সোমনাথ বোধহয় একটু বেশিক্ষণই তপতীর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঘরে সেনাপতি ছাড়া কেউ নেই। তপতী নিজেও বোধহয় এই পরিবেশে অস্বস্তি বোধ করছে।
সোমনাথ এবার স্তব্ধতা ভাঙলো। গাঢ়স্বরে বললো, “তোমাকে চিনতেই পারছিলাম না। কবে চশমা নিলে।
তপতী ওর দিকে কয়েক মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে রইলো। তারপর পুরানো দিনের মতো, সহজভাবে বললো, “দু’মাস হয়ে গেল। ভীষণ মাথা ধরছিল। ডাক্তার দেখাতেই বললেন, বেশ পাওয়ার হয়েছে।”
“খুব পড়াশোনা করছো বুঝি?” সোমনাথ সস্নেহে জিজ্ঞেস করে।
“যা কমপিটিশন, না পড়ে উপায় কি?” তপতীর কথার মধ্যে এমন একটা কিশোরী মেয়ের বিস্ময় আছে যা সোমনাথকে মুগ্ধ করে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অনেক মেয়ের জীবন থেকে বিস্ময় চলে যায়। তপতী এখনও এই ঐশ্বর্য হারায়নি।
সোমনাথ এবং তপতীর মধ্যে এখন অনেক দূরত্ব। তবু এই মুহূর্তে সেই অপ্রিয় সত্যকে স্বীকার করতে পারছে না সোমনাথ। সে ভাবলো এখনও তারা দুজনে কো-এড়ুকেশন কলেজের ছাত্রছাত্রী। সোমনাথ উষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে তপতীকে আর-একবার নিরীক্ষণ করলো—ওর টিকলো নাক, টানা-টানা চোখ, দীর্ঘ গ্রীবা। তারপর কোনোরকমে বললো, “চশমায় তোমাকে সুন্দর মানিয়েছে তপতী।”
তপতী অন্য অনেক মেয়ের মতো ন্যাকা নয়। মিষ্টি হেসে বিনা প্রতিবাদে অভিনন্দন গ্রহণ করলো। সোমনাথের দিকে তাকালো তপতী। চোখের পাতা কয়েকবার দ্রুত বন্ধ করে নিজের আনন্দ প্রকাশ করলো এবং বললো, “থ্যাংকস।” তারপর হাতের কলমের মুখটা খুলতে এবং বন্ধ করতে করতে তপতী বললো, “ফ্রেম করবার সময় আমার ভয় হচ্ছিলো তোমার আবার পছন্দ হবে তো।”
তাহলে তপতী আজও সোমনাথের পছন্দ-অপছন্দের ওপর গুরুত্ব দেয়—নিজের চশমা কেনার সময়েও সোমনাথের কথা মনে পড়ে।
“তোমার জন্যে একটু চা আনাই তপতী?” সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো।
তপতী একটা অস্বস্তি বোধ করলো। বললো, “কি দরকার?”
“এ-পাড়ায় আমরা কী-রকম চা খাই, দেখবে না?” সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো।
তপতী সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেল।
চা শেষ করে সোমনাথ বললো, “চলো, বেরিয়ে পড়ি।”
“বারে! তোমার কাজের অসুবিধা হবে না? তপতী জিজ্ঞেস করে। ওর মনটা বড় খোলা। বাংলার বাইরে ছোটবেলা কাটিয়েছে বলে, কলকাতার অনেক নীচতা ও সংকীর্ণতা ওকে স্পর্শ করতে পারেনি।
গভীর সোমনাথ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, “কাজ থাকলে তো অসুবিধা? আপাতত আমার কোনো কাজ নেই।”
তপতীর একটা সুন্দর স্বভাব আছে, কখনও গায়ে পড়ে কোনো জিনিসের ভিতর ঢুকতে যায় না। অহেতুক কৌতূহল দেখায় না। যা জানতে পায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকে। ওর মানসিক স্বাস্থ্য যে এদেশের অসংখ্য মেয়ের আদর্শ হতে পারে তা সোমনাথ ভালোভাবেই জানে। তপতী বললো, “তাহলে চলো।”
এসপ্ল্যানেড থেকে বাসে চড়ে ওরা গঙ্গার ধারে চাঁদপাল ঘাটের সামনে নেমে পড়লো।
“অতগুলো বই তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে—আমাকে কিছুক্ষণ ভার বইতে দাও,” সোমনাথ দু-একখানা বই নেবার জন্যে তপতীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো।
বইগুলো আরো জোর করে আঁকড়ে ধরলো তপতী। গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে সে হেসে ফেললো। কিন্তু হাসি চাপা দিয়ে তপতী বললো, “তোমার সঙ্গে আজ ঝগড়া করতে এসেছি সোম।”
এইরকম একটা কিছু আশংকা করেছিল সোমনাথ। তবু সাহস সঞ্চয় করে বললো, “বইটা হাতে দিয়েও ঝগড়া করা যায় তপতী।”
তপতী বললো, “ভীষণ ঝগড়া করতে হবে যে!” ওর মেঘলা মখের আড়ালে আবার হাসির রৌদ্র উঁকি মারছে।
গ্র্যান্ড রোড ধরে ওরা দুজন মন্থর গতিতে দক্ষিণ দিকে হাঁটছে। এই দুপরে এখানে তেমন ভীড় থাকে না। মাঝে মাঝে দরে কলেজের খাতাপত্র হাতে দু-একটি ছাত্রছাত্রীর জোড় দেখা যাচ্ছে। রাস্তার ওপারে ইডেন গার্ডেন। পশ্চিমে ধীর প্রবাহিণী গঙ্গর দিকে ওরা দুজনেই মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে।
তপতী এবার নিস্তব্ধতা ভাঙলো। জিজ্ঞেস করলো, “তোমার খোঁজখবর নেই কেন?”
সোমনাথ কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সে কোনো উত্তর না-দিয়েই হাঁটতে লাগলো।
তপতী বললো, “যে খবর চায় সে যদি খবর না পায় তাহলে তার মনের অবস্থা কেমন হয়?”
“খুব কষ্ট হয়। তাই না?” সোমনাথ বেশ অস্বস্তি বোধ করছে।
“তুমি তো কবি। তুমিই উত্তর দাও।” তপতী সরলভাবে দায়িত্বটা সোমনাথের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলো।
কবি! পৃথিবীতে একমাত্র তপতীই এখনও তাকে কবি বলে মনে রেখেছে। কবিতার সঙ্গে বেকার সোমনাথের এখন কোনো সম্পর্ক নেই।
আজকের এই জনবিরল নদীতীরে দাঁড়িয়ে, হারিয়ে যাওয়া অতীতের অনেক কথা সোমনাথের মনে পড়ে যাচ্ছে।
হাওয়ায় অবাধ্য চুলগুলো সামলে নিয়ে সোমনাথ বললো, “অনেকদিন আগে প্রথম এখানে এসেছিলাম, সেদিনকার কথা মনে আছে তোমার?”
হাসলো তপতী। বললো, “তারিখটা ছিল ১লা আষাঢ়।”
“তারিখটা তোমার মনে আছে তপতী!” অবাক হয়ে গেল সোমনাথ। “ইতিহাসের ছাত্রী। পুরানো সব কথা মনে না রাখলে পাস করবো কী করে?” সহজভাবেই উত্তর দিলো তপতী।
তপতীর মুখের দিকে তাকালো সোমনাথ। ওর জন্যে ভীষণ মায়া হচ্ছে সোমনাথের। একবার ইচ্ছে হলো, ওর নরম হাত দুটো ধরে সোমনাথ বলে, “তপতী, ভালোবেসে তুমি আমাকে ধন্য করেছে। কিন্তু তোমার নির্বাচনের জন্যে সত্যি আমার দুঃখ হয়। একজন সহপাঠী হিসেবে আই জেনুইনলি ফিল স্যরি ফর ইউ।”
কিন্তু তপতীকে কিছু বলতে পারছে না সোমনাথ। মেয়ে হয়েও ওর আত্মবিশ্বাস আছে। তপতী নরম, কিন্তু লতার মতো পরনির্ভর নয়।
