চিঠিটা খুলতে সাহস হচ্ছে না সোমনাথের। এক কাজল চোখের খেয়ালী মেয়ের নিপাপ মুখচ্ছবি তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। শান্ত, স্নিগ্ধ, গভীর চোখের এই মেয়ের নাম কে যে রেখেছিল তপতী : ওকে দেখেই ঘরে বাইরে উপন্যাসের বিমলার মায়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল সোমনাথের। “আমাদের দেশে তাকেই বলে সুন্দর যার বর্ণ গৌর। কিন্তু যে আকাশ আলো দেয় সে নীল।”
আঙুল দিয়ে খামটা এবার খুলে ফেললো সোমনাথ। তপতী লিখেছে : “একেবারেই ভুলে গেলে নাকি? এমন তো কথা ছিল না। গতকাল ইউ-জি-সি স্কলারশিপের খবরটা এসেছে। এর অর্থ—সরকারী প্রশ্রয়ে ডি-ফিল করার স্বাধীনতা। ভাবলাম, খবরটা তোমারই প্রথম পাওয়া উচিত। কেমন আছো? ইতি তপতী।”
ইতি এবং তপতীর মধ্যে একটা কথা লেখা ছিল। কিন্তু লেখার পরে কোনো কারণে যত্ন করে কাটা হয়েছে। কথাটা কী হতে পারে? সোমনাথ আন্দাজ করার চেষ্টা করলো। চিঠিটা আলোর সামনে ধরে কাটা কথাটা পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করলো সোমনাথ। মনে হচ্ছে লেখা ছিল ‘তোমারই’। যদি সোমনাথের আন্দাজ ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে কথাটা তপতী কেন কাটতে গেলো? ‘তোমারই তপতী’ লিখতে তপতী কী আজকাল দ্বিধা করছে? নিজের চিঠি থেকে যে-কোনো অক্ষর কেটে দেবার অধিকার অবশ্যই তপতীর আছে। কিন্তু তাহলে চিঠি লেখার কী প্রয়োজন ছিল? তার ইউ-জি-সি স্কলারশিপের খবর প্রথম সোমনাথকেই দেওয়ার কথা ওঠে কেন?
এদিকে বাবা নিশ্চয় সোমনাথের জন্য অপেক্ষা করছেন। ভাবছেন এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের সমস্ত ঘটনার পখানপঙখ বর্ণনা সোমনাথের কাছ থেকে শোনা যাবে। কত লোক লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল? কতক্ষণ সময় লাগলো? অফিসার ডেকে কোনো কথা বললেন কি না? অথবা কেরানিরাই কার্ড রিনিউ করে দিলো।
ও বিষয়ে ছেলের কিন্তু বিরক্তি ধরেছে। এক্সচেঞ্জ অফিসের সামনে সাড়ে-পাঁচ ঘণ্টা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অপমানকর অভিজ্ঞতা সে ভুলতে চায়। সমবয়সিনী এক বালিকার মিষ্টি চিঠি বুকে নিয়ে সে শুয়ে থাকতে চাইছে। তপতীর সঙ্গে অনেকদিন যোগাযোগ করেনি সোমনাথ। ওর সঙ্গে দেখা করবার ইচ্ছে হয়েছে অনেকবার। ভবানীপুরের রাখাল মুখার্জি রোড তো বেশি দূরে নয়। কিন্তু দ্বিধা ও সংকোচ কাটিয়ে উঠতে পারেনি সোমনাথ।
যাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, তার চিঠিই আজকে তাকে কাছে নিয়ে আসছে। চিঠিটা আরেকবার পড়তে বেশ ভালো লাগলো। অথচ ছোট্ট চিঠি। যা ভালো লাগছে তা এই চিঠির না-লেখা অংশগুলো—যেমন শূন্যস্থান একমাত্র সোমনাথের পক্ষেই পরণ করা সম্ভব। যেমন তপতীর চিঠিতে কোনো সম্বোধন নেই। এখানে অনেক কিছুই বসিয়ে নৈওয়া যায় সবিনয় নিবেদন—খোকন—সোমনাথ—সোমনাথবাব-প্রীতিভাজনেষ-প্রিয়বরেষ…। আরও একটা শব্দ তপতীর মুখে শুনতে ইচ্ছে করে, হাতের লেখায় দেখতে প্রবল লোভ হয়। শব্দটার প্রতিচ্ছবি তপতীর শ্যামলী মুখে সোমনাথ অনেকবার দেখেছে। কিন্তু বড় গম্ভীর এবং কিছুটা চাপা স্বভাবের মেয়ে। কেউ কেউ আছে যা অনুভব করে তার ডবল প্রকাশ করে ফেলে। তপতী যা অনুভব করে তার থেকে অনেক কম জানতে দেয়। তবু কাল্পনিক সেই কথাটা সোমনাথ চিঠির ওপরেই আন্দাজ করে নিলো। তপতীর অনভ্যস্ত বাংলা হাতের লেখায় প্রিয়তমের কথাটা কী রকম আকার নেবে তা কল্পনা করতে সোমনাথের কোনোরকম অসুবিধে হচ্ছে না।
তারপর তপতী লিখেছে : একেবারেই ভুলে গেলে নাকি? তপতীর ছোট্ট নরম গোল গোল হাত দুটো দেখতে পাচ্ছে সোমনাথ। লেখার সময় বাঁ হাত দিয়ে এই চিঠির কাগজটা তপতী নিশ্চয়ই চেপে ধরেছিল। এই হাতে সুন্দর একগাছি সোনার কাঁকন পরে তপতী অনেকটা বউদির কাঁকনে যে-রকম ডিজাইন আছে।
তপতীর ডান হাতের কড়ে আঙ্গুলের নখটা বেশ বড় আকারের। এই নখটা নিয়ে ছাত্রজীবনে সোমনাথ একবার রসিকতা করেছিল। “মেয়েরা শখ করে নখ রাখে কেন?” তপতী প্রথমে লজ্জা পেয়েছিল—ওর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিটি খুঁটিনাটি কেউ অডিট করছে এই বোধটাই ওর অস্বস্তির কারণ। তপতীর সঙ্গে সেদিন বান্ধবী শ্রীময়ী রায় ছিল। ভারি সপ্রতিভ মেয়ে। শ্রীময়ী বলেছিল, “অনেক দুঃখে মেয়েরা আজকাল নখ রাখছে, সোমনাথবাব। মেয়ে হয়ে ট্রামে-বাসে যদি কলেজে আসতেন তাহলে বুঝতেন। কিছু লোক যা ব্যবহার করে–সভ্য মানুষ না জঙ্গলের জানোয়ার বোঝা যায় না।”
শ্রীময়ীর কথার ভঙ্গীতে তপতী ভীষণ লজ্জা পেয়েছিল। বন্ধুকে থামাবার চেষ্টা করেছিল। “এই চুপ কর। ওদের ওসব বলে লাভ নেই, ওরা কী করবে।”
জন-অরণ্য কথাটা সোমনাথের মনে তখনই এসেছিল। কবিতা লেখার উৎসাহে তখনও ভাঁটা পড়েনি। কলেজের লাইব্রেরীতে বসে সোমনাথ একটা কবিতা লিখে ফেলেছিল। বিশাল এই কলকাতা শহরকে এক শ্বাপদসঙ্কুল গহন অরণ্যের সঙ্গে তুলনা করেছিল সোমনাথ—যেখানে অরণ্যের আইনই ভদ্রতার কোট পরে চালু রয়েছে। কেউ এখানে নিরাপদ নয়। সতরাং অরণ্যের আদিম পদ্ধতিতেই আত্মরক্ষা করতে হবে। প্রকৃতিও তাই চায়–না হলে সুদেহিনী সুন্দরীর কোমল অঙ্গেও কেন তীক্ষ্ণ নখ গজায়। দন্ত কৌমুদীতেও কেন আদিম যুগের শাণিত ক্ষুরধারের সহ অবস্থান?
কবিতার প্রথম কয়েকটা লাইন এখনও সোমনাথের মনে পড়ছে : “এও এক আদিম অরণ্য শহর কলকাতা/অগণিত জীব পোশাক-আশাকে মানুষের দাবিদার/প্রকৃতি তালিকায় জন্তু মাত্র—।” কবিতার নাম দিয়েছিল : জন-অরণ্য।
কোনো নকল না-রেখেই কবিতাটা খাতার পাতা থেকে ছিঁড়ে তপতীর হাতে দিয়েছিল সোমনাথ। সেই ছেড়া পাতাটা তপতী যত্ন করে রেখে দিয়েছিল।
