সোমনাথ চুপচাপ রইলো। তারপর দূরে একটা নৌকার দিকে তাকিয়ে বললো, “তোমার মনে আছে? শ্রীময়ী এবং সমর আমাদের কী বিপদে ফেলেছিল। পৌনে একটার সময় রেস্তরাঁয় ফেরবার কথা—আমরা দুজনে হাঁ করে বসে আছি, ওরা এলো দেড়টার সময়। বকুনি দিতে ফিক করে হেসে সমর বললো, “ঘড়িতে গোলমাল ছিল। শ্রীময়ীর মুখেচোখেও কোনো। বিরক্তির ভাব দেখা গেল না।”
তপতী নিজের ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। এখন সোয়া একটা। তপতী বললো, “একটা কথা বলবো? রাগ করবে না?”
“আগে শুনি কথাটা,” সোমনাথ উত্তর দিলো।
“তোমাকে লাঞ্চে নেমন্তন্ন করছি।” তপতী বেশ ভয়ে ভয়ে বললো।
সোমনাথ আপত্তি করলো না। কিন্তু ওর মুখে কালো হয়ে উঠলো।
পশ্চিম দিকের সেই পরিচিত সীটটায় বসলো ওরা। কলেজের সেই পুরানো সোমনাথ কোথায় হারিয়ে গেছে। যে-সোমনাথ আজ তপতীর সামনে বসে রয়েছে সে প্রাণহীন নিষ্প্রভ। ঝকঝকে সুন্দর কবিতার ভাষায় যে কথা বলতে পারতো, সে এখন চুপচাপ বসে থাকে। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে মুখ খোলে না। অথচ একে কেন্দ্র করেই তপতীর সব স্বপ্ন গড়ে উঠেছে।
সোমনাথ এই মুহূর্তে প্রেমের মধ্যেও অর্থের বিষ দেখতে পাচ্ছে। এখানে এই গঙ্গার তীরে প্রিয় বান্ধবীকে নিয়ে বার-বার আসবে এমন স্বপ্ন সোমনাথ অবশ্য দেখেছিল। কিন্তু তাই বলে তপতী খরচা দেবার প্রস্তাব করবে এটা অকল্পনীয়।
তপতী বুঝতে পারছে হঠাৎ কোথাও ছন্দপতন হয়েছে। সে যা সহজভাবে নিয়েছে, সোমনাথ তা পারছে না।
“রাগ করলে?” তপতী জিজ্ঞেস করলো।
সোমনাথ প্রশ্নটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলো। বললো, “না।”
সোমনাথ ভাবছে ১লা আষাঢ়ের সেই প্রথম আবিষ্কারের পর এই নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। ভাটার টানে সোমনাথ ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছে আর তপতী জোয়ারের স্রোতে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে। সেই সেদিন যখন প্রথম দেখা হলো তখন দুজনেই কলেজের প্রথম বছরের ছাত্রছাত্রী। সদশন সোমনাথ সচ্ছল পরিবারের ভদ্র সন্তান। উপরন্তু সে কবি—সাধারণ মেয়ের সাধারণ দঃখ থেকে জন-অরণের মতো কবিতা লিখে ফেলতে পারে। আর তপতী সাধারণ একটা সুশ্রী শ্যামলী মেয়ে। স্বভাবে মধর, কিন্তু এই বাংলায় নতুন। ভালো করে বাংলা উচ্চারণ করতে পারে না—কবিতা লেখা তো দুরের কথা। সোমনাথকে শ্রদ্ধা করতে পেরেছিল বলেই তো তপতী নিজের হৃদয়কে অমনভাবে দিয়েছিল।
কিন্তু তারপর? তপতী পড়াশোনায় ভালো করেছে। ছাত্রী হিসাবে নাম করেছে। আর সোমনাথ অর্ডিনারি থেকে গেছে। তপতী অনেক নম্বর পেয়েছে, সোমনাথ কোনোরকমে ফেলের ফাঁড়া কাটিয়েছে। তপতী সুন্দর ইংরিজী লিখতে পারে, বলতে পারে আরও ভালো। সোমনাথ ইংরিজীর কোনো ব্যাপারেই তেমন সুবিধে করতে পারে না। সোমনাথ পাস কোর্সের বি-এ, তপতীর অনার্সে ভালো ফল পেতে কোনো অসুবিধে হয়নি। এরপর প্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে সোমনাথ আর তাল রাখতে পারেনি। তপতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। প্রথম শ্রেণীর এম-এ ডিগ্রিটা নিতান্ত সহজভাবেই সে ভ্যানিটি ব্যাগে পরে ফেলেছে। সোমনাথ এই আড়াই বছর ধরে ডজন ডজন চাকরির আবেদন করেছে এবং সর্বত্র ব্যর্থ হয়েছে। এখন তপতী রায় রিসার্চ স্কলার। সোমনাথের কবি হবার স্বপ্ন কোনকালে শুকিয়ে ঝরে পড়েছে। তার এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ কার্ডের নম্বর দু’ লক্ষ দশ হাজার সতেরো।
এসব তপতীর যে অজ্ঞাত তা নয়। কিন্তু কোনো এক ১লা আষাঢ়ে সে যাকে আপন করে নিয়েছিল, হৃদয়ের স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাকে সে আজও অস্বীকার করেনি। সোমনাথের জীবনের পরবতী ঘটনামালার সঙ্গে তপতীর ভালোবাসার যেন কোনো সম্পর্ক নেই। তপতী এর মধ্যে আরও প্রস্ফুটিত হয়েছে। ভারী সুন্দর দেখতে হয়েছে তপতী-ফার্স্ট ইয়ারে বরং এতোটা মনোহারিণী ছিল না সে।
সোমনাথ ভাবলো যৌবনের প্রথম প্রহরে অনেকে অনেক রকম আকর্ষণে মদ্ধ হয়—ক্ষণিকের জন্য অযোগ্য কাউকে মন দিয়েও ফেলে। কিন্তু বর্ধিমতীরা সেইটাই শেষ কথা বলে মেনে নেবার নিবন্ধিতা দেখায় না। সমরের সঙ্গে শ্রীময়ী তো কত ঘুরে বেড়িয়েছে। ইডেনে নির্জন প্যাগোড়ার ধারে ১লা আষাঢ়েই তো ওরা দুজনে ইচ্ছে করে দেড় ঘণ্টা বসেছিল। চুম্বনেও আপত্তি করেনি শ্রীময়ী। তারপর সপরিষ সমরের হাত ধরে শ্রীময়ী তো কত দিন লেকের ধারে, বোটানিকসে এবং ব্যান্ডেল চার্চের প্রাঙ্গণে ঘরে বেড়িয়েছে। কিন্তু যেমনি সমর পড়ায় পিছিয়ে পড়তে লাগলো, যেমনি বোঝা গেলো ওর ভবিষ্যৎ নেই, অমনি শ্রীময়ী ব্রেক কষেছে, আর বোকামি করেনি।
সোমনাথ ভাবলো, ভালোই করেছে শ্রীময়ী। নিজের মতামতের পুনর্বিবেচনার অধিকার প্রত্যেক মানুষের আছে। না হলে, শ্রীময়ী আজ কষ্ট পেতো—সিঁথির লাল রংয়ের জোরে অফিসার অশোক চ্যাটার্জির নতুন ফিয়াট গাড়িটায় অমন সুখে বসে থাকতে পারতো না।
শুধু শ্রীময়ী কেন? কলেজের কত মেয়ে তো ক্লাসের কত ছেলের সঙ্গে ভাব করেছে, একসঙ্গে সিনেমা থিয়েটার দেখেছে, অন্ধকারে অধৈর্য বন্ধুদের একটু-আধটু দৈহিক প্রশ্রয় দিয়েছে। অরবিন্দর মতো যেসব ছেলে চাকরি পেয়েছে, তারা বান্ধবীদের গলায় মালা পরাতে পেরেছে। বাকি সব সঙ্গিনী কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। যার জীবনসঙ্গিনী হবার অভিলাষ ছিল তাকেই এখন পথে দেখলে মেয়েরা চিনতে পারে না। বেকারদের সঙ্গে প্রেম করবার মতো বিলাসিতা মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েদের নেই। তাদের আর্থিক নিরাপত্তা চাই। নিজের বোন থাকলেও সোমনাথ তাই খুঁজতো।
