আরও এক চুমক চা খেলো সোমনাথ! না, হিসেব ঠিক হচ্ছে না—কোথায় যেন ভুল থেকে যাচ্ছে। একশ’ বছরে অন্তত পঁচিশটা লিপ-ইয়ার পড়বে—তার অর্থ, বাড়তি পঁচিশ দিন, হইচ মিনস আরও পঞ্চাশখানা চিঠি।
হিসেবের ভারে মাথাটা যখন বেশ গরম হয়ে উঠেছে তখন হঠাৎ বাইরের দিকে নজর পড়লো সোমনাথের। একজন ছোকরা কোটপ্যান্ট পরে লালবাজার পুলিশ হেডকোয়ার্টারের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছে। কলেজবান্ধবী শ্রীময়ীর নববিবাহিত হাজবেন্ড।
ভদ্রলোক বি কে সাহার দোকানের কাছে দাঁড় করানো একটা গাড়ির সামনে দাঁড়াতেই সোমনাথ দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। “মিস্টার চ্যাটাজি না? চিনতে পারছেন?”
অশোক চ্যাটার্জি গাড়ির মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছিল। সোমনাথের গলা শুনেই থমকে দাঁড়ালো। সোমনাথের দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসিমুখে অশোক চ্যাটার্জি বললো, “খুব চিনতে পারছি। আপনিই তো মিস্টার ব্যানার্জি? গড়িয়াহাটের মোড়ে সেদিন শ্রীময়ী আলাপ করিয়ে দিলো।”
লালবাজারের সামনে গাড়ি দাঁড়াতে দেয় না। তাই অশোক চ্যাটার্জি এবার সোমনাথকে গাড়ির মধ্যে তুলে নিলো।
মিশন রোয়ের ওপরেই ওদের অফিস। ওখানকার ভালো একটা পোস্টে রয়েছে অশোক চ্যাটার্জি। ভালো পোস্টে না থাকলে শ্রীময়ীর মতো চালু মেয়ে কেন অকালে টাক-পড়া শ্যামবর্ণের এই নাদুস-নুদুস ছোকরাকে বিয়ে করতে যাবে। কলেজ-জীবনে শ্রীময়ী যার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতো সেই সমর ছিল সত্যিই সদশন। তপতীর কাছে শুনেছিল, শ্রীময়ী বলতো ছেলেরা সুদর্শন না হলে তার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। আপেলের মতো টকটকে ফর্সা, স্মার্ট, লম্বা ছেলে ছাড়া শ্রীময়ী কিছুতেই বিয়ে করবে না। সিনেমার হিরোর মতো চেহারা ছিল সমরের, কিন্তু সে এ-জি-বেঙ্গলের লোয়ার-ডিভিসন কেরানি হয়েছে।
অশোক চ্যাটার্জির গাড়িতে বসে শ্রীময়ীর ভূতপবে বন্ধুদের কথা সোমনাথের ভাবা উচিত হচ্ছে না। সে বললো, “সেদিন আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগলো।”
গাড়ি চালাতে চালাতে অশোক বললো, “একদিন বাড়িতে আসতে হবে। শ্রীময়ী খুব খুশী হবে। কিন্তু একলা এলে হবে না গিন্নিকে আনা চাই।”
হেসে ফেললো সোমনাথ। অশোক অপ্রস্তুত হলো। বোকা-বোকা হেসে বললো, “ওই পাট এখনও চোকানো হয়নি বুঝি?”
সোমনাথ এবার জিজ্ঞেস করলো, “আপনাদের অফিসে স্টেশনারি পারচেজ করেন কে?”
“আমি করি না। তবে যিনি করেন, তিনি আমার বিশেষ ফ্রেন্ড।” অশোক বললো।
ওঁর সঙ্গে একটু আলাপ করিয়ে দেবেন? পার্টটাইম বিজনেস করছি। বিজনেস ছাড়া বাঙালীদের মুক্তি নেই বুঝতেই তো পারছেন, মিস্টার চ্যাটার্জি।”
“সে কথা বলতে?” অশোক উৎসাহ দিলো।
ছেলেটি সত্যিই ভালো। সোজা সোমনাথকে নিয়ে গেলো মিস্টার গাঙ্গুলীর কাছে। বললো, “আমার বিশেষ পরিচিত। যদি সম্ভব হয়, একটু সাহায্য করবেন।”
ভাগ্য ভালো। মিস্টার গাঙ্গুলী কাগজের নমুনা দেখলেন। পঁচিশ রিম এখনই দরকার। রেট জানতে চাইলেন। মল্লিকবাবুর ছাপানো প্যাড বার করে সোমনাথ একটা কোটেশন ওখানেই লিখে দিলো।
মিস্টার গাঙ্গুলী কর্মচারীকে ডেকে বললেন, “দেখুন তো গতবার আমরা কী দামে কাগজ কিনেছিলাম।” ভদ্রলোক একটা ফাইল এনে মিস্টার গাঙ্গুলীর সামনে ধরলেন। দামটা গোপনে দেখে নিয়ে গাঙ্গুলী বললেন, “আপনার রেট ভালোই আছে। আমরা নগদ টাকায় কিনে নেবো।”
খামের ব্যাপারে একটু সময় লাগবে। নমুনা এবং কোটেশন রেখে যেতে বললেন। স্টকের অবস্থা যাচাই করতে হবে।
বেলা পাঁচটার মধ্যে ব্যবসা খতম। সব হাঙ্গামা চুকিয়ে খরচখরচা বাদ দিয়ে কড়কড়ে তিনখানা দশ টাকার নোট হাজির হয়েছে সোমনাথ উদ্যোগ-এর মালিক সোমনাথ চ্যাটার্জির পকেটে। জীবনে প্রথম রোজগার। প্রথম প্রেমের মতোই সে এক অপব অভিজ্ঞতা। কলকাতা শহরের বিবর্ণ রপ মছে গিয়ে হঠাৎ সমস্ত শরীরটা সোমনাথের চোখের সামনে ঝকঝক করছে। ব্যবসায় যে রস আছে, তা সোমনাথ এবার বুঝতে পারছে। উত্তেজনা চাপতে না পেরে মানিব্যাগ বার করে সোমনাথ টাকাটা আবার গুণলো।
অফিসে ফিরে এসে বিশুবাবুর খোঁজ করলো সোমনাথ। তিনি নেই কোনো এক কাজে কলকাতার বাইরে গেছেন। আদকবাবু আসতেই মিষ্টি আনতে দিচ্ছিলো সোমনাথ। হাঁ-হাঁ করে উঠলেন আদকবাবু। “এই জন্যে বাঙালীর বিজনেস হয় না। এই তো আপনার প্রথম নিজস্ব ক্যাপিটাল হলো। এখনই খেয়ে উড়িয়ে দিলে চলবে কেন?—আগে হাজার দশেক টাকা হোক—তারপর আপনার কাছ থেকে জোর করে মিষ্টি খাবো।”
সোমনাথ খুশী মনে রয়েছে। বললো, “দেখুন না! যদি খামের কোটেশনটা লেগে যায়, তাহলে আমাকে পায় কে।”
ব্রিজ জয়গোয়ালের টাকাও যে সে মিটিয়ে দিয়েছে, তা সোমনাথ এবার আদকবাবুকে জানিয়ে দিলো। “উনি কী বললেন?” আদকবাবু জানতে চাইলেন।
“খুব খুশী হলেন। কীভাবে কোথায় বিক্রি করলাম সব বললম ওঁকে।”
“অ্যাঁ!” আঁতকে উঠলেন আদকবাবু। “করলেন কি মশায়। আপনার পার্টির নাম ব্রিজবারকে বলে দিলেন?”
তাতে মহাভারতের কী অশুচি হয়েছে সোমনাথ বুঝতে পারলো না। আদকবাবু বেশ বিরক্তভাবে বললেন, “আপনি বড় ফ্যামিলির ছেলে, বিজনেস করতে এসেছেন, আর আমি গরীব মানুষ খাতা লিখে খাই—আমার মুখে সব কথা মানায় না। তবু বলছি, এ-লাইনে কখনও নিজের তাসটি অন্য কাউকে দেখাবেন না। কাকে সাপ্লাই করছেন, তা ভুলেও কাউকে বলবেন না। যেখানে ঘোরাঘুরি করছি আমরা—এটা বাজারও বটে, জঙ্গলও বটে।”
