“তুইও আমাকে মিথ্যে কথা বলছিস?” হঠাৎ চীৎকার করে উঠলো সুকুমার। তারপর অকস্মাৎ কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো সে। বললো, “আমার যে একটা চাকরি না হলে চলছে না, ভাই।”
সোমনাথের গম্ভীর মুখ দেখে বিশুবাবু ভুল বুঝলেন। বললেন, “কী ব্রাদার। অফিসার হয়ে বিজনেসম্যানদের খাতায় নাম লেখাতে হলো বলে মন খারাপ নাকি?”
সোমনাথ বললো, “চাকরি যখন আমাকে চাইছে না, তখন আমি চাকরিকে চাইতে যাবো কেন?”
বিশুবাবু বললেন, “পাকিস্তানে সব খুইয়ে যখন এসেছিলুম তখন আমার অবস্থা শোচনীয়। মুরগীহাটায় মুটেগিরি করেছিলুম ক’দিন। তারপর চড়া সুদে দশ টাকা ধার করে একঝুড়ি কমলালেবু কিনতে গেলাম। আনাড়ী লোক, ফলের বাক্সর ওপর লাল-নীল সাঙ্কেতিক দাগ থেকে কী বুঝবো? আমার অবস্থা দেখে চিৎপুর পাইকারী বাজারে এক বুড়ো মুসলমানের দয়া হলো। দেখে-শুনে কমলালেবুর একটা বাক্স ভদ্রলোক কিনিয়ে দিলেন। প্রথম দিন বেশ মাল বেরুলো। পাঁচ ঘণ্টা রাস্তায় বসে দু টাকা নেট লাভ করে ফেললম—মনের আনন্দে নিজের অজান্তে দুটো লেবুও খেয়ে ফেলেছি। চড়া সুদে-কোম্পানির গোঁফওয়ালা ষণ্ডামাকা যে লোকটা সন্ধ্যেবেলায় পাওনা টাকা আদায় করতে আসতো, সে তো অবাক। ভেবেছিল আমি টাকা শোধ করতে পারবো না। দশ টাকা দশ আনা তাকে ফেলে দিলুম। রইলো এক টাকা ছ’ আনা।”
নিজের গল্প বন্ধ করলেন বিশুবাবু। বললেন, “থাক ওসব কথা। এখন তোমার হাতেখড়ির ব্যবস্থা করি। মল্লিকবাবুকে ডেকে পাঠাই।”
সেনাপতি ছুটলো মল্লিকবাবুকে ডাকতে। একটু পরেই চোখে একটা হ্যান্ডেল-ভাঙা চশমা লাগিয়ে হাজির হলেন বুড়ো মল্লিকবাবু। পরনে ফতুয়া, পায়ে বিদ্যাসাগরী চটি। ভদ্রলোক এ-পাড়ার ছাপাখানা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ করেন।
বিশুবাবু বললেন, “মল্লিকমশাই, সোমনাথের লেটার হেড এবং ভিজিটিং কার্ডের ব্যবস্থা করে দিন। আমার ঘরের নাব্বার এবং টেলিফোন দিয়ে দেবেন।”
“নাম কী হবে?” মল্লিকবাবু ঝিমোতে ঝিমোতে জিজ্ঞেস করলেন।
“সত্যি তো, নাম একটা চাই,” বিশুবাবু বললেন। “কিছু, প্রিয় নাম-টাম আছে নাকি?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
প্রিয় নাম একটা আছে কমলা। কিন্তু এই জীবনের জটের সঙ্গে তাঁকে শুধু শুধু জড়িয়ে ফেলে কী লাভ? তার থেকে বরং দায়িত্বটা পুরোপুরি নিজের ওপরেই থাক কোম্পানির নাম দেওয়া যাক : সোমনাথ উদ্যোগ।
নাম শুনেই বিশুবাবু বললেন, “ফার্স্ট ক্লাস। এই উদ্যোগ কথাটা মাড়ওয়ারীরা খুব ব্যবহার করছে। আর তোমার নিজের নামখানিও খাসা। কার সাধ্য ধরে বাঙালীর কারবার? প্রয়োজন হলে গজরাতী কনসান বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে। সোমনাথ নামটা গুজরাতীদের খুব প্রিয়—ওদের সেন্টিমেন্টেও লাগে। সোমনাথ মন্দিরটা কতবার যে বিদেশীরা এসে ঝেড়েঝড়ে সাবাড় করে দিলো।
মল্লিকবাবু চলে যেতেই বিশুবাবু বললেন, “এই যে পাড়া দেখছো, এখানে লাখ-লাখ কোটি কোটি টাকা উড়ে বেড়াচ্ছে। যে ধরতে জানে সে হাওয়া থেকেই টাকা করছে। এসব গল্প কথা নয়—দ-দশটা লাখপতি এই কলকাতা শহরে এখনও প্রতিমাসে তৈরি হচ্ছে। আমি বাপ, তোমাকে জলে ছেড়ে দিলাম, কিন্তু সাঁতার নিজে থেকেই শিখতে হবে। ঝিনুকে করে এই লাইনে দুধ খাওয়া শেখানো হয় না।”
বিশুবাবু কথা বলতে বলতেই ঘরের মধ্যে কম বয়সী এক ছেকারা ঢুকলো। বয়স সতেরো-আঠারোর বেশি নয়। বিশুবাবু বললেন, “অশোক আগরওয়ালা। ওর বাবা শ্রীকিষণজী আমার ফ্রেন্ড। রাজস্থান ক্লাবের অন্ধ ভক্ত। তবে শীন্ডে রাজস্থান হেরে যাবার পর ইস্টবেঙ্গলকে সাপোর্ট করে।”
অশোককে ডাকলেন বিশুবাবু। “অশোক কেমন আছো? পিতাজীর তবিয়ত কেমন?”
পিতাজী যে ভালো আছেন, অশোক বিনীতভাবে বিশুবাবুকে জানালো। বিশুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “অশোক তুমি কার সাপোর্টার?”
অশোক নির্দ্বিধায় বললো, “রাজস্থান অ্যান্ড ইস্টবেঙ্গল।”
“রাজস্থান তো বুঝলাম। কিন্তু ইস্টবেঙ্গল কেন, আমার ফ্রেন্ড মিস্টার সোমনাথকে একটু বুঝিয়ে বলো তো।”
অশোকের উত্তরে জানা গেলো, ইস্টবেঙ্গল তার বাবার জন্মস্থান। নারায়ণগঞ্জে তাদের পাটের কারবার ছিল। তাই ওরা ভালো বাংলা জানে। কিষণজী তো বাংলা নবেলও পড়েন।
ওদের দুজনের আলাপ হয়ে গেলো। অশোক ছেলেটি বেশ ভালো। বিশুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আজ কিছু জালে পড়লো?”
অশোক বললো, “বাজার খারাপ, কিছুই হচ্ছিল না। শেষপর্যন্ত চল্লিশখানা ফ্ল্যাট ফাইলের অর্ডার ধরেছি। মাত্র চার টাকা থাকবে।”
অশোকের হাতে একটা বড় কাগজের প্যাকেট। অশোক বললো, “ট্যাক্সি চড়তে গেলে কিছুই থাকবে না। তাই বাসের ভিড় কম থাকতে থাকতে ডেলিভারি দিয়ে আসবো ভাবছি।”
ফাইলের তাড়া নিয়ে অশোক বেরিয়ে গেলো। বিশুবাবু বললেন, “ওর বাবা টাকার পাহাড়ে বসে আছেন। দু-তিনটে বড় বড় কোম্পানির মালিক। তিন-চারশ’ লোক ওঁর আন্ডারে কাজ করে। আবার একটা কেমিক্যাল ফ্যাকটরি বানাচ্ছেন। অশোক মর্নিং ক্লাসে বি-কম পড়ে। বাবা কিন্তু ছেলেকে দুপুরবেলায় ধান্দায় লাগিয়ে দিয়েছেন।”
সোমনাথ শুনলো অশোকের জন্যে নিজের কোম্পানিতে থান করেননি শ্রীকিষণ আগরওয়ালা। ছেলের হাতে আড়াইশ’ টাকা দিয়ে চরে খেতে পাঠিয়েছেন। শ্রীকিষণজী চান ছেলে নিজের খুশী মতো বিজনেস করুক। বিশবাবার অফিসে বসে অশোক। আর বাজারে একলা ঘরে ঘরে ঠিক করে কোন বিজনেস করবে।
“বাঙালী বড়লোকেরা এসব ভাবতে পারে?” বিশুবাবু দুঃখ প্রকাশ করলেন। তাঁদের ছেলেদের গায়ে একটু রোদ লাগলে ননী গলে যাবে।”
