সেনগুপ্ত বললেন, “উনি নিজে মস্ত লোক নন—ওঁর শ্বশুর মিস্টার কেজরিওয়াল মত্ত লোক। ওঁদেরই মিল—গোয়েঙ্কাজীকে বছর কয়েক হলো বড় পোস্টে বসিয়ে দিয়েছেন। আপনি চেষ্টা করুন—আপনার জিনিসটা আমাদের মিলে অনেক প্রয়োজন হয়। তাছাড়া কেজরিওয়ালদের আর একটা মিলের মালপত্র গোয়েঙ্কাজী কেনেন।”
গোয়েঙ্কা লোকটি সুদর্শন। এয়ারকুলার লাগানো ঘরে পাতলা আন্দির পাঞ্জাবি ও ধুতি পরে তিনি বসে আছেন। পাকা মতমান কলার মতো গায়ের রং, টিয়াপাখির মতো টিকলো নাক। ভদ্রলোকের দেহে বাড়তি মেদ নেই বরং একটু রোগার দিকেই। বয়স বছর চল্লিশ।
ওঁর সঙ্গে সোমনাথের দেখা হয়ে গেলো। ঘরের একদিকে একটা কালো রোগা অ্যাংলোইন্ডিয়ান মেয়ে-টাইপিস্ট নিজের কাজ করছে। সোমনাথ বললো, “আপনার অমূল্য সময় নষ্ট করবো না, স্যর। শুধু রেসপেক্ট জানাতে এসেছি।”
টেলিফোনে সেনগুপ্তের কাছে বিষয়টা শুনেছেন গোয়েঙ্কাজী! গালের পান সামলাতে সামলাতে বললেন, “মালের রিপোর্ট কী রকম হয় দেখা যাক।”
কেমিক্যালসের ধারেই গেলো না সোমনাথ। বললো, “ওসব আপনার হাতে রইলো, মিস্টার গোয়েঙ্কা। আপনার এতো নাম শুনেছি।”
“কোথায় আমার নাম শুনলেন?” বেশ খুশী হয়ে গোয়েঙ্কা প্রশ্ন করলেন। দামী ফরাসী সেন্টের গন্ধে ঘরটা ভুরভুর করছে।
সোমনাথ বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। তারপর কোনোরকমে বললো, “আপনার নাম কে না জানে? ভালো জিনিসের কদর দেন আপনি—অজানা কোম্পানির নতুন মাল বলে ছড়ে ফেলে দেন না। তাই তো কলকাতা থেকে ছুটে আসতে সাহস পেয়েছি।”
গোয়েঙ্কাজীর দিকে দামী সিগারেট এগিয়ে দিলো সোমনাথ। উনি একটা সিগারেট তুলে নিলেন। পানের ঢিবিটা বাঁদিক থেকে গালের ডানদিকে ট্রান্সফার করলেন। তারপর বললেন,
কলকাতা থেকে দূরত্বটাই আমাদের মুশকিল।
“এমন কি আর দর, মিস্টার গোয়েঙ্কা? ফরেনে চল্লিশ মাইল কিছু নয়!” স্রেনাথ এতোক্ষণে একটা আলোচনার বিষয় পেয়েছে।
“কিন্তু রাস্তার যা-অবস্থা। এইটুকু পথ যেতেই সমস্ত দিন নষ্ট হয়ে যাবে,” মিস্টার গোয়েঙ্কা বললেন।
“অথচ মিউনিসিপ্যালিটি এবং গভরমেন্ট রাস্তা মেরামতের জন্যে আপনাদের কাই থেকে মোটা টাকা আদায় করছে। সোমনাথ বললো।
“সে-সব টাকা যে কোথায় যায়। গোড্ এলোন নোজ।” সোমনাথের সহানুভূতিতে মিস্টার গোয়েঙ্কা যে সন্তুষ্ট হয়েছেন তা ওঁর কথার ভঙ্গীতেই বোঝা যাচ্ছে।
সুযোগ বুঝে সোমনাথ এবার কড়া ডোজে গোয়েঙ্কাজীর প্রশংসা করলো। বললো, “এরকম সাজানো-গোছানো অফিস কিন্তু কলকাতাতেও বেশি নেই। এই অফিসের সর্বত্র আপনার সুচির পরিচয় ছড়িয়ে রয়েছে।”
গোয়েঙ্কাজী প্রশংসায় নরম হয়েছেন মনে হলো। তবে প্রথম দর্শনেই সোমনাথকে তিনি যে পুরোপুরি বিশ্বাস করছেন না, তাও আন্দাজ করতে সোমনাথের কষ্ট হলো না। সোমনাথ আর এগুলো না। শুধু জিজ্ঞেস করলো, “একা-একা গাড়িতে কলকাতা ফিরছি—এখান থেকে কেউ যাবেন নাকি।”
গোয়েঙ্কাজী প্রথমে ইতস্তত করলেন। বাড়িতে গিন্নির সঙ্গে ফোনে কথা বললেন। তারপর নিবেদন করলেন, “আমার ওয়াইফের পিসীমার এক ঝি এখানে পড়ে রয়েছে। বেচারা একলা যেতে পারবে না। আমারও নিয়ে যাবার সময় হচ্ছে না। যদি একটু চিত্তরঞ্জন অ্যাভিন্যুতে শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দেন।”
খুব উৎসাহের সঙ্গে রাজী হয়ে গেলো সোমনাথ। সুপুষ্ট স্তনের অধিকারিণী অ্যাংলোইন্ডিয়ান যুবতীর আফিসিক ভদ্রতাবোধ একটু কম। চিঠি ছাপানো বন্ধ রেখে আলপিন দিয়ে নখের ময়লা পরিষ্কার করতে করতে মেয়েটি ওদের কথাবার্তা শুনছিল। সে এবার উৎসাহিত হয়ে উঠলো। তার কলকাতা যাবার প্রয়োজন। মৃদু হেসে মিস্টার গোয়েঙ্কা রাজী হয়ে গেলেন।
গাড়ি চালিয়ে ফিরতে ফিরতে সোমনাথের মনে হলো সে যেন থিয়েটারের রাজা সেজেছে। একটা সামান্য কেরানির চাকরি পেলে যে বর্তে যায়, পেটের দায়ে সে কেমন অন্যের গাড়ি নিয়ে থার্ড পার্টিকে লিফট দিচ্ছে। পিছনে গোয়েঙ্কাজীর শ্বশুরবাড়ির বুড়ি ঝি বসে আছেন। সোমনাথের পক্ষে তিনিই অসামান্যা—কারণ গোয়েঙ্কার সঙ্গে পরিচয়ের যোগসূত্র।
সোমনাথের পাশে বসেছে মিস জডিথ জেকব। মহিলার দেহ থেকে সস্তা দেশী সেন্টের উগ্র গন্ধ ভকভক করে ভেসে আসছে। মক্তোর মতো ঝকঝকে দাঁতগুলো বার করে মিস জেকব বললো, “তুমি তো খুব স্টেডি ড্রাইভ করো।” সোমনাথ রাস্তার দিকে মনোযোগ রেখে মিটমিট করে হাসলো। মিস জেকব বললো, “তোমার জন্যে আমার ফিঁয়াসের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে।” হড়-হড় করে ব্যক্তিগত অনেক খবরাখবর দিয়ে যাচ্ছে মিস জেকব। ফিঁয়াসে কোন এক কোম্পানিতে উই মারার কাজ করে। তার ফ্ল্যাটের বাড়তি চাবি মিস জেকবের কাছে আছে। যখন খুশী সে ভাবী স্বামীর ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকতে পারে, কোনো অসুবিধে নেই। আরও কী সব বলতে যাচ্ছিলো মিস জেকব, কিন্তু সোমনাথের আগ্রহ নেই সেসব শোনবার।
গাড়ি চালাতে চালাতে সোমনাথ অন্য কথা ভাবছিল। নটবরবাবুর মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। নটবরবাবু মানষকে মোটেই বিশ্বাস করেন না।
নটবর বলেছিলেন, “সব মানুষের কোনো-না-কোনো দুর্বলতা আছে। টাকা এবং মদে নাইনটি নাইন পাসেন্ট বিজনেস ম্যানেজ হয়ে যায়। কিন্তু একবার মশাই ভীষণ বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম। ওই সুধাকর শমাই কেসটা দিলো। বললো, ‘দাদা, ভীষণ শক্ত ঠাঁই, কিছুতেই সুবিধে করতে পারছি না। বেটাচ্ছেলে নরম না হলে, একদম মারা যাবো। গভরমেন্টকে কিছু, খারাপ মাল সাপ্লাই করেছি-শালা ধম্মপুত্তর যধিঠির যদি রিজেকট করে দেয় একেবারে ফিনিশ হয়ে যাবো।’ প্রথমেই সুধাকরকে এক বকুনি লাগিয়ে বলেছিলাম, তোমার অভ্যেসটা পটাও—মাঝে মাঝে অন্তত থার্ড ক্লাস মাল সাল্লই বন্ধ করো। সুধাকর বললো, এসব কী অজগবী কথা বলছেন নটবরদা? লর্ড ক্লাইভের আমূল থেকে আজ পর্যন্ত কে কবে গোরমেন্টকে জেন ইন মাল সালাই করেছে?’ সুধাকর কিছুতেই শুনলো না, জোর করে কেসটা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলো। গভরমেন্টের লোকটাকে আমি বাজিয়ে দেখলাম—ব্যাটা সত্যি ঘষে নেয় না, পরের গাড়িতে চড়ে না, মদ ছোঁয় না। কিন্তু আমিও নটবর মিত্তির! তখনও আশা ছাড়লাম না। তিন-চারদিন ধরে বিভিন্ন সোর্স থেকে খোঁজখবর নিয়ে শুনলাম, লোকটা এক ম্যাড্রাসী মহাপুরুষ বাবার ভক্ত। আর পায় কে? আমিও বিরাট ভক্ত বনে গেলাম। ্বললাম, আপনি বিরাট ভক্ত—আর আমি কীটাণকীট, সবে ভক্তিমাগে পা বাড়িয়েছি। আপনাকে আলো দেখাতে হবে। দেড়শ টাকা দিয়ে ম্যাড্রাসী বাবার একখানা পেশাল রঙীন ফটো যোগাড় করে পাক স্ট্রীটের সেমল থেকে দামী ফ্রেমে বাঁধিয়ে ভক্ত-বাবাজীর বাড়ি দিয়ে এলাম। মন্ত্রের মতো কাজ হয়ে গেলো। ভদ্রলোক বুঝতেই পারলেন না, ওঁর হাতে আমি তামাক খেয়ে গেলুম।”
