কুল ফাইনাল পরীক্ষার সময়েও কবিতা লিখেছে সোমনাথ। কবিতার নেশা না থাকলে সে হয়তো পরীক্ষায় ভালো করতে পারতো। কারণ ইনটেলিজেন্সের কোনো অভাব ছিল না সোমনাথের। কলেজে ঢুকেও অজস্র কবিতা লিখেছে সোমনাথ। বেশ কয়েকটা খাতা কখন যে কবিতায় বোঝাই হয়ে উঠেছে তা সোমনাথ নিজেই বুঝতে পারেনি।
কিন্তু কলেজ থেকে বেরিয়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের খাতায় নাম লেখানো মাত্রই কবিতার ধারা অকস্মাৎ শুকিয়ে গেলো। সোমনাথ আর খাতা-কলম নিয়ে বসে না। বউদি কতবার অভিযোগ করেছেন, কিন্তু সোমনাথ লিখতে পারে না। বেকার সোমনাথের জীবন থেকে কাব্যলক্ষ্মী বিদায় নিয়েছেন। যে বেকার এ-সংসারে তার কিছুই মানায় না।
কেন এমন হলো, সোমনাথ ভেবেছে। যেসব মানুষের আত্মপ্রত্যয় থাকে সোমনাথ তাদের দলে নয়। যতটকু আত্মবিশ্বাস ছিল, হাজারখানেক চাকরির চিঠি লিখে তা উধাও হয়েছে। যে-মানুষের আত্মবিশ্বাস নেই সে কেমন করে কবি হবে?
সোমনাথের এই মানসিক অবস্থার কথা একমাত্র সুকুমার জানতো। সুকুমার বলেছিল, “দাঁড়া না। চাকরি যোগাড় করি আমরা—তখন ম্যাজিকের মতো আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে। তখন তুই কিন্তু কুড়েমি করিস না—আমাকে নিয়েও একটা কবিতা লিখিস। বাবা, মা, ভাই, বোন সবাইকে শুনিয়ে দেবো–চড়চড় করে প্রেস্টিজ বেড়ে যাবে!”
বাবার সঙ্গে কথা বলে বউদি আবার ফিরে এলেন। সোমনাথ বললো, “বউদি, আপনার সঙ্গে খুব গোপন কথা আছে।”
বউদি হেসে ফেললেন, “গোপন কথা শুনতে আমার ভয় হয়। যা পেট-আলগা মানুষ, শেষে যদি কাউকে বলে ফেলি?”
সোমনাথ বললো, “আপনাকে ছাড়া আর কাউকে বলবো না, বউদি। আপনিও চুপচাপ থাকবেন। তারপর বিজনেসের ব্যাপারটা সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়ে সোমনাথ বললো, “ট্রেনের সেই ছোকরার মতো নিজের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নিজেই সই করে দেখি।”
বউদি বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “বাবাকে বলতে আপত্তি কী।”
সোমনাথ রাজী হলো না। “কি হয় তার ঠিক নেই। আবার হয়তো লোক হাসাবো। আগে নেমে দেখি, ভালো করলে তখন বাবাকে জানাবো।”
বউদি রাজী হয়ে গেলেন। হেসে বললেন, “তোমার দাদার কাছে মিথ্যে কথা বলা মশকিল। কিন্তু সে-সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে। উনি আরও মাসখানেক বম্বেতে থেকে যাচ্ছেন। কে একজন ছুটিতে যাবেন, তাঁর কাছে ট্রেনিং নিচ্ছেন।”
বউদি বললেন, “বাবার কথাও শুনো কিন্তু। যেখানে অ্যাপ্লিকেশন পাঠাতে বলেন, পাঠিয়ে দিও। আর বাকি সময়টা নতুন লাইনে যথাসাধ্য চেষ্টা কোরো।”
“জানেন বউদি, ব্যবসা জিনিসটা অনেকটা লটারির মতো। অনেকে তাড়াতাড়ি বড়লোক হয়ে যায়।”
প্রবল উৎসাহে বউদি বললেন, “তুমি হঠাৎ বিজনেসে দাঁড়িয়ে গেলে বেশ মজা হবে! বাবা তো বিশ্বাসই করতে চাইবেন না। আমাকেই তখন বকুনি খেতে হবে। বলবেন, বউমা সব জেনে-শুনে আমার কাছে চেপে গেলে কেন?”
ভবিষ্যতের রঙীন কল্পনায় দুজনে একসঙ্গে খুব হাসলো। বউদি জানতে চাইলেন, “বিজনেস করতে গেলে টাকার দরকার হয় না, খোকন?
এ-ব্যাপারটা এখনও পর্যন্ত খেয়ালই হয়নি সোমনাথের। মাথা চুলকে বললো, “আগে হতো। এখন সম্ভবত দরকার হয় না। শিক্ষিত বেকারদের ধার দেবার জন্যে ব্যাঙ্কগুলো উঁচিয়ে বসে আছে।”
কমলা বউদির বিশ্বাস এতো বেশি যে ওসবের মধ্যে তেমন ঢুকলেন না। শুধু বললেন, মায়ের টাকাটা তো তোমার এবং আমার জয়েন্ট নামে বঙ্কে পড়ে আছে। পাশ বইটা দেখবে? তা তিন হাজার টাকা তো হবেই!”
এই টাকার কথা সোমনাথের খেয়ালই ছিল না।
১১. বউদি চলে যাবার একটু পরে
বউদি চলে যাবার একটু পরেই বুলবুল ঘরে ঢুকলো।
যত বয়স বাড়ছে মেজদার বউ তত খুকী হচ্ছে। বাড়িতেও আজকাল ডলপুতুলের মতো সেজেগুজে বসে থাকতে ভালোবাসে। এই দীপান্বিতা ঘোষাল আবার কলেজে ইউনিয়ন ইলেকশনের অন্যতম নায়িকা ছিল! ভোটের জন্যে দীপান্বিতা তখন সোমনাথকেও ধরেছিল। “দেশকে যদি ভালোবাসেন, যদি শোষণ থেকে মুক্তি চান তাহলে আমাদের দলকে ভোট দেবেন,” এইসব কী কী যেন তখনকার দীপান্বিতা ঘোষাল তড়বড় করে বলেছিল। বিয়ে করে ঐসব বুলি কোথায় ভেসে গিয়েছে। এখন বর, বরের চাকরি এবং নিজের শাড়ী ব্লাউজ ছাড়া কিছুই বোঝে না ভূতপূর্ব ইউনিয়ন-নেত্রী বুলবুল ঘোষাল।।
বুলবুল নিজে পড়াশোনায় ভালো ছিল না। সোমনাথ ও সুকুমার দুজনের থেকেই খারাপ রেজাল্ট করেছিল। কিন্তু বুলবুলের রুপ ছিল—মেয়েদের ওইটাই আসল। মোটামুটি ভালোভাবে বি-এ পাস করেও সোমনাথ ও সুকুমার জীবনের পরীক্ষায় পাস করতে পারলো না। আর বি-এতে কমপার্টমেন্টাল পেয়েও বুলবুল কেমন জিতে গেলো। কেউ তাকে প্রশ্ন করে না কেন পরীক্ষায় ভালো করোনি? মেয়েদের মলাটই ললাট।
বুলবুলের হাতে একটা ইনল্যান্ড চিঠি। সোমের চিঠি, কোনো মহিলার হস্তাক্ষর। বুলবুল বললো, “এই নাও! লেটার বক্সে পড়েছিল। আমি তো ভুলে খুলেই ফেলেছিলাম!” এই বলে বুলবুল আবার ফিক করে হাসলো।
এই হাসির মাধ্যমে বুলবুল যে একটা মেয়েলী প্রশ্ন করছে, তা সোমনাথ বুঝতে পারে। কিন্তু মেজদার বউকে সে বেশি পাত্তা দিলো না।
খামের ওপর হাতের লেখাটা সোমনাথ আবার দেখলো। তারপর চিঠিটা না-খুলেই বালিশের তলায় রেখে দিলো।
“আমার সামনে এসব চিঠি পড়বে না, আমি যাচ্ছি,” একটু অভিমানের সুরে বললে বুলবুল।
বুলবুল চলে যাবার পরেও সোমনাথ একটু অস্বস্তি বোধ করলো। চিঠিটা কারুর হাতে না-পড়লেই খুশী হতো সোমনাথ। খামটার দিকে সে আর-একবার তাকালো। এই চিঠি লেখবার মতো মেয়ে পৃথিবীতে একটি আছে। তার হাতের লেখার সঙ্গে সে পরিচিত। কিন্তু যার চাকরি নেই, ভবিষ্যৎ নেই, যে বাবার এবং দাদাদের গলগ্রহ সে তো এমন চিঠি পাবার যোগ্য নয়। এ ধরনের চিঠি সোমনাথকে মানায় না।
