আদকবাবু একদিন সোমনাথকে বললেন, “আপনি চালিয়ে যান। বেচাকেনা করে পয়সা আনুন—তারপর তো খাতা তৈরির জন্যে আমি আছি। ‘
সোমনাথ চুপচাপ ওঁর কথা শুনে যাচ্ছিল। কোথায় বিজনেস তার ঠিক নেই, এখন থেকে সেলস ট্যাক্স ইনকাম ট্যাক্সের চিত! আদকবাবু বোধহয় একটু মনঃক্ষম হলেন। সোমনাথকে বললেন, “বিজনেসে যখন নেমেছেন তখন এই খাতা জিনিসটাকে ছোট ভাববেন, স্যর। আপনার ওই টেবিলেই তো মোহনলাল নোপানি বসতো। বিজনেসের কটবদ্ধি তো খব ছিল। বম্বে থেকে প্লাস্টিক পাউডার আনিয়ে তার সঙ্গে ভেজাল মিশিয়ে বেশ টু-পাইস করছিল। কিন্তু হঠাৎ ঘটিবাটি ফেলে নোপানিকে উধাও হতে হলো কেন?”
উত্তরটা আদুকবাবু নিজেই দিলেন। “খাতা ঠিক মতো রাখেনি। ভেবেছিল ওটাও নিজে ম্যানেজ করবে। এখন ইনকাম ট্যাক্স ও সেলস ট্যাক্সের—শনি রহ, দুজনেই একসঙ্গে ছোকরার ওপর নজর দিয়েছেন!”
নোপানির কথাই তো বিশুবাবু বলেছিলেন, সোমনাথের মনে পড়লো। “মিস্টার বেস তো সেনাপতিকে ভদ্রলোকের বাড়িতেও পাঠিয়েছিলেন। নোপানি সেখানে নেই। কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছেন।” সোমনাথ বললো।
পানের ছোপধরা দাঁতের পাটি বার করে আদকব্যব; হাসলেন। ফিসফিস করে বললেন, “বাড়ি না ছেড়ে উপায় আছে? সাতাশ হাজার টাকার প্রেমপত্তর নিয়ে সেলস ট্যাক্স ঘোরাঘুরি করছেন। প্রেমপত্তর বোঝেন তো?” আদকবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
না বুঝে উপায় আছে? তপতীর চিঠিখানা গতকালই তো পাঁচবার পড়েছে সোমনাথ। কপাল কুঞ্চিত করে আদকবাবু বললেন, “আমাদের লাইনে প্রেমপত্তর মানে সার্টিফিকেট। ট্যাক্সো ঠিক সময় না দিলে আলিপরের সার্টিফিকেট অফিসার ঘটিবাটি বাজেয়াপ্ত করার জন্যে এই সাটিফিকেট ইস্য, করে। সার্টিফিকেট অফিসের বেলিফ রসময় হাজরাকে তো দেখেননি—সাক্ষাৎ চেঙ্গিজ খাঁ! টাকা না দিলে ভাতের হাঁড়ি পর্যন্ত ঠেলাগাড়িতে চড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে। কোনো মায়াদয়া করে না।”
কোনোরকম রোজগার না করেই সার্টিফিকেট অফিসের পেয়াদা রসময় হাজরার কাল্পনিক কালাপাহাড়ী মতি সোমনাথকে একটু বিমর্ষ করে তুললো। এতোদিন সার্টিফিকেট বলতে বেচারা পরীক্ষার সার্টিফিকেট এবং ক্যারেকটার সার্টিফিকেট বুঝতো। আলিপরের সার্টিফিকেট অফিসারের নাম সে কোনোদিন শোনেইনি।’আদকবাবু ফিসফিস করে খবর দিলেন, “আপনি ভাবছেন, নোপানি চম্পট দিয়েছে কলকাতা থেকে একেবারে বাজে কথা। এই কলকাতাতেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে এখন যদি নোপানি বলে ডাকেন। চিনতেই পারবে না। নাম নিয়েছে, প্রেমনিধি গুপ্ত!”
খাতা লেখা বন্ধ রেখে আদকবাবু বললেন, “আপনাকে সত্যকথা বলছি, এখন লকিয়ে লুকিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করছে, আমার হাতে ধরছে। বলছে, ‘আদকবাবু বাঁচান।’ রোগী মরে যাবার পর খবর দিলে ডাক্তার কী করবে বলুন?”
আদিকবাবু ওঁর চশমার ফাঁক দিয়ে সোমনাথের দিকে তাকালেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “কী বুঝলেন?”
“বুঝলম নোপানি ফ্যাসাদে পড়েছে।”
সোমনাথের উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন না আদকবাবু। বললেন, “নোপানি হচ্ছে জাত ব্যবসাদার—ওর বিপদ ও ঠিকই সামলাবে। আপনি কী বুঝলেন? আপনাকে দেখে শিখতে হবে—ঠেকে শিখতে গেলে এ লাইনে স্রেফ গাড়ী চাপা পড়ে যাবেন। শিক্ষাটা হলো এই যে শুধু রোজগারের চেষ্টা করলে হবে না—সেই সঙ্গে হিসেবের খাতাখানি পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন রেখে যেতে হবে।”
বুড়ো আদকবার যে সোমনাথের ওপর মায়া পড়েছে তা সেনাপতি দরজার কাছে বসে থেকেই বুঝতে পারছে। আদকবাবু ফিসফিস করে বললেন, “যে-লাইনে এসেছেন—পাইস আছে। অনেকে এখন রাতারাতি লাল হচ্ছে। এই যে শ্রীধরজী—কেমিক্যাল বেঁচে বেশ কামাচ্ছেন। কিন্তু এগারোখানা কোম্পানি-এর টুপি ওর মাথায় এমন কায়দায় পরিয়ে যাচ্ছেন যে আপনার মনে হবে রামকৃষ্ণ মিশনের অ্যাকাউন্ট। সেলস ট্যাক্স অফিসার নাক দিয়ে শকলে ধপধনোর গন্ধ পাবে!”
এ-লাইনের প্রথম বউনি আদকবাবুর অনগ্রহেই হলো। জয়সোয়ালদের স্টেশনারি দোকানের খাতা উনি রাখেন। ওখানকার ব্রিজবাবর সঙ্গে সোমনাথের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন আদকবাবু। বলেছিলেন, “বসে থাকবেন কেন? চেষ্টা করুন।”
ব্রিজবাব খুব বেশি ভরসা করেননি ছোকরা সোমনাথের ওপর। তবে বলেছিলেন, “ড়ুপ্লিকেটিং কাগজ এবং খামের স্টক রয়েছে। দেখুন যদি সেল করতে পারেন। আদকবাবু যখন এর মধ্যে রয়েছেন তখন আপনাকে অবিশ্বাস করবো না।”
রাস্তায় বেরিয়ে সোমনাথ একশ’ রিম ড়ুপ্লিকেটিং কাগজ এবং লাখখানেক খাম বারবার চোখের সামনে দেখতে লাগলো। একলক্ষ খাম কোথায় বেচবে সে ভেবেই পেলো না। সোমনাথের মাথায় নানা অদ্ভুত চিন্তা আসছে! একলক্ষ খাম মানে একলাখ চিঠি। সে কি সোজা ব্যাপার।
লালবাজারের সামনে বি কে সাহার প্রখ্যাত চায়ের দোকানের পাশে রেস্তরাঁয় বসে এক কাপ চা খেতে খেতে সোমনাথ হিসেব করতে লাগলো : নিজের সঙ্কোচ কাটিয়ে তপতীকে যদি প্রতিদিন একখানা চিঠি লেখে তাহলেও বছরে মাত্র ৩৬৫ খানা খাম লাগবে। দশ বছর ধরে অবিশ্রান্ত চিঠি লেখা চালিয়ে গেলেও মাত্র ৩৬৫০ খানা খাম খরচ হবে। অলরাইট—তপতীকেও যদি সোমনাথ কিছু, খাম পাঠিয়ে দেয় এবং সেও যদি রোজ একখানা করে চিঠি লেখে তাহলে সামনের দশ বছরে আরও ৩৬৫০ খানা খাম কাজে লাগবে। অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে সাত হাজার তিনশ’ খাম। অঙ্কটা নেশার মতো সোমনাথের মাথার ওপর চেপে বসেছে। একশ’ বছরেও তাহলে একলাখ খাম খরচ হচ্ছে না-লাগছে মাত্র তিয়াত্তর হাজার খাম।
