“তুমি ভীষণ রেগে গেছ, মনে হচ্ছে। একটাও কথা বলছে না,” আবার অভিযোগ করলো তপতী।
ছোট ছেলের মতো হাসলো সোমনাথ। ওর হাসিটা তপতীর খুব ভালো লাগে। সে বলেই ফেললো, “তোমার হাসিটা ঠিক একরকম আছে, সোম। খুব কম লোক এমনভাবে হাসতে পারে।”
“হাসি দিয়ে মানুষকে বিচার করা আজকের যুগে নিরাপদ নয়, তপতী,” সোমনাথ হাসি চাপবার চেষ্টা করলো।
“যারা মানুষ ভালো নয়, তারা এমন হাসতে পারে না!” সোমনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে সপ্রতিভভাবে তপতী উত্তর দিলো। এই সহজ নির্মল হাসি দেখে বহু সহপাঠীর ভিড়ের মধ্যে সোমনাথকে তপতী খুঁজে পেয়েছিল।
খাবারের অর্ডার দিয়েছে তপতী। সোমনাথ কী খেতে ভালোবাসে সে জানে।
খেতে খেতে সোমনাথ বললো, “খুব ঝগড়া করবে বলেছিলে যে?”
হেসে ফেললো তপতী। “করবোই তো। কিন্তু খাওয়ার সময় ছেলেদের সঙ্গে ঝগড়া করতে নেই।”
“পারমিশন দিচ্ছি,” সোমনাথ বললো।
এবার তপতী বললো, “সোম, তুমি আমাকে এমনভাবে দূরে সরিয়ে রাখছো কেন?” অনেক কষ্ট করে তপতী যে কথাগুলো বলছে তা সোমনাথের বুঝতে বাকী রইলো না।
মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে রইলো সোমনাথ। তারপর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, “আমি যেসবের যোগ্য নই তুমি অকাতরে তাই আমাকে দিয়েছো, তপতী। কিন্তু আমি অমানুষ নই। তোমার ক্ষতি করতে পারবো না।”
শান্ত তপতী গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কারও সঙ্গে কথা বললে, চিঠি লিখলে, দেখা করলে, বুঝি তার ক্ষতি করা হয়?”
“আমাদের এই দেশে মেয়েদের ক্ষেত্রে হয় তপতী। তোমার কোনো ভালো করতে পারিনি, তোমার যোগ্য করে নিজেকে তৈরিও করতে পারিনি—কিন্তু তোমার ভবিষ্যৎটা নষ্ট করবো না,” সোমনাথের গলা বোধহয় একটু কেঁপে উঠলো।
তপতী কিন্তু সহজভাবে সোমনাথের দিকে তাকালো। তারপর প্রশ্ন করলো, “মেয়েরা যে ছেলেদের সমান, এটা তুমি স্বীকার করো সোম?”
“ওরে বাবা! অবশ্যই করি। সংবিধানসম্মত অধিকার, স্বীকার না করে উপায় আছে? সামনেই হাইকোর্ট।” দরে কলকাতা হাইকোর্টের চুড়োটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে।
তপতী বললো, তাহলে আমাকে নাবালিকা ভাবছো কেন? তুমি তো আমার কাছে কিছই চেপে রাখোনি।”
“আমার নিজের কনসেন্স তো চেপে রাখতে পারি না, তপতী। আমার সম্মান নেই, চাকরি নেই—তোমার সব আছে।”
তপতী জিজ্ঞেস করলো, “তাহলে আমার নিজের কোনো অধিকার নেই? আমার কাকে পছন্দ করা উচিত তা আমি ঠিক করতে পারবো না? চাকরি ছাড়া পুরষ মানুষের অন্য কিছুই মেয়েরা ভালোবাসতে পারবে না? বিদেশে তো এমন হয় না। ইংলন্ড আমেরিকায় তো কত মেয়ে চাকরি করে স্বামীকে পড়ায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে।”
গম্ভীর হয়ে উঠলো সোমনাথ। বললো, “তুমি এবং আমি বিদেশে জন্মালে বেশ হতো তপতী।”
তপতীর মনোবলের অভাব নেই। বললো, “যেখানেই জন্মাই—যা মন চায় তা করবোই।”
চুপ করে রইলো সোমনাথ। সে ভাবছে, বিদেশে জন্মালে কোনো সমস্যাই থাকতো না— সেখানে কেউ এমনভাবে বেকার বসে থাকে না।
“কী ভাবছো?” তপতী জিজ্ঞেস করলো।
বিষণ্ণ অথচ শান্ত সোমনাথ বললো, “তুমি দিচ্ছে বলেই যদি আমি গ্রহণ করি তাহলে কেউ আমাকে ক্ষমা করবে না, তপতী। ভাববে জেনেশুনে এই বেকার-বাউণ্ডুলে একটা শিক্ষিত সুন্দরী সরল মেয়ের সর্বনাশ করেছে। জানো তপতী, আড়াই বছর দোরে-দোরে চাকরি ভিক্ষে করে দুনিয়ার কাছে ছোট হয়ে গেছি—কিন্তু এখনও নিজের কাছে ছোট হইনি। নিজের কাছে ছোট হতে আমার ভীষণ ভয় লাগে।”
তপতী কিছু না বলেই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মেয়েরা অনেক বড় বড় ব্যাপারে কত সহজে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেলেরা পারে না, তাদের মধ্যে কত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থেকে যায়।
সোমনাথ বললো, “তুমি এবং কমলা বউদি হয়তো বিশ্বাস করবে না—কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝে ভয় হয়, শেষ পর্যন্ত আমি নিজের কাছে যেন ছোট না হয়ে যাই।”
বেয়ারা বিল দিয়ে গেলো। সোমনাথ বিলটা নিতে গেলে, তপতী অকস্মাৎ ওর হাতটা চেপে ধরলো। এই প্রথম তপতীর উষ্ণ অঙ্গের কোমল স্পর্শ পেলো সোমনাথ। ঘন সান্নিধ্যের এক অনাস্বাদিত শিহরণ মুহূর্তের জন্য অনুভব করেও পরমুহূর্তে সে হাত ছাড়িয়ে নিলো। সোমনাথের মনে হলো নিজের কাছে সে এবার সত্যিই ছোট হয়ে যাচ্ছে।
তপতী গম্ভীরভাবে প্রশ্ন করলো, “তোমাকে নিয়ে এলো কে?”
সোমনাথ বললো, “সব জিনিসের একটা নিয়ম আছে, তপতী। ছেলেদের ছোট করতে নেই।”
তপতী বললো, “প্লিজ সোমনাথ। আমার কথা শোনো। আজ প্রথম ইউ-জি-সি স্কলারশিপের আড়াইশ’ টাকা পেলাম। আমার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল প্রথম মাসের টাকা পেয়ে তোমার কাছে আসবো।”
তপতী এবার কোনো কথা শুনলো না। বিলের টাকাটা মিটিয়ে সে বেরিয়ে এলো।
বাস স্টপের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সোমনাথ বললো, “তুমি বিশ্বাস করলে না। আমার কাছে টাকা ছিল। আজ হঠাৎ দেড়শ’ টাকা রোজগার হয়ে গেলো।”
তপতী বললো, “এই তো শুরু। আমি জানি, বিজনেসে তুমি অনেক টাকা রোজগার করবে। এবং তখন…”
কথাটা শেষ করছে না তপতী। ইতিমধ্যে তপতীর বাস এসে গেছে সে ভবানীপুরে যাবে। সোমনাথ ফিরে যাবে অফিসে।
বাসে তপতীকে তুলতে তুলতেই সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো, “তখন?”
“তখন কোনো কথাই শুনবো না—সারাজীবন তোমার অন্ন খাবো।”
তপতীর শেষ কথাগুলো অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে এক অনির্বচনীয় সুরের ঝঙ্কারে সোমনাথের কানে এখনও বাজছে। সোমনাথকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে। সংসারে পরগাছা হয়ে সোমনাথ কিছুতেই আর সময়ের অপচয় করবে না।
১৬. মিস্টার মাওজীর সঙ্গে সোমনাথের দেখা
বিকেলবেলায় মিস্টার মাওজীর সঙ্গে সোমনাথের দেখা করার কথা আছে। মাওজীরা নানারকম কেমিক্যালের ব্যবসা করেন। আদকবাবুই এদের খবর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ভীষণ ভদ্রলোক, বোম্বাই মুসলমান এরা। আপনার ব্রীজবার মতো শুধু নিজের আত্মীয়কুটুম্ব এবং গাঁয়ের লোকদের কোলে ঝোল টানেন না। মুখজ্যে, চাটুজ্যে, হাজরা, দাস, বোসদের সঙ্গেও এরা সম্পর্ক রাখেন-লাভের সবটাই দেশে পাঠাবার জন্যে এরা উঁচিয়ে বসে নেই।”
