন নয়, মায়ের মৃত্যুদিবসও বটে।
আজ যে সোমনাথের জন্মদিন তা কে আর মনে রাখবে? ভোরবেলায় বিছানায় শুয়ে শয়েই ভাবছিল সোমনাথ। কবে কোনকালে উজ্জয়িনীর প্রিয় কবি আপন খেয়ালে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসকে কাব্যের মালা পরিয়ে অবিস্মরণীয় করেছিলেন। তারই রেশ তুলে বহু শতাব্দী পরে আজ ঘরে ঘরে বিরহ-মিলনের রাগিণী বেজে উঠবে। একই, পরে রেডিওতে মহাকবি ও তাঁর সষ্টি অমর চরিত্রের উদ্দেশে সংগীতাঞ্জলি শুরু হবে। কিন্তু কে মনে রাখবে, বেকার ব্যর্থ কবি সোমনাথ ব্যানার্জি ওই একই দিনে পৃথিবীর আলো দেখেছিল? ছন্দের মন্ত্র পড়ে প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসাকে সেও অমরত্ব দিতে চেয়েছিল।
জন্মোৎসবের আগের দিন থেকেই কত লোকের বাড়িতে অভিনন্দনের পালা শুরু হয়ে যায়। ফল আসে, ফোন আসে, রঙীন টেলিগ্রাম পৌঁছে দিয়ে যায় ডাকঘরের পিওন। কিন্তু সোমনাথের ভাগ্যে এসেছে দুঃসংবাদের ইঙ্গিত। হীরালাল সাহা যে দ-হাজার টাকা নিয়েছিল লাভ সমেত কালকেই তা ফেরত দেবার কথা ছিল। বউদিকে সোমনাথ একটা ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছিল—১লা আষাঢ় তার একটা প্রীতি উপহার পাবার সম্ভবনা আছে। সোমনাথ এবার কোনো প্রতিবাদই শনবে না। কমলা বউদি বলেছিলেন, “বেশ। যদি সুখবর সত্যিই কিছু থাকে—নেবো তোমার উপহার। তোমার দাদাকেও শিক্ষা দেওয়া হবে। ভাবছেন, উনি ছাড়া আমাকে কেউ উপহার দেবার নেই।” কিন্তু গতরাত্রে হীরালালকে কিছুতেই খুঁজে পায়নি সোমনাথ। তিনবার অফিসে গিয়েও দেখা হলো না।
ভোরবেলায় বুলবুল একবার কী কাজে ঘরে ঢুকলো। সে কিন্তু কিছুই বললো না। সোমনাথের আজ যে জন্মদিন তা মেজদার বালিকাবধটি খবরও রাখে না। মেজদা যে সামনের সেপ্টেম্বরে অফিসের কাজে বিলেত যেতে পারে, সেই খবরটাই বুলবুল নিয়ে গেলো। বললো, “আমি ছাড়ছি না। যে করে হোক আমিও ম্যানেজ করবো বিলেত যাওয়াটা।”
