অশোকের উৎসাহ আছে। নিজের কলেজেই বিজনেসের সুযোগ নিয়েছে। ওখানেই ফাইলগুলো সাপ্লাই করবে।
বিশুবাবু বললেন, “বিজনেসের অনেক জিনিস গোপন রাখতে হয়। সুতরাং তোমাকে আমি রোজ পাখি-পড়া করাবো না। নিজের ময়লা নিজে সাফ করবে, নিজের গোলমাল নিজে মেটাবে। আমি জিজ্ঞেস করতেও আসবে না।”
বিশুবাবুর নিজের কিন্তু তেমন ব্যবসায় মন নেই। কোনোরকমে চালিয়ে নেন। সেনাপতি বলে, “সায়েবের আর কী? বিয়ে-থা করেননি। সংসারের টান বলতে মা ছিলেন। দু-বছর হলো মা দেহ রেখেছেন। এখন দুর্বলতা বলতে ওই ইস্টবেঙ্গল ক্লাবটুকু। ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকলে মাঠে যাবেনই। তাতে বিজনেস থাকুক আর যাক।”
বিশববির আর একটা দোষ আছে। সন্ধেবেলা একটু ড্রিঙ্ক করেন বিশুবাবু! ওঁর ভাষায়, “রাত্রে একটু আহিকে বসতে হয় ব্রাদার। ব্যাড় হ্যাবিট হয়ে গিয়েছে। ঐ এলফিনস্টোন বার-এ গিয়ে বসি। ইয়ার বধদের সঙ্গে দুটো প্রাণের কথা হয়। ওখান থেকেও মাঝে মাঝে দু-চারটে বায়না এসে যায়। গত সপ্তাহে এলফিনস্টোন বার-এ শুনলাম এক ভদ্রলোক একখানা লরি বেচবেন। শ্রীকিষণজীর একখানা লরি কিছুদিন আগে ধানবাদের কাছে অ্যাক্সিডেন্টে নষ্ট হয়ে গিয়েছে শুনেছিলাম। এলফিনস্টোন বার থেকে পোদ্দার কোর্টে শ্রীকিষণজীকে ফোন করলাম। তারপর গডেস কালীর নাম করে দই পার্টিকে ছাঁদনাতলায় হাজির করিয়ে দিলাম। পকেটে পাঁচশ’ টাকা এসে গেলো উইদাউট এনি ইনভেস্টমেন্ট। এব নাম ভগবানের বোনাস। হঠাৎ হয়তো বিশ্বনাথ বোসের কথা মনে পড়ে গেলো ভগবানের ভাবলেন, হতভাগার জন্যে অনেকদিন কিছু করা হয়নি।”
বিশববি, এরপর সোমনাথকে নিয়ে বাজারে বেরিয়েছিলেন। ভিড় ঠেলে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বিশুবাবু বলছিলেন, “দুনিয়াতে যত ব্যবসা আছে তার মধ্যে এই অর্ডার সালায়ের ব্যবসাটা সবচেয়ে সহজ। সুখেরও বলতে পারো—অবশ্য যদি চলে।”
ব্যাপারটা কি জানতে চাইলো সোমনাথ। বিশুবাবু বললেন, “অপরের শিল অপরের নোড়া, তুমি শুধু কারুর দাঁতের গোড়া ভেঙ্গে টু-পাইস করে নিলে।”
এরপর বিশুবাবু ব্যাখ্যা করলেন, “অপরের ঘরে মাল রয়েছে। তুমি খোঁজখবর করে দাম জেনে নিলে। তারপর যদি একটা খদ্দের খুঁজে বার করতে পারো যে একটু বেশি দামে নিতে রাজী আছে—তা হলেই কম ফতে।”
“তাহলে দাঁড়ালা কী?” বিশুবাবু প্রশ্ন করলেন। বাজারে কোন জিনিস কত সস্তায় কার ঘরে পাওয়া যায় জানতে হবে। তারপর সেই মাল কাকে গছানো যায় খবর করতে হবে। ব্যস—আমার কথাটি ফরলো, নোটের তাড়াটি পকেটে এলো!”
এই নতুন জগতে সোমনাথ এখনও বিশেষ ভরসা পাচ্ছে না। কোনো অজানা জগতে বেপরোয়াভাবে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের মনস্কামনা সিদ্ধি করবার মতো মানসিকতা সোমনাথের নেই। থাকবেই বা কী করে? বড় নিরীহ প্রকৃতির মানুষ সে। কলকাতার লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেদের মতোই সে মানুষ হয়েছে—জন-অরণ্যে নিরীহ মেষশাবক ছাড়া আর কিছুর সঙ্গেই এদের তুলনা করা চলে না।
বিশুবাবু এসব নিয়ে মাথা ঘামান না। আপন মনে তিনি বললেন, “বিজনেসের ডেফিনিশন দিতে গিয়ে যে-ভদ্রলোক বলেছিলেন-ব্যবসা মানে সস্তায় কেনা এবং বেশি দামে বেচা, তাঁকে অনেকে সমালোচনা করে। কিন্তু সার সত্যটি এর মধ্যেই আছে।”
কয়েকটা লোক দেখিয়ে বিশুবাবু বললেন, “এই বাজারের হাজার হাজার লোক অর্ডার সাপ্লায়ের ওপর বেঁচে আছে। অফিসের আলপিন থেকে আরম্ভ করে চিড়িয়াখানার হাতি পর্যন্ত যা বলবে সব সাপ্লাই করবে এরা। তবে মার্জিন চাই।”
হাতির কথা শুনে বোধহয় সোমনাথের মুখে হাসি ফুটে উঠেছিল। বিশুবাবু বললেন, হাসছো? বিশ্বাস হচ্ছে না। চলো শ্যামনাথবাবুর কাছে।”
একটা ছোট্ট আপিসে মুখ শুকনো করে বসে আছেন শ্যামনাথ কেদিয়া। মোটা-সোটা মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। একটু তোতলা। বিশুবাবুকে দেখে কেদিয়াজী মদ, হাসলেন। বললেন, “কী বোসবাবু কুছ এনকোয়ারি পেলেন?”
বিশুবাবু বললেন, “না কেদিয়াজী, দুটো-তিনটে সার্কাস কোম্পানির খবরাখবর করলাম—কিন্তু হাতির বাজার খুব নরম। সামনে বর্ষা, কেউ এখন স্টকে হাতি তুলতে চাইছে না।”
কেদিয়াজী ঠোঁট উল্টে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, “এখোন লিচ্ছে না—পরে আফসোস করবে। একই হাতি তিন হাজার রপীয়া জাদা দিয়ে লিতে হোবে।”
বিশুবাবু বললেন, “সাকাস কোম্পানি তো-মাথায় অত বুদ্ধি নেই। আপনি বরং হাতিটাকে শোনপুরের মেলায় পাঠিয়ে দিন। ওখানে এক গ্রোস হাতি বিক্রি করতেও অসুবিধা হবে না।”
“সোব জায়গায় গণ্ডগোল। হাতির ওয়াগন মিলতেই বহুত টাইম লেগে যাচ্ছে,” দুঃখ করলেন কেদিয়াজী।
“আপনি তাহলে এক্সপোটের চেষ্টা করুন। পৃথিবীর অন্য জায়গায় হাতির খুব কদর।” বিশুবাবু মতলব দিলেন।
কেদিয়াজী সে-খোঁজও নিয়েছিলেন। ওয়েলিংটন বলে এক সাহেব মাঝে মাঝে জন্তুজানোয়ার কিনতে কলকাতায় আসেন। তিনি এলেই কেদিয়াজী সাডার স্ট্রীটে ফেয়ারল্যান্ড হোটেলে লোক পাঠাবেন। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসের আগে ওয়েলিংটন সায়েবের কলকাতায় আসবার সম্ভাবনা নেই। তাছাড়া ‘ফরেন মার্কেটে কেবল বেবি হাতির কদর। এরোপ্লেনে পাঠাতে খরচ কম। পকেট থেকে প্লেন ভাড়া দিয়ে কয়েক টন ওজনের বাড়ি হাতি বিদেশে পাঠাতে হলে ঢাকের দায়ে মনসা বিকিয়ে যাবে।
বিশুবাবু এবার সোমনাথের পরিচয় দিয়ে কেদিয়াজীকে বললেন, “ইয়ং মিস্টার ব্যানার্জি হাই সোসাইটিতে ঘোরেন। ওঁর আত্মীয়স্বজন সব বড় বড় কোম্পানির বড় বড় পোস্টে রয়েছেন।
