ইতিমধ্যে তিরিশ টাকা রোজগার হয়েছে শুনে বেজায় খুশী হয়েছেন কমলা বউদি। লুকিয়ে বউদিকে খাওয়াতে চেয়েছিল সোমনাথ। বউদি রাজী হলেন না। খুব ধরাধরি করতে বউদি বললেন, “তার বদলে গাড়িটা বার করে আমাকে কবীর রোডে মামার বাড়িতে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে এসো।” দাদা সেলফ ড্রাইভ করেন। গাড়িটা মাঝে মাঝে স্টার্ট দিয়ে চাল রাখার কথা বউদিকে লিখেছেন। সোমনাথের অসুবিধে নেই। গাড়ি চালানোটা বউদি ও সোমনাথ দুজনে একসঙ্গে শুরু করেছিল। কমলা বউদি দু-দিন চালিয়ে আর সাহস পাননি। কিন্তু সোমনাথ ড্রাইভিং লাইসেন্স করিয়ে ফেলেছিল সেই বি-এ পড়ার সময়েই।
বউদিকে সেদিন মামার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে একঘণ্টা পরে আবার ফিরিয়ে আনলে সোমনাথ। পথে লেকের ধারে গাড়ি থামিয়েছিল। সোমনাথ জোর করে বউদিকে কোকাকোলা খাওয়ালো কোনো আপত্তি শুনলো না। দেওরের প্রথম উপার্জনের পয়সায় কোকাকোলা খেতে কমলা বউদির খুব আনন্দ হচ্ছিলো। ওঁর ইচ্ছে, বাবার জন্যেও একটু মিষ্টি কেনা হোক। সোমনাথ কিন্তু এই অবস্থায় বাড়িতে কিছুই জানাতে চায় না। বউদিও সব ভেবে জোর করলেন না। বিজনেস লাইনে শেষ পর্যন্ত যদি সোমনাথ হেরে যায়, এবং সবাই যদি তা জানতে পারে, তাহলে বেচারার আত্মবিশ্বাস চিরদিনের মতো নষ্ট হয়ে যাবে। ওর আত্মসম্মানে আঘাত লাগকে এমন কিছু করতে কমলা বউদি রাজী নন।
তবে শেষপর্যন্ত একটা রফা হলো। সোমনাথের পয়সায় বাবার জন্যে একশ’ গ্রাম ছানা কেনা হবে, কিন্তু কে পয়সা দিয়েছে বাবাকে বলা হবে না। এই ব্যবস্থায় সোমনাথের আপত্তি নেই।
জোড়ে-জোড়ে তরুণ-তরুণীদের লেকের ধারে ঘুরে বেড়াতে দেখে, কমলা বউদির একটু রসিকতা করতে ইচ্ছে হলো দেওরের সঙ্গে। কমলা বউদির খুব ইচ্ছে কম বয়সেই সোমনাথের বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের প্রসঙ্গ তুলতে সাহস হলো না। যা দিনকাল, ছেলেদের কপালে বিধাতাপুরুষ কী লিখে রেখেছেন কে জানে?
পাইপের মধ্য দিয়ে কোকাকোলা টানতে টানতে কমলা বউদি বললেন, “আমার মন বলছে ব্যবসাতে তোমার খুব নাম হবে।”
“আপনার মুখে ফল-চন্দন পড়ুক বউদি।” সোমনাথ আন্তরিকভাবে বললো।
বউদি বললেন, “আচ্ছা ঠাকুরপো, তুমি যদি বিরাট বিজনেসম্যান হও কী করবে?”
মাথা চুলকে সোমনাথ বললো, আপনাকে কোম্পানির চেয়ারম্যান করবো। আর বেচারা সুকুমারকে একটা বড় পোস্ট দেবো। সুকুমার তদ্বির করে আমাকে একটা ইন্টারভিউ পাইয়ে দিয়েছিল। আমি ওর জন্যে কিছুই করতে পারিনি।”
কমলা বউদি বললেন, “শুনেছি ওদের বন্ড অভাব। ওর সঙ্গে দেখা হলে বোললা, চাকরির অ্যালিকেশনের জন্যে টাকাকড়ি লাগলে যেন আমাকে বলে। তোমার দাদার কাছ থেকে মাসে তিরিশ টাকা করে হাতখরচা আদায় করছি।”
আদকবাবুর কথা যে মিথ্যে নয়, তা তিনদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলো সোমনাথ। অশোক চ্যাটার্জির অফিস থেকে খামের অর্ডারটা পাবে এ সম্বন্ধে সে প্রায় নিশ্চিন্ত ছিল। কিন্তু মিস্টার গাঙ্গুলী গম্ভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, হলো না। আপনার দামটা অনেক বেশি।”
মুখ শুকনো করে যখন সোমনাথ বেরিয়ে আসছিল, তখন মিস্টার গাঙ্গুলীর ডিপার্টমেন্টের সেই ক্লাকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। শিক্ষিত বেকারকে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে দেখে ভদ্রলোকের বোধহয় একটু মায়া হলো। তিনি বলেই ফেললেন, “জয়সোয়াল কোম্পানির কাছে খাম কিনে বুঝি সাপ্লাই করছেন? ওরাই তো আপনার থেকে সন্তা কোটেশন দিয়ে গেল। বললো, সোজা ওদের কাছ থেকে নিলে আমাদের লাভ।”
সোমনাথ তাজব। ব্রিজবাবকে জিজ্ঞেস করতে তিনি আকাশ থেকে পড়লেন! ব্যাপারটা মোটেই স্বীকার করলেন না। বরং বললেন, “বিজনেসে আমরা সবাই ভাই-ভাই। আমি কি করে আপনার পেছনে ছুরি লাগাবো?”
কুণ্ডুবাবু বলে এক কর্মচারি চুপচাপ ওদের কথাবার্তা শুনছিল। ব্রিজবাব চলে যেতেই ফিসফিস করে বললেন, “উনিই তো লোক পাঠিয়েছেন। কেন পাঠাবেন না। এইটাই তো বিজনেসের নিয়ম। আপনি যদি ব্লিজবাবর থেকে কম দামে অন্য কোথাও খাম পেতেনছাড়তেন?”
সব শুনে আদকবাবু বললেন, “এ তো আমি জানতাম। আপনি যদি জয়সোয়ালকে উচিত শিক্ষা দিতে চান তাহলে ঐ মিস্টার গাঙ্গুলীকে ম্যানেজ করুন। ব্রিজবাবর কাছে যদি প্রমাণ করতে পারেন আপনি না থাকলে ঐ কোম্পানি থেকে কিছুতেই অর্ডার আসবে না—তাহলে উনি আবার আপনার জুতোর সুখতলা হয়ে থাকবেন!”
“ওঁর অপমান হবে না?” সোমনাথ জিজ্ঞেস করে।
“দূর মশায়! মান থাকলে তবে তো অপমান হবে। এটা তো বাজার, ল্যাং দেওয়া-নেওয়া চলবে জেনেই তো এরা মার্কেটে এসেছে।”
বেশ রাগ হচ্ছে সোমনাথের। ব্রিজবাবকে যোগ্য শিক্ষা দেবার একটা প্রচণ্ড লোভ হচ্ছে। কিন্তু আদকবাবু যে মতলব দিচ্ছেন তা সোমনাথ পারবে না। মিস্টার গাঙ্গুলী কেন তার কথা শুনবেন? তাছাড়া কম দামে যেখানে মাল পাওয়া যায় সেখান থেকে কেনবার জন্যেই তো কোম্পানি মিস্টার গাঙ্গুলীকে রেখেছেন।
আদিকবাবু ওসব বুঝলেন না। বললেন, “এ-লাইনে অনেকদিন হলো। পারচেজ অফিসারের কত গল্প কানে আসে। ওঁরা ইচ্ছে করলে যা খুশী তাই করতে পারেন।
বাড়িতে ফিরে বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় ব্রিজবাবকে হারিয়ে দেবার ব্যাপারটা সোমনাথের মাথায় ঘুরছে। বউদিকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে লাভ হলো না। সোমনাথ জানতে চেয়েছিল, প্রতিহিংসা জিনিসটা কেমন? বউদি যথারীতি মায়ের কথা তুললেন। মা বলতেন, কুকুর তোমাকে কামড়াতে এলে তুমি কুকুরকে তাড়িয়ে দেবে। কিন্তু তুমি কুকুরকে কামড়াতে পারে না।
