তবু সোমনাথের মনটা শান্ত হচ্ছে না।
দেওর ব্যবসা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে দেখে কমলা বউদি ভরসা পেলেন।
সোমনাথ পরের দিন অশোক চ্যাটারি অফিস পর্যন্ত গিয়েছিল। ভাবলো একবার শ্রীময়ীকে ফোনে ধরবে কিনা। নববিবাহিতা বধূ কোনো অনুরোধ করলে অশোক চ্যাটার্জি তা ফেলতে পারবে না। কিন্তু ইচ্ছে করলো না সোমনাথের। যেখানে সন্ধ্যা হয় সেইখানেই বাঘের ভয়। অফিসের দরজার গোড়ায় অশোকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। বরটি ভালোই ম্যানেজ করেছে শ্রীময়ী। মনটি বেশ উদার। সোমনাথের সঙ্গে নমস্কার বিনিময় হলো।
অশোক চ্যাটার্জি আজও সৌজন্য প্রকাশ করলো-ব্যবসার খোঁজখবর নিলো। কিছু, অর্ডার পেয়েছে শুনে খুশী হলো—কিন্তু সোমনাথ খামের কথাটা তুলতে পারলো না।
সাদিক, আবার জিজ্ঞেস করলেন, “জয়সোয়ালকে একটু শিক্ষা দিলেন?”
সোমনাথ পরাজয় স্বীকার করলো। বললো, “মিস্টার গাঙ্গুলীর কাছে ছোট হতে পারলাম না।”
আদকবাবু বললেন, “এ-লাইনে যদি কিছু করতে চান পারচেজ অফিসারদের সঙ্গে ভাব করুন।”
চার নম্বর টেবিলের উমানাথ যোশী বেশ মনমরা হয়ে বসে আছে। ছোকরা কোনো লাইনেই তেমন সুবিধে করতে পারছে না। রাঠী নামে এক ভদ্রলোকের কোম্পানিতে সে কাজ করতো। মন কষাকষি হওয়ায় চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুর করেছে। কিন্তু হাতে তেমন কাজকম্ম নেই।
যোশী যে-লাইনে কাজ-কারবার করে সেই একই লাইনে ব্যবসা করছেন দু নম্বর টেবিলের সুধাকর শর্মা। অথচ সুধাকরবাবুর নিঃশ্বাস ফেলবার সময় নেই। একজন পার্টটাইম টাইপিস্ট রেখেছেন। কিন্তু সে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। সুধাকরবাবু একটা সারাক্ষণের টাইপিস্ট রাখবার কথা ভাবছেন। অনেক টেলিফোন আসে সুধাকরবাবুর নামে। ফকির সেনাপতি বারবার হাঁক দেয়-সায়েব আপনার টেলিফোন।
সুধাকর শর্মার সাফল্যের রহস্যটা বুঝতে পারে না সোমনাথ। যোশীর কাজকর্ম নেই তেমন—তাই সোমনাথের সঙ্গে মাঝে মাঝে কপ করে। যে.শী বলে, “শর্মাজী জাদ, জানেন। পারচেজ অফিসারকে মন্তর দিয়ে বশ করে ফেলেন?”
শমীজীর কাজ করেন না আদকবাবু। উনি বলেন, “পারচেজ অফিসার যদি গোখরো সাপ হয়—শর্মাজী হচ্ছেন, সাপড়ে। যতই ফণা তুলক, অফিসারকে ঠিক বশ করে শর্মাজী নিজের ঝাঁপিতে পরে ফেলবেন!”
কিসের যে ব্যবসা করেন না সুধাকরজী তা সোমনাথ বুঝতে পারে না। ঝোলাগড় থেকে আরম্ভ করে, সাবান, টয়লেট পেপার, কাঁচের গেলাস সব কিছুই সাপ্লাই করেন।
যোশী বলে, “সুধাকরজীর লক্ষ্মী হলো কোন্নগরের এক কারখানা। সেখানে সাড়েআটশ’ পিস সাবান প্রতি মাসে সাপলাই করতেন ভদ্রলোক। ওঁর গিন্নির সঙ্গে ওখানকার ম্যানেজারবাবুর দর সম্পর্কের আত্মীয়তা আছে। আগে প্রত্যেক ওয়াকারকে হাত রোবার জনো প্রতি মাসে একখানা সাবান দেওয়া হতো। এরপর সুধাকরজী নাকি ইউনিয়নের কোনো পাল্ডাকে পাকড়াও করেন। ওরা প্রতিমাসে দু’খানা সাবান দাবি করলো—কোম্পানি দিতে বাধ্য হয়েছে। সুধাকরজী মাসে সতেরোশ’ পিস সাবান সাপ্লাই করতে আরম্ভ করলেন। তারপর কীভাবে অন্য অনেককে ম্যানেজ করেছেন। সুধাকরজীর কাজ এত বেড়েছে যে নিজের আলাদা আপিসের কথা ভাবছেন।”
সোমনাথ মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখছে সেও সুধাকর শর্মার মতো কাজকর্ম বাড়িয়ে চলেছে। কিন্তু কী যে মন্তর সুধাকরবাবু জানেন—সে বুঝতেই পারে না। টো টো করে সেও সারাদিন অফিসে অফিসে ঘুরছে, কিন্তু সুবিধে করতে পারছে না।
সুধাকর শর্মা কোনো প্রশ্নের উত্তর দেন না। শুধু ফিক করে হাসেন। আর সন্ধ্যা হলেই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েন। ফকির সেনাপতি বলে, “শর্মাজী মাঝে মাঝে অনেক রাতে ফিরে আসেন। তখন নাকি একটু বেসামাল অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায় তাঁকে।” সেনাপতি বিরক্ত হতে পারে না। কারণ সুধাকর শর্মা তাকে আলাদা করে প্রতি মাসে পঁচিশ টাকা দেন। অবশ্য সেনাপতিকে তার বদলে একশ টাকার ভাউচার সই করতে হয়। কিন্তু সেনাপতির তাতে আপত্তি নেই। কিছু টাকা তো মিলছে।
সুধাকর শর্মার জামাকাপড় বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বুশ শার্ট এবং টেরিলিন প্যান্ট পরেন। অফিসের আলমারিতে একটা কোট এবং টাইও আছে। বড় কোনো পার্টির সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলে অনেক সময় কোট চড়িয়ে নেন। সেনাপতি একটা ব্রাশ দিয়ে সুধাকরের কোট ঝেড়ে দেয়।
১৪. পাশের ঘরের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ
পাশের ঘরের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছে সোমনাথের। এদের দু-একজনের নিজস্ব গোডাউন আছে। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার নিয়ে এরা অনেক জিনিস গুদামে রেখে দেয়। একেবারে পরের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ব্যবসার স্তর এরা পেরিয়ে এসেছে। কলকাতা ছাড়াও, উড়িষ্যা এবং আসামের দর দর প্রান্তে এদের বেচাকেনা চলে।
ঐ ঘরে টিমটিম করে হীরালাল সাহা বলে এক বাঙালী ভদ্রলোক জলছেন। হীরালাল সাহা রেল আপিসে কাজ করতেন। একবার সাইড বিজনেস হিসেবে কিছু পুরানো রেলওয়ে স্লিপার নিলাম ডাকে কিনেছিলেন। তাতে পাঁচ হাজার টাকা লাভ করেছিলেন। সেই সময় শ্যামবাজারে একখানা পুরানো বাড়ি ভাঙা হচ্ছিলো। ওই বাড়ির ইট কাঠ জনািলা দরজা সব কিনেছিলেন হীরালাল সাহা। অফিসের সহকর্মীরা পিছনে লাগলো, হীরালালবাবু চাকরি ছেড়ে দিলেন।
হীরালালবাবু বলেন, “গডেস মঙ্গলচণ্ডীর কাইন্ডনেসে করে খাচ্ছি। জানেন মিস্টার ব্যানার্জি, বাঙালীদের সবচেয়ে বড় শত্র, হলো বাঙালীরা। আমি দেখুন চাকরিও করছিলাম, বিজনেস থেকেও টু-পাইস আনছিলাম—তা আমার বাঙালী বন্ধুদের সহ্য হলো না। আর এই বিজনেস পাড়ায় দেখুন—গজরাতী গজরাতীকে, সিন্ধি সিন্ধিকে দেখছে। মারোয়াড়ীদের তো কথাই নেই। যে-আপিসে মারোয়াড়ী আছে সেখানে পারচেজ বলুন, বিক্রির এজেন্সি বলুন জাতভাইদের জামাই আদর।”
