হীরালালবাবু খবরাখবর রাখেন। বললেন, “আপনি তো জয়সোয়ালদের জিনিস বেচতে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছেন? আপনাকে দুটো পয়সা দিতে ওদের গায়ে লাগলো। অথচ আমি জানি নিজের গাঁয়ের তিন-চারটে ছোঁড়াকে ওরা ছ’মাসের ধারে মাল দিচ্ছে।”
হীরালালবাবুর সময়টা এখন ভালো যাচ্ছে। বললেন, “বউবাজারের কাছে গডেস মঙ্গলচণ্ডী আছেন। ওঁকে মাঝে মাঝে নিজের দুঃখ জানিয়ে আসবেন—মা কোনো কষ্টই রাখবেন না। মায়ের করণায় পর-পর দখোনা সায়েব বাড়ির কড়ি বগা টালি কিনলুম। দ’মাসের মধ্যে টু-পাইস এসেছে, কেন মিথ্যে বলবো।”
হীরালালবাবু বললেন, “সারাদিন এখন মশাই টো-টো করে রাস্তায় ঘরি। একখানা ভাঙবার মতো বাড়ির সন্ধান পেলেই বেশ কিছু হয়ে যাবে। এমন কিছু হাঙ্গামা নেই। ব্যবস্থা পাকা করে খবরের কাগজে একখানা বিজ্ঞাপন দিই—” সায়েব বাড়ি ভাঙ্গা হইতেছে। অতি মূল্যবান কাঠকাঠরা ও ভিনিসিয়ান টালি বিক্রয়। অমুক ঠিকানায় খোঁজ করুন। একখানা বোর্ডও করিয়ে রেখেছি। তাতেও লেখা থাকে—’সেল! সেল! সেল! সায়েব বাড়ি ভাঙা হইতেছে। ভিতরে খোঁজ করুন। আমার একটি হিন্দুস্থানী দারোয়ান আছে। সে ভাঙা বাড়িতেই বসে থাকে—ওইখানেই ইট কাঠ দরজা জানালা, মায় সায়েবদের ব্যবহার করা পুরানো কমোড পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যায়।”
হীরালালবাবু বললেন, “সায়েব বাড়ির কোনো খোঁজখবর থাকলে বলবেন। আপনাকে সইটেবল’ কমিশন দেবো।”
ভাঙা বাড়ির কথায় সোমনাথ বললো, “দাঁড়ান একটু ভেবে দেখি!”
গতকাল তপতীদের বাড়িতে যাবে কিনা ভাবছিল সোমনাথ। হাঁটতে হাঁটতে এলগিন রোডের ওপর একটা পুরানো বাড়ির দিকে সোমনাথের নজর পড়েছিল। সেখানে বোধহয় নতুন কোনো ফ্ল্যাটবাড়ি উঠবে—কারণ কুলিরা লরি থেকে নতুন একটা সাইনবোর্ড নামাচ্ছিল। সোমনাথ ঠিকানাটা হীরালালবাবকে দিয়ে দিলো।
“দেখো মা চণ্ডী, বলে হীরালালবাবু তখনই ছুটলেন। সারাদিন আর দেখা নেই।
দু-দিন পরে সকালে হীরালালবাবুর খোঁজ পাওয়া গেল। ভীষণ খুশী মনে হচ্ছে তাঁকে। সোমনাথের পিঠে হাত দিয়ে বললেন, “গডেস চণ্ডী দয়া না করলে এ-সযোেগ আসতো না, মিস্টার ব্যানার্জি। ঠিক দেখেছেন—একেবারে সায়েব বাড়ি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত বর্ম টিকে সাজানো। আজকেই বায়না করে এলাম।”
হীরালালবাবু বললেন, “আপনি শ’দেড়েক টাকা রাখুন। যদি তেমনি প্রফিট করতে পারি আরও দশ টাকা দেবো।”
সোমনাথ টাকাটা নিতে চাচ্ছিলো না। কিন্তু হীরালালবাবু নাছোড়বান্দা। বললেন, “খবর দেওয়াটাও বিজনেস তো মশাই। গডেস মঙ্গলচণ্ডী কী ভাববেন, যদি আপনাকে আপনার প্রাপ্য না দিই? আরও খবরটবর রাখবেন। তবে জেনুইন সায়েব বাড়ি হওয়া চাই। বাঙালী বাড়ি ভেঙে সুখ নেই মশাই-জল ঢেলে ঢেলে বাড়ির কিছু রাখে না।”
জেনুইন সায়েব বাড়ি কাকে বলে জানবার লোভ হলো সোমনাথের।
হীরালালবাবু বললেন, “সায়েবদের জন্যে যেসব বাড়ি তৈরি হয়েছিল। এবার দাঁত বার করে হাসলেন তিনি। বললেন, “সায়েব বাড়ি কলকাতায় একখানাও থাকবে না। আমরা সব ভেঙে বেঁচে ফেলবো। জমির দাম যে অনেক বেড়ে গেছে। একখানা সায়েব বাড়িতে বড়-জোর দুজন সায়েব ভাড়া থাকতো। তার বদলে সেই জায়গায় পঁচিশ-তিরিশটা ফ্ল্যাট তৈরি হবে অনেক ভাড়া উঠবে।”
হীরালালবাবু বললেন, “তাহলে নজর রাখতে ভুলবেন না, মশাই। এই এলগিন রোড ধরেই আমি গতমাসে দুবার ঘরেছি—অথচ এই বাড়িটা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিলো।”
টাকাটা পকেটে পুরে এই দুপুরবেলায় কলেজের সেই শ্যামলী মেয়েটার কথা সোমনাথের মনে পড়ে যাচ্ছে। ব্যবসার সময়ে অন্য কারুর কথা এখানে কেউ ভাবে না। কিন্তু সোমনাথ সত্যিই কি শেষপর্যন্ত এদের একজন হতে পারবে? আশা-নিরাশার মধ্যে দোল খাচ্ছে সে। বিকেলে মিটিং আছে মিস্টার মাওজীর সঙ্গে। তার আগে অফুরন্ত সময়।
অফিসের টেলিফোনটা এই সময় বেজে উঠলো। সেনাপতি তার নিজস্ব কায়দায় ফোন ধরলো। তারপর সোমনাথকে অবাক করে দিলো, “বাবু আপনার ফোন।” সোমনাথকে কে ফোন করতে পারে?
ফোনের ওপাশে তপতী রয়েছে সোমনাথ ভাবতেও পারেনি।
কলেজ স্ট্রীট থেকে ফোন করছে তপতী। আজ হঠাৎ রিসার্চের কাজ থেকে ছুটি পাওয়া গেছে।
তপতীকে যে এখনই আসতে বলা উচিত তা সোমনাথ বুঝতে পারছে। তপতী নিশ্চয় কিছু বলতে চায়, না হলে কেন সে ফোন করবে?
ফোনে সোমনাথ বললো, “যদি সময় থাকে, চলে আসতে পারো।”
১৫. তপতী বাহাত্তর নম্বর ঘরে হাজির হলো
খুঁজে খুঁজে তপতী আধঘণ্টার মধ্যে কানোরিয়া কোর্টের বাহাত্তর নম্বর ঘরে হাজির হলো। সোমনাথ অন্য কোথাও তাকে আসতে বলতে পারতো। অন্তত মেট্রো সিনেমার তলায় দাঁড়ালে ওর অনেক সুবিধে হতো। কিন্তু ইচ্ছে করেই সোমনাথ এখানকার কথা বলেছিল। তপতীকে ঠকিয়ে লাভ নেই। সে নিজের চোখে সোমনাথের অবস্থা দেখুক।
দুর থেকে তপতীকে কাছে আসতে দেখে সোমনাথের বকটা অনেকদিন পরে দলে উঠলো।
তপতীর ডানহাতে বেশ কয়েকখানা বই। একটা ছাপানো-মিলের শাড়ি পরেছে তপতী। সঙ্গে সাদা ব্লাউজ। ওর শ্যামলিমার সঙ্গে হঠাৎ যেন অন্য কোনো ঔজল্য মিশে এই কদিনে। তপতীকে অসামান্য করে তুলেছে। ওর মাথার সামনের চুলগুলো তেমনি অবাধ্যভাবে কপালের ওপর এসে পড়েছে। আজ তপতীকে সত্যিই বিদষী সন্দরী মনে হচ্ছে।
তপতীর চোখে চশমা ছিল না আগে। একটা কালো ফ্রেমের আধুনিক ডিজাইনের চশমা পরেছে সে। চশমাটা সত্যি ওর মুখের ভাব পাল্টে দিয়েছে। ওকে অনেক গভীর মনে হচ্ছে, ওর যে বয়স হচ্ছে, ও যে আর কলেজের ছোট মেয়ে নেই, তা এবার বোঝা যাচ্ছে।
