কিন্তু নটবর মিত্তির হবে না সোমনাথ। নিজের কাছে সে ছোট হতে পারবে না।
তবে ভদ্রতা করতে পারে সোমনাথ। কলকাতায় ফিরে এসে গোয়েঙ্কাজীর বাড়িতে সোমনাথ একটা ফোন করে দিলো।
কয়েকদিন পরে গোয়েঙ্কাজীর সঙ্গে দেখা হলো। ধন্যবাদ জানিয়ে গোয়েঙ্কাজী বললেন, “ঝিকে পৌঁছে দিয়েছেন এই যথেষ্ট—আবার কষ্ট করে ট্রাঙ্ককলে জানাবার কী প্রয়োজন ছিল?”
সোমনাথ বললো, “ভাবলাম, ভাবীজী দুশ্চিন্তা করবেন।”
গোয়েঙ্কাজীর ঘরে ফিরিঙ্গী টাইপিস্টকে দেখতে পাচ্ছে না সোমনাথ। গোয়েঙ্কাজী খবর দিলেন, “চাকরি ছেড়ে পালিয়েছে।” তারপর ফিক করে হেসে বললেন, “গাড়িতে আপনি কিছু করেছিলেন নাকি সেদিন? সেই যে আপনার সঙ্গে কলকাতায় গেলো, তার পরের দিনই রেজিগনেশন।”
নোংরা কথায় কান লাল হয়ে উঠেছিল সোমনাথের। দাদার থেকেও বয়সে বড় লোকটা। গোয়েঙ্কাজী বললেন, “আরে ভয় পাচ্ছেন কেন? এমনি রসিকতা করলাম। আমাদের মিল কলকাতা থেকে এতো দূর যে ভালো লেডি-টাইপিস্ট আসতেই চায় না।”
চুপ করে রইলো সোমনাথ। গোয়েঙ্কাজী বললেন, “আপনি তো অনেক বড় বড় অফিসে ঘোরেন। আজকাল নাকি গাউন-পরা মেমসায়েব রাখা আর ফ্যাশন নয়? বড় বড় কোম্পানিরা নাকি এখন শাড়ি-পরা সেক্রেটারী রাখছে?”
হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। এসব খবর তো সোমনাথ রাখে না।
বললো, “সে-রকম তো কিছু শুনিনি। দ-রকম মহিলাই তো অফিসে কাজ করেন।”
গোয়েঙ্কাজী হেসে বললেন, “আপনি তাহলে অফিসে গিয়ে কোনো স্টাডি করেন না। গাউন-পরা মেমসায়েবদের ডিমান্ড খুব কমে গেছে। আপনাদের লাইনে এক ভদ্রলোকের কাছে আমি খবরটা পেয়েছি, নাম মিঃ নটবর মিটার।”
“চেনেন ওঁকে সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো। পরিচিত একটা নাম শুনে সোমনাথ কিছুটা ভরসা পাচ্ছে।
“মিস্টার মিটার দু-একবার আমার এখানে এসেছিলেন—ওঁর এক বন্ধুর কাজে। ভারি আমুদে মানুষ। একেবারে সুপার সেলসম্যান।”
সোমনাথ ওসব কথায় আগ্রহ দেখালো না। বরং টাকার কথা তুললো। বললো, “আপনার ওপর তো ইনকাম ট্যাক্সের ভীষণ চাপ।”
এই ব্যাপারে সহানুভূতি পেয়ে খুশী হলেন গোয়েঙ্কা। বললেন, “গভরমেন্ট ডাকাতি করছে—টাকায় সত্তর পয়সা কেটে নিলে, কাজকর্মে মানুষের কোনো উৎসাহ থাকতে পারে?”
সোমনাথ বললো, “লোকের ধারণা বড় বড় পোস্টে আপনারা খুব সুখে আছেন। অথচ মোটেই তা নয়!”
এরপর গোয়েঙ্কাজী হয়তো কিছু টাকার কথা তুলতেন। কিন্তু সোমনাথকে এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না। হাজার হোক সামান্য চেনা।
গোয়েঙ্কার ওপর সোমনাথ বিরক্ত হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ে ভদ্রতা রেখে চলতেই হবে। মিস্টার মাওজী বললেন, বড় পার্টি হলে, একটু-আধট, এনটারটেন করবেন। সোমনাথ তাই গোয়েঙ্কাকে বললো, “কলকাতায় এলে দয়া করে একটা ফোন করে দেবেন। যদি সুযোগ দেন কোথাও লাঞ্চে যাওয়া যাবে।”
এবার বেশ বকুনি খেলো সোমনাথ। কারণ গোয়েঙ্কা মুখের ওপর জানিয়ে দিলেন তিনি মাছ মাংস খান না-ড্রিঙ্কও ভালোবাসেন না। সুতরাং তাঁকে নেমন্তন্ন করে লাভ নেই। বরং অসুবিধে।
বিদায় দেবার আগে গোয়েঙ্কাজী বললেন, “যদি জানাশোনা ভালো কোনো লেডি সেক্রেটারী থাকে রেকমেন্ড করবেন। শাড়ি-পরা বেঙ্গলী সেক্রেটারী রাখতেও আমাদের কোনো আপত্তি নেই।”
সোমনাথের বেশ অস্বস্তি লাগলো। চাকরি না পেয়ে যে-জগতের মধ্যে সোমনাথ ঢুকতে চেষ্টা করছে সে-সম্পর্কে বাঙালীদের কোনো জ্ঞান নেই। বিজনেস সম্পর্কে এতোদিন একটা অস্পষ্ট ধোঁয়াটে ধারণা ছিল সোমনাথের। বিজনেস এমন জিনিস যা বাঙালীরা পারে না। কারণ তাদের ধৈর্য নেই। সোমনাথ এখন বুঝেছে, হাজার রকমের বিজনেস আছে। কিন্তু যে-বিজনেসের জগতে সে পা ফেলবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে, তার মধ্যে দীর্ঘদিনের নোংরা ষড়যন্ত্র রয়েছে। বিজনেসের অনেক রহস্যই বংশানুক্রমিকভাবে গোপন রাখা হয়—একান্ত—আপনজন ছাড়া কেউ জানতে পারে না।
নটবর মিত্রকে সোমনাথ এবং আদকবাবু যতই অপছন্দ করক ভদ্রলোক অতো ভিতরের অনেক খবর ফাঁস করে দিয়েছেন যা সারা জীবন বাহাত্তর নম্বর ঘরের এগারো নম্বর টেবিলে বসে থাকলেও সোমনাথ জানতে পারতো না।
মিস্টার গোয়েঙ্কার ব্যাপারেও নটবরবাবু বোধহয় কিছু সাহায্য করতে পারেন।
১৯. গলার টাইটা কয়েক ইঞ্চি ঢিলে করে
গলার টাইটা কয়েক ইঞ্চি ঢিলে করে নটবর মিত্তির নিজের অফিসে বসেছিলেন।
সোমনাথকে দেখেই একগাল হেসে নটবর মিত্তির বললেন, “আসন মিস্টার ব্যানার্জি। মুখ দেখেই বুঝতে পারছি কিছু হচ্ছে না। কতকগুলো হরিয়ানী পাঞ্জাবী রাজস্থানী সিন্ধি ডাকাত বিজনেসের নাম করে সোনার বাংলাকে লুটেপটে খেলে। আমরা তো শুধু আঙুল চুষেচুষেই দিন কাটিয়ে দিলাম।”
সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো, “আপনি মিস্টার গোয়েঙ্কাকে চেনেন?”
“বিজনেসে রয়েছি, এই কলকাতায় অন্তত দেড়শ’ গোয়েঙ্কাকে চিনি। আপনি কার কথা বলছেন?”
সোমনাথ পরিচয় দিলো। নটবর একগাল হেসে বললেন, ‘মহাত্মা মিলস-এর সদশন গোয়েঙ্কার কথা বলছেন? লাল, জামাইবাবুর মতো চেহারা তো?”
হো-হো করে হাসলেন নটবর মিত্তির। “আপনি বুঝি ওখানেও মাল বেচবাবু চেষ্টা করছেন?”
“কেন পাটি খারাপ নাকি?” নটবর মিত্রের কথার ধরনে সোমনাথ চিতায় পড়ে গেলো।
“পাটি খারাপ হতে যাবে কোন দুঃখে? তবে বড় শক্ত ঘাঁটি।” টাই-এর ফাঁসটা আরও আলগা করে নটবর মিত্তির বললেন, “আমার এক পাটি ওখানে ফেসে গিয়েছিল। কিছুতেই সুবিধে করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত পাঁচশ’ টাকা ফরনে আমাকে পাঠালো। আমি অনেক কষ্ট করে দু-তিনবার ট্রাই নিয়ে একদিন ড্রিংকসের টেবিলে গোয়েঙ্কাকে ফেললাম। তবে কাজ হাসিল হলো।”
