বিছানায় শুয়ে শুয়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের কাড়-হোল্ডার সোমনাথ হাসলো। কলেজের সেই সবুজ দিনগুলোতে তপতী প্রত্যাশা করেছিল সোমনাথ মস্ত কবি হবে। জন-অরণ্য সে মুখস্থ করে ফেলেছিল। কলেজ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় বাসের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে তপতী বলেছিল, “একটা কবিতা শুনুন। এও এক আদিম অরণ্য শহর কলকাতা…।” সমস্ত কবিতাটা সে আবত্তি করে ফেললো। তপতীর মুখে কী সুন্দর শোনাচ্ছিল কবিতাটা।
শ্রীময়ী রায় কাছেই দাঁড়িয়েছিল। তপতীর মুখে কবিতা শুনে সে অবাক হয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করলো, “তোর আবার কবিতায় আগ্রহ হলো কবে? আমি তো জানতাম হিসট্রি ছাড়া কোনো বিষয়ে তোর হস নেই।”
তপতী লজ্জা পেয়েছিল। শ্রীময়ী জিজ্ঞেস করেছিল, “কবিতাটা কার লেখা?” তপতী ও সোমনাথ দুজনেই উত্তরটা চেপে গেলো। তপতী বলেছিল, “কবিতা ভালো লাগলে পড়ি। কবির নাম-টাম আমার মনে থাকে না।”
শ্রীময়ী অন্য বাসে রিজেন্ট পার্কে চলে গিয়েছিল। দু নম্বর বাসের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে তপতী বলেছিল, “আপনার কবিতা ভালো হয়েছে—কিন্তু নেগেটিভ। বিরক্ত হয়ে আপনি আঘাত করেছেন, কিন্তু সমাজের মধ্যে আশার কিছু লক্ষ্য করেননি।”
কবি সোমনাথ মনে মনে ধন্য হলেও প্রতিবাদ জানিয়েছিল। লাবণ্যময়ী তপতীর ঝলমলে দেহটার ওপর চোখ বুলিয়ে মৃদু হেসে বলেছিল, “দাঁত, নখ এগুলো তো আঘাতেরই হাতিয়ার।”
ওর স্বরের গাঢ়তা তপতী উপভোগ করেছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছিল, “মেয়েদের আপনি কিছুই বোঝেননি। নখ কি কেবল আঁচড়ে দেবার জন্যে? মেয়েরা নখে তাহলে রং লাগায় কেন?”
উত্তরটা খুব ভালো লেগেছিল সোমনাথের। তপতীর বুদ্ধির দীপ্তি অকস্মাৎ ওর মসণ কোমল দেহে ছড়িয়ে পড়েছিল। মদ্ধ সোমনাথ বলেছিল, “এখন বুঝতে পারছি, লম্বা সর এবং ধারালো নখ দিয়ে কোনো কবির কলমও হতে পারে।”
এমন কিছু, নিবিড় পরিচয় ছিল না দুজনের মধ্যে। ফস করে এই ধরনের কথা বলে …ফেলে সোমনাথ একটু বিব্রত হলো। হঠাৎ দ-নম্বর বাস আসছে দেখে তপতী দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিবহনের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলো—সে বিরক্ত হলো কিনা সোমনাথ বুঝতে পারলো না।
পরের দিন কলেজের প্রথম পিরিয়ডে তপতী সাইড বেঞ্চির প্রথম সারিতে বসেছিল। দর থেকে ওর গম্ভীর মুখ দেখে সোমনাথের চিন্তা আরও একটু বেড়েছিল—ফলে অধ্যাপকের লেকচার কানেই ঢুকলো না সোমনাথের। প্রায় পনেরো মিনিট নজর রাখার পর দুজনের চোখাচোখি হলো। দৃষ্টিতে বিশেষ কোনো বিরক্তির চিহ্ন ধরা না পড়ায় নিশ্চিত হলো সোমনাথ। তপতীর সর্দি হয়েছে। মাঝে মাঝে রমাল বার করে নিজেকে সামলাচ্ছে।
দুপুরবেলায় দুজনে আবার দেখা হয়েছিল। ক্লাস থেকে আরেক ক্লাসে যাবার পথে তপতী দুত ওর হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট গুজে দিয়ে উধাও হয়েছিল। বন্ধুদের সতর্ক দটি ফাঁকি দিয়ে কলেজের লাইব্রেরিতে গিয়ে প্যাকেট খুলেছিল সোমনাথ। একটা পাইলট পেন—সঙ্গে ছোট্ট চিরকুট। কোনো সম্বোধনই নেই-লেখিকার নামও নেই। শুধু লেখা। “নখকে কলম করা নিতান্তই কবির কপনা। কবিতা লিখতে হয় কলম দিয়ে।”
সবুজ রংয়ের সেই কলম আজও সোমনাথের হাতের কাছে রয়েছে। তপতীর সেই প্রত্যাশার সম্মান রাখতে পারেনি সোমনাথ। কবিতা না লিখে, বস্তা বস্তা আবেদনপত্র বোঝাই করে করে কলমকে ভোঁতা করে ফেলেছে সোমনাথ। অসখ কলমটা মাঝে মাঝে বমি করে হঠাৎ বিনা কারণে ভকভক করে কালি বেরিয়ে আসে। সোমনাথ ব্যানার্জির এই পরিণতি হবে জানলে, তপতী নিশ্চয় তাকে কলম উপহার দিতো না। কলম দিয়ে তপতীর চিঠির ওপর হিজিবিজি দাগ কাটতে কাটতে নানা অর্থহীন চিন্তার জালে সোমনাথ জড়িয়ে পড়লো।
১২. হাতে অ্যাটাচি কেস নিয়ে
সকাল দশটা। হাতে অ্যাটাচি কেস নিয়ে নতুন জীবন আরম্ভ করতে বেশ লাগছে সোমনাথের। অ্যাটাচি কেসটা কমলা বউদি জোর করে হাতে ধরিয়ে দিলেন বড়দার নাকি একাধিক আছে, কোনো কাজে লাগছে না।
এবারেও ওর পকেটে ফল গুঁজে দিলেন কমলা বউদি। আশীর্বাদ করে বললেন, “তুমি মানুষ হবে—আমার কোনো সন্দেহ নেই।”
সোমনাথ মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করলো, মানুষ হওয়া কাকে বলে? তারপর ওর মনে হলো, নিজের অন্ন নিজে জটিয়ে নেবার ব্যবস্থা করা মানুষ হবার প্রাথমিক পদক্ষেপ।
সোমনাথ বুঝতে পারছে, বেশ দেরি হয়ে গিয়েছে। এখনও নিজের পায়ে না দাঁড়ালে, আর মনুষ্যত্ব থাকবে না।
কানোরিয়া কোর্টের বাহাত্তর নম্বর ঘরে বিশুবাবু বসেছিলেন। সোমনাথকে দেখেই উল্ল বিশুবাবু বললেন, “এসো এসো।”
সোমনাথ তখনও বুঝতে পারছিল না, হৃদয়হীন উদাসী সময় তাকে কোন পথে নিয়ে চলেছে।
এসব চিন্তা তার মাথায় হয়তো আজ আসতো না, যদি-না বাস স্ট্যান্ডের কাছে সুকুমারের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতো। সোমনাথের ফসা জামাকাপড় দেখে সুকুমার বললো, “বেশ বাবা! লুকিয়ে লুকিয়ে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছিস।”
সুকুমারের রক্ষ চাহনি ও খোঁচাখোঁচা দাড়ি দেখে কষ্ট হচ্ছিল সোমনাথের। সুকুমার বললো, “মিনিট দশেক দাঁড়া–জামাকাপড় পাল্টে আমিও তোর সঙ্গে ইন্টারভিউ দিয়ে আসবো।”
সোমনাথকে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুকুমার কাতরভাবে বললো, “আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি লাট সাহেব, চীফ মিনিস্টার, টাটা, বিড়লা কেউ আমার সঙ্গে জেনারেল নলেজে পেরে উঠবে না।”
সোমনাথ ওর হাত দুটো ধরে বললো, “বিশ্বাস কর, আমি ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি না।”
