নটবর মিটার আবার নস্যি নিলেন। বললেন, “যাকগে ওসব বাজে কথা—নিজের প্রশংসা নিজের মুখে মানায় না। আপনি পারচেজ দেবতাদের সন্তুষ্ট করবার মন্তর শিখুন। সুধাকরবাবু একটা সুন্দর কথা বলেন—যতক্ষণ না অফিসারের সঙ্গে ক্যাশের ব্যবস্থা হলো ততক্ষণ দুশ্চিন্তা থেকে যায়। যেমনি বুঝলাম, মাল খায়, টাকা নেয়, আর ভাবনা থাকে না। ঘরটা আমার পাকাপাকি হবার চান্স রইলো। নিজের স্বার্থেই অফিসার আমার স্বার্থটা দেখবেন।
সোমনাথের এসব কথা মোটেই ভালো লাগছে না। সে বললো, “নিজেকে ছোট করে কী লাভ, মিস্টার মিটার?”
আঁতকে উঠলেন নটবর মিটার। “ওরে বাবা! এ যে ফিজিক্সের কথা তুলে ফেললেন। স্যরি, ফিজিক্স নয়—ফিলজফি। এখানে মশাই, কেউ ফিলজফি করতে আসে না—ট-পাইস কামাতে আসে। তা ছাড়া আপনি নিজেকে ছোট করবেন কেন? প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই। তো দেবতা আছেন—গ্রেট বিবেকানন্দ সোয়ামী বলে গেছেন। মনে করুন, আপনি সাক্ষাৎ নারায়ণের সেবা করছেন, হোক না সে পারচেজ অফিসার।”
নটবর মিত্তির ঘড়ির দিকে তাকালেন। বললেন, “না মশাই, ট্যাক্সি পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। আমি ট্রামে উঠে পড়বো এবার। তবে শুনে রাখন—জাত সেলসম্যানের কাছে। প্রত্যেক খদ্দের একটা চ্যালেঞ্জ! পৃথিবীতে এমন লোক জন্মায়নি যার দুর্বলতা নেই। বাইরে থেকে মনে হবে দভেদ্য দুর্গ, কিন্তু খোঁজ করলে দেখা যাবে কোথাও একটা দরজা খোলা আছে। আমার নেশা হলো, মানুষের এই ভেজানো দরজা খুঁজে বার করা। খুউব ভালো লাগে! আপনি মশাই, ফিলজফি-টফি ভুলে যান—মন দিয়ে জনসংযোগ করনে।”
সোমনাথ গম্ভীর হয়ে হাঁটতে লাগলো। চিৎপুর রোড থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ডালহৌসি স্কোয়ারে এসে হঠাৎ হীরালাল সাহার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। ভদ্রলোক হাঁ করে রাইটার্স বিল্ডিংসের দিকে তাকিয়ে আছেন। ওঁর চোখে যে ছোটছেলের লোভ রয়েছে তা সোমনাথও বুঝতে পারছে। ধরা পড়ে গিয়ে হীরালালবাবু লজ্জা পেলেন। মুখে হাসি ফোটাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে বললেন, “আপনাকে সত্যি বলছি, এই ভাঙা বাড়ির বিজনেস করে আমার অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে। কোনো পুরানো বাড়ি দেখুলেই হিসেব করতে ইচ্ছে হয় ভাঙলে কত কাঠ, কত লোহা, কত পাথর পাওয়া যাবে। কখন কোটেশন দিতে হয় কিছুই ঠিক নেই তো।”
“তা বলে আপনি এই রাইটার্স বিল্ডিংস-এর দিকে তাকাবেন?” সোমনাথ জিজ্ঞেস করে।
হীরালালবাবু রেগে উঠলেন। “কেন? অন্যায়টা কী মশাই? চিরকাল তো আর এ-বাড়ি থাকবে না। একদিন না একদিন ভাঙতে হবেই।” হীরালালবাবু বললেন, “সায়েব বাড়ি বলেই আমার আগ্রহ। ইন্ডিয়ান আমলে রাইটার্স বিল্ডিং তৈরি হলে আমি সময় নষ্ট করতুম না। স্বাধীনতার পরে যেসব দেশলাই বাক্সের মতো নতুন বাড়ি হয়েছে আমি তো সেদিকে তাকিয়েও দেখি না। জানেন মিস্টার ব্যানার্জি, ভবিষ্যতে যাঁরা আমাদের এই বাড়িভাঙা লাইনে আসবে তারা একেবারে পথে বসবে। হাল আমলের বাড়িগুলোতে কিস্সু নেই। সায়েব বাড়িগুলো খতম হলেই কলকাতা খতম হয়ে গেলো।”
হীরালালবাবু তারপর বললেন, “এলগিন রোডের বাড়িটায় হাজার দুয়েক টাকা ঢালবেন নাকি? চার-পাঁচ দিনের মধ্যে লাভ পেয়ে যাবেন। আমার কিছু টাকা কমতি পড়েছে। ভাবলুম—কেন পাগড়ি পরা গুড়ের নাগরীগুলোর কাছে হাত পাতি। আপনি লোকাল লোক রয়েছেন।”
১৮. কমলা বউদি একবারও প্রশ্ন করলেন না
কমলা বউদি একবারও প্রশ্ন করলেন না। ব্যাঙ্কের চেকবইটা বার করে সোমনাথের হাতে দিলেন। বললেন, “তুমি যখন ব্যবসায় ঢালছো, আমি ভেবে দেখবার কে?”
ব্যাঙ্ক থেকে তুলে টাকাটা হীরালালবাবুর হাতে দিয়েছে সোমনাথ। উনি সঙ্গে সঙ্গে রসিদ লিখে দিলেন। বললেন, “আমার মনে হয় অন্তত হাজার টাকা লাভ পেয়ে যাবেন। চার ছিনের জন্যে দু-হাজার টাকা লাগিয়ে হাজার টাকা পকেটে এলে মন্দ কী? কোনো বিজনেসে এমন প্রফিট পাবেন না।”
সোমনাথের মনে হচ্ছে এবার মেঘ কাটছে। নটবরবাবুর কথাগুলো থেকেও সে কিছু, শেখবার চেষ্টা করেছে। অসৎ পথে যাবে না সোমনাথ। কিনতু মানুষের বিশ্বাস উৎপাদনের চেষ্টা করতে হবে না হলে সত্যিই তাঁরা কেন অর্ডার দেবেন?
সোমনাথের সাহসও বেড়ে যাচ্ছে। ক’দিন আগেই এক কাপড়ের মিলে গিয়েছিল। ওখানকার মিস্টার সেনগত বললেন, “আপনার কোম্পানির দুটো স্যাম্পল টেস্টিং-এ পাঠিয়েছি—এখনও রিপোর্ট আসেনি। তবে মশাই-বড় বড় কোম্পানির একই জিনিস রয়েছে, মালও ভেসে যাচ্ছে। আবার আপনারা একই লাইনে কুকতে গেলেন কেন?”
অন্যসময় হলে সোমনাথ মাথা নিচু করে চলে আসতো। কিন্তু এখন বললো, বড়-বড়রা তো সব সময়েই থাকবেন, সার। বম্বেতে অত বিরাট মিরাট কাপড়ের কল থাকা সত্ত্বেও আপনারা তো একদিন সাহস করে এখানে কল বসিয়েছিলেন এবং এতো নাম করেছেন।”
“বাঃ বেশ ভালো বলেছেন! কথাটা আমার মাথাতেই আসেনি। সত্যি তো, কোথায় আর খোলা মাঠ পড়ে রয়েছে? রুই-কাতলা থাকা সত্ত্বেও চুনোপটিরা সাহস করে ঢুকে পড়ছে এবং যোগ্যতা দেখিয়ে আমাদের কোম্পানির মতো বড় হচ্ছে। মিস্টার সেনগুপ্ত বেশ খুশী হলেন।
সোমনাথকে তিনি বসতে দিলেন। তারপর বললেন, “আপনি ইয়ং বেঙ্গলী-আপনাকে সোজা বলছি-আমাকে ধরে কিছু হবে না। আমার ডিরেকটর মিস্টার গোয়েঙ্কার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবো।”
সোমনাথ বললো, “গোয়েঙ্কাজী মত লোক, উনি কি আমার মতো চুনোপটিকে পাত্তা দেবেন?”
