কেদিয়াজী এবার বিশুবাবুকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে কি সব আলোচনা করলেন। তারপর ফিরে এসে কেদিয়াজী ফিক-ফিক করে হাসতে লাগলেন। সোমনাথকে বললেন, “আচ্ছা কোনো কোম্পানিকে আপনি হাতিটা সেল করুন। আচ্ছা কমিশন মিলবে।”
“বড় বড় কোম্পানি কেন হাতি কিনতে যাবে?” বিজনেসে অনভ্যস্ত সোমনাথ খোলাখুলি সন্দেহ প্রকাশ করলো।
এ-লাইনে কোনো সেলসম্যান এইভাবে প্রশ্ন করে না। কিন্তু কেদিয়াজী বিরক্তি প্রকাশ করলেন না। বললেন, “জানা-শোনা থাকলে ফোরেন কোম্পানির বড় সায়েবরা সোব চিজ লিয়ে লিবে।”
কেদিয়াজীর ওখান থেকে বেরিয়ে বিশুবাবু বললেন, “অতি লোভে কেদিয়া ড়ুবতে বসেছেন। ইলেকট্রিক্যাল গুডসের দালালি করে হাজার পঁচিশেক কামিয়েছিলেন লাস্ট ইয়ারে। এ-বছরের গোড়ার দিকে এক হিন্দী সিনেমা কোম্পানির খপ্পরে পড়েছিলেন। ওরা একটা হাতি কিনে শুটিং করছিল। শুটিং-এর শেষে ফিল্ম কোম্পানি বোম্বাইতে হাতি ফিরিয়ে নিয়ে গেলো না। জলের দামে হাতি পাচ্ছেন ভেবে কেদিয়া কিনে ফেললেন। তখন এক সাকাস কোম্পানির দালালের সঙ্গে কেদিয়াজীর যোগাযোগ ছিল, সে লোভ দেখিয়েছিল মোটা দামে হাতি বেঁচে দেবে।”
যা জানা গেলো সেই দালালই কেদিয়াজীকে ড়ুবিয়েছে। হাতির বাজারে উন্নতির জন্যে কেদিয়াজী মাস কয়েক অপেক্ষা করতে তৈরি ছিলেন। কিন্তু হাতির খোরাক যোগাতে প্রতিদিন যে পঞ্চাশ-ষাট টাকা খরচ করতে হবে, এই হিসেবটা তিনি ধরেননি।
“খোঁজখবর না নিয়ে হাতির ব্যবসায়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে এই হয়,” বিশুদা বললেন। “এখন হাতির খরচ এবং একটা মাহতের মাইনে গোনো! তার ওপর পুলিশের হাঙ্গামা। হাতির জন্যে যে লাইসেন্স করতে হয় তাও জানতেন না কেদিয়াজী।” হাতি বাজেয়াপ্ত হতে বসেছিল। জানা-শোনা এক পুলিশের সাহায্যে বিশুদা ক’দিন বহু চেষ্টা করে ম্যানেজ করে দিয়েছেন। কিন্তু এবার হাতি সরাতেই হবে। তাই জলের দামে হাতি বেঁচে দিতে চাইছেন কেদিয়াজী।
বিশুদা নিজেও মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, “আমরা হাসছি কিন্তু সিরিয়াসলি কাজ করলে এর থেকেও হাজার খানেক টাকা রোজগার করতে পারে। বলা যায় না, বড় কোনো কোম্পানির পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্ট প্রচারের জন্যে হাতি লিজ নিতে পারে। তারপর পুজো নাগাদ শিক্ষিত হাতির দাম বেশ উঠে যাবে। সার্কাস কোম্পানিদের তখন ঘুম ভাঙবে।
সমস্ত ব্যাপারটা রসিকতা মনে হয়েছিল তখন। কিন্তু পরের দিন বিকেলেই সোমনাথ শুনলো কেদিয়াজীর হাতি বিক্রি হয়ে গিয়েছে। কোনো এক দালাল দশ পারসেন্ট কমিশনে হাতি হাওয়া করে দিয়েছে। কেদিয়াজী অবশ্য প্রতিজ্ঞা করেছেন যে-লাইনে অভিজ্ঞতা নেই। সে ব্যবসায় তিনি আর হাত বাড়াবেন না।
১৩. মল্লিকবাবু ছাপানো প্যাডগুলো দিয়ে গেলেন
মল্লিকবাবু ছাপানো প্যাডগুলো দিয়ে গেলেন। কিন্তু যাবার সময় বললেন, “একখানা মাত্র কোম্পানি করবেন?”
মল্লিকবাবু ভেবেছেন কী? সোমনাথ কি মস্ত ব্যবসায়ী? “একটা কোম্পানি সামলাতে পারি কিনা দেখি।” সোমনাথ সলজ্জভাবে মল্লিকবাবুকে বললো।
অনভিজ্ঞ সোমনাথের কথা শুনে হেসে ফেললেন মল্লিকবাবু। চশমার মোটা কাঁচের ভিতর দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ফরটি ইয়ারস এ লাইনে হয়ে গেলো—একটা কোম্পানি করলে বিজনেসে টেকা যায় না।”
“মানে?” একটু অবাক হয়েই সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো।
“আপনি বাঙালীর ছেলে, তাই বলছি। অন্তত তিনখানা কোম্পানি চাই। না হলে কোটেশন দেবেন কী করে? পারচেজ অফিসারকে পোষ মানাবেন আপনি—কিন্তু তিনি তো নিজের গা বাঁচিয়ে চলবেন। পোষ মানাবার পরে পারচেজ অফিসার নিজেই আপনাকে বলবে, তিনটে কোম্পানির নামে কোটেশন নিয়ে আসুন। দুটো কোটেশনে বেশি দাম লেখা থাকবে আর আপনারটায় দাম কম লেখা থাকবে।”
অর্ডার সাপ্লাই লাইনের গোড়ার কথাটাই যে সোমনাথ এখনও জানে না তা আবিষ্কার করে বৃদ্ধ মল্লিকবাবু বেশ কৌতুক বোধ করলেন।
“শুধু আলাদা কোম্পানি হলে তো চলবে না। ঠিকানাও তো আলাদা চাই?”সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো।
“সে তো একশোবার,” মল্লিকবাবু একমত হলেন। “সাপ ব্যাঙ দুটো ঠিকানা লাগিয়ে দিলেই হলো। কলকাতায় ঠিকানার অভাব? অনেকে তো আমার ছাপাখানার ঠিকানা লাগিয়ে দিতে বলে। বিজ্ঞের মতো মল্লিকবাবু বললেন, “আপনি তিনখানার কথা ভাবছেন? আর আপনার পাশের শ্রীধরজীর এগারোখানা কোম্পানি। এগারো রকমের চালান, এগারো রকমের বিল, এগারো রকমের রসিদ, এগারো রকমের চিঠির কাগজ। আমার দুটে, পয়সা হয়।”
সোমনাথের মুখের অবস্থা দেখে মল্লিকবাবু বললেন, “টাকাকড়ির টানাটানি থাকলে এখন একটা কোম্পানিই করুন। তেমন আটকে গেলে আমার কাছে আসবেন, দু-চারখানা পুরানো কোম্পানির লেটারহেড এমনি দিয়ে দেবো। কত কোম্পানি হচ্ছে, কত কোম্পানি আবার ডকে উঠছে-আমার কাছে অনেক চিঠির কাগজের স্যাম্পেল থেকে যাচ্ছে।”
মল্লিকবাবু যে শ্রীধরজীর কথা বললেন তিনি ফিনফিনে পাঞ্জাবি, ফর্সা ধতি এবং চপল পরে সকালের দিকে মিনিট পনোরোর জন্যে অফিসে আসেন। চিঠিপর কিছু, এসেছে কিনা খোঁজখবর করেন। তারপর গোটাচারেক পান একসঙ্গে গালে পরে বাজারে বেরিয়ে যান।
শ্রীধরবাবুর এক পার্টটাইম খাতা রাখার বাব; আছেন। তিনি দু-তিনবার অফিসে ঘরে যান। এর নাম আদকবাবু। রোগা পাকানো চেহারা। বহু লেকের হিসেব রেখে বেড়ান। সোমনাথ শুনলো, এ-লাইনে আকবর খবে নামডাক—বিশেষ করে সেলস ট্যাক্স সমস্যা নাকি গলে খেয়েছেন। লোকে বলে সেলস ট্যাক্সের বিধান রায়! যত মর-মর কেসই হোক, আদকবাবু ঠিক পার্টিকে বাঁচিয়ে দেবেন।
