“তুমি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলে সেদিন, সোমনাথ।” তপতী মনে করিয়ে দিলো।
“ঘাবড়াবো না? তোমার জন্যেই চিন্তা হলো। তুমি যদি ভাবো, আমরা দুই পুরষ বন্ধ, একটা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র অনুযায়ী তোমাদের আলাদা করে দিলাম।”
সুদর্শনা তপতী ওর নতুন চশমার মধ্য দিয়ে সোমনাথের দিকে স্নিগ্ধ প্রশান্ত দৃষ্টিপাত করলো। “কবিরা যে ষড়যন্ত্ৰী হয় না তা আমার চিরদিনই বিশ্বাস ছিল, সোমনাথ।”
“তপতী, সেদিন তোমাকে খু-উ-ব ভালো লেগেছিল। বাদল দিনের প্রথম কদম ফলের মতো!”
“তুমি কিন্তু বড় সরল ছিলে, সোমনাথ। শ্রীময়ী ও সমর রাস্তার ওপারে অদশ্য হয়ে যাওয়া মাত্র বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছিলে। তারপর বলেছিলে, “আপনি যদি চান, আমি এখন ওদের ডেকে নিয়ে আসছি!” আমি বাধা না দিলে, হয়তো তুমি ওদের খোঁজ করতে যেতে। আমি পশ্চিমে মানুষ। মীরাটের রাস্তায় সাইকেল চালিয়েছি। জিমনাসিয়ামে যুযুৎস, শিখেছি। ছেলেদের অত ভয় পাই না। বললাম, ওদের ডিসটার্ব করবেন কেন শুধু শুধু? তুমি তখনও নার্ভাসনেস কাটাতে পারোনি। উত্তেজনার মাথায় গোপন খবরটা প্রকাশ করে ফেললে। বললে, আজ আমার জন্মদিন। বউদি তিরিশটা টাকা দিয়ে বললেন, যেমনভাবে খুশী খরচ করতে।”
সোমনাথ মৃদু হাসলো। বললো, “এরপর তুমি কিন্তু আমাকে বেশ ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে তপতী। গম্ভীরভাবে তুমি জিজ্ঞেস করলে, ‘সোমনাথবাবু জন্মদিনে পাওয়া টাকাটা অনেকভাবেই তো খরচ করতে পারতেন। কিন্তু আমাদের ডাকলেন কেন?’”
সেদিনের কথা ভেবে এতদিন পরেও তপতী মুচকি হাসলো। বললো, “তোমার মুখের অবস্থা দেখে তখন আমার মায়া হচ্ছিলো। তুমি ঘাবড়ে গিয়ে বললে, “আপনি জন-অরণ্য কবিতাটা পছন্দ করে নিজের কাছে রেখে দিলেন। আমার পরের কবিতাগুলোকে কষ্ট করে পড়লেন। তাই কৃতজ্ঞতার ঋণ স্বীকার করতে ইচ্ছে হলো না।”
সোমনাথ অবিন্যস্ত চুলগুলোকে শাসন করতে করতে তপতীর কথায় কৌতুক বোধ করলো। “তুমি যে আমার অবস্থা দেখে মনে মনে হাসছো, তা কিন্তু তখন বুঝতে দাওনি। বেশ সহজ হয়ে বলেছিলে, ‘কৃতজ্ঞতা পাঠিকার দিক থেকেই সোমনাথবাব। একটা পুরো অপ্রকাশিত কবিতা আমাকে দিয়ে দিলেন। তারপর তুমি রাগ দেখিয়েছিলে, তপতী। বলেছিলে, “আপনার জন্মদিনে আমাকে এইভাবে বিপদে ফেললেন কেন? কিছু উপহার নিয়ে আসবার সুযোগ দিলেন না?”
তপতী বললো, “তোমার অসহায় অবস্যাটা তখন বেশ হয়েছিল। আমার মায়া হচ্ছিলো, যখন তুমি বললে, “জন্মদিনের খবরটা শুধু আপনাকেই দেবো ঠিক করে রেখেছিলাম। শ্রীময়ী ও সমর যেন না জানতে পারে।”
সোমনাথ একটও ভোলেনি। তপতীকে বললো, “তুমি রাজী হয়ে গেলে, আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তুমি যখন বললে, “জন্মদিনে অভিনন্দন জানাতে হয়, সোমবাব! আপনি অনেক বড় হেনি—অনেক নাম করুন। এবং মেনি হ্যাপি রিটারনস, অফ দি ডে,’ জানো তপতী, সেই মুহূর্তে তোমাকে হঠাৎ ভীষণ ভালো লেগেছিল। একবার ভাবলম, মনের এই আনন্দের কথা তোমাকে বলি। কিন্তু সাহস হলো না।”
তপতী চুপ করে রইলো। তারপর গম্ভীরভাবে বললো, “তোমার এই স্বভাবটাই তো আমাকে ভাবিয়ে তোলে সোম। তোমার আনন্দ, তোমার দুঃখ—কোনো কিছুতেই ভাগ বসাতে দাও না আমাকে।”
সোমনাথ কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ হাঁটতে লাগলো। দরে সেই পরিচিত রেস্তরাঁটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ওখানকার দোতলায় বসেই একদিন ওরা অকস্মাৎ পরস্পরকে আবিষ্কার করেছিল।
সোমনাথ বললো, “মনে আছে তোমার? আমরা পশ্চিমদিকে কোণের টেবিলটা দখল করেছিলাম।”
সোমনাথ নিজের মনেই বললো, “বিরাট কাঁচের জানালার ভিতর দিয়ে গঙ্গার জল দেখা যাচ্ছিলো। আমি অস্ফটভাবে উচ্চারণ করলাম, পতিত উদ্ধারিণী গঙ্গে। তুমি মুখ ফটে কিছুই বললে না। শুধু অধাক হয়ে একবার আমার দিকে তাকালে। আমিও গঙ্গার শোভা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ মনে হলো, চোখের আলোয় দেখা হলো, এই প্রথম আমরা নিজেদের চিনলাম।”
তপতী গম্ভীরভাবে বললো, “তুমি তাহলে মনে রেখেছো? আমি ভাবছিলাম,..” এবারে চুপ করে গেল তপতী।
“কী ভাবছিলে? বলো না তপতী।” সোমনাথ অনুরোধ করলো।
অভিমানিনী তপতী বলেই ফেললল, “আমি ভাবছিলাম—অতীতকে তুমি ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে দিয়েছে।”
সোমনাথ নির্বাক হয়ে রইলো। সে কী বলবে কিছুই ঠিক করে উঠতে পারছে না।
স্নেহময়ী তপতী খুব মিষ্টি স্বরে জিজ্ঞাসা করলো, “রাগ করলে?”
“না, তপতী। রাগ করবো কেন?” সোমনাথ নার্ভাস হয়ে উঠছে। “জানো তপতী,” সোমনাথ আবার কিছু বলবার চেষ্টা করলো।
“বলো,” তপতী করুণভাবে অনুরোধ করলো।
“জীবনটাকে কিছুতেই গুছোতে পারলাম না।” সোমনাথ অকপটে স্বীকার করলো। তপতীর কাছে এসব বলতে তার লজ্জা লাগছে কিন্তু আজ কিছুই সে চেপে রাখবে না। “তুমি, বাবা, বউদি, দাদারা সবাই অধীর আগ্রহে আমার দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতেই পারছি না। তোমাদের সবাইকে আমি নিরাশ করছি। কোথাও নিশ্চয় আমার একটা সিরিয়াস দোষ আছে।”
তপতী এ-বিষয়ে মোটেই বিব্রত নয়। বললো, “তুমি বড্ড বেশি ভাবো সোম। অবশ্য তোমার মধ্যে কবিতা রয়েছে, তুমি ভাববেই তো! অনেকে একদম ভাবে না–না নিজের সম্বন্ধে অপরের সম্বন্ধে।”
“তারা বেশ সুখে থাকে। তাই না?” সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো।
“তা হয়তো থাকে কিন্তু তাদের আমার মোটেই ভালো লাগে না। দীপঙ্করের কথা বলেছিলে তুমি। ছেলেটা ঐ ধরনের। আই-এ-এস হতে পারে, কিন্তু নিজেকে নিয়েই সব সময় ব্যস্ত।”
