বাড়ি ফিরে এসে চুপচাপ ঘরে ঢুকে পড়লো সোমনাথ। কমলা বউদি চা নিয়ে এলেন। বললেন, “বাবা চিতা করছিলেন। নিশ্চয় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে বিরাট লাইন পড়েছিল?”
“না, ওখানে ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে কাজ শেষ,” সোমনাথ বললো।
কমলা বউদি খবরের কাগজ থেকে দখনা কাটিং দিলেন, “বাবা আজ কেটে রেখেছেন।” কাটিং দুটো সোমনাথ হাতে নিলো, কিন্তু তাকিয়েও দেখলো না।
বউদি জিজ্ঞেস করলেন, “রোদে ঘুরেছো নাকি? মুখ শুকিয়ে গেছে।” দেওরের জন্যে বউদির যে খুব মায়া হচ্ছে তা যে-কেউ বলে দিতে পারে।
সোমনাথ বউদির মুখের দিকে তাকালো। কিন্তু কোনো উত্তর দিলো না।
বউদি বললেন, “দুপুরে সুকুমার এসেছিল। তোমার জন্যে দুখানা জেনারেল নলেজের কোশ্চেন রেখে গেছে, সঙ্গে চিঠি। বলেছে যেখান থেকে পারো উত্তর যোগাড় করে রাখবে।”
সুকুমারের ইংরেজী চিঠিটা পড়লো সোমনাথ। সুকুমার অত্যন্ত জরুরীভাবে জানতে চেয়েছে, সমুদ্রের জল কেন লোনা? এবং ফরাসী বিপ্লবের সময় কোন নেতা স্নানের টবে খুন হয়েছিলেন।
বউদি বললেন, “বেচারা। ওর কী হয়েছে বলো তো? আমাকেও একটা কোশ্চেন জিজ্ঞেস করলো। বললো, আমাকে উত্তর যোগাড় করে দিতেই হবে।”
বেশ উদ্বিগ্নভাবে সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো, “কী প্রশ্ন?”
কমলা বউদি বললেন, “সুকুমার জিজ্ঞেস করলো, দশরথের চার পুত্র রাম, লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্নোর নাম সবাই জানে, কিন্তু তাঁর মেয়ের নাম কী?”
“আপনাকে এভাবে জ্বালাতন করার মানে?” সোমনাথ একটু চিন্তিত হয়ে উঠলো।
কমলা বউদি বললেন, উত্তরটা আমার জানা ছিল, মায়ের কাছে শুনেছিলাম, রামচন্দ্রের বোনের নাম শান্তা। সেই শুনে খুব খুশী হলো সুকুমার। বললো, আপনাকে আর চিন্তা করতে হবে না। আমি কালই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাঠিয়ে দেবো।”
বদ্ধ পাগল হয়ে উঠেছে সুকুমারটা। কিন্তু কী করতে পারে সোমনাথ? আপনি পায় খেতে আবার শঙ্করাকে ডাকে।
সোমনাথ বললো, “আপনাকে তাহলে খুব জ্বালিয়ে গেছে।’
বউদি চুপ করে রইলেন। কারুর সমালোচনা করা তাঁর স্বভাব নয়। সোমনাথ বললো, “আমি কিন্তু পাগল হচ্ছি না, বউদি।”
“বালাই-ষাট। তুমি কোন দুঃখে পাগল হতে যাবে? মা নিজে বলে গেছেন, তোমার ভাগ্য খুব ভালো।”
“কবে কে একজন কী বলে গেছে, তা আপনি বিশ্বাস করেন বউদি?” সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো।
“কেন করবে না। মায়ের কোনো কথা তো মিথ্যে হয়নি,” বউদি বললেন।
বউদির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সোমনাথ। তারপর গভীর কৃতজ্ঞতায় বললো, “আমি যদি শরৎ চাটুজ্যে হতাম তাহলে আপনাকে নিয়ে মস্ত একখানা নবেল লিখতাম।”
“থাক! আগে তবু বউদির জন্যে দু-একটা কবিতা লিখতে—এখন তাও বন্ধ করে দিয়েছো!” বউদি দেওরকে বকুনি লাগালেন। বাবা ডাকছেন। কমলা বউদি এবার ওপরে গেলেন।
এ-বাড়িতে কমলা বউদিই একমাত্র সোমনাথকে অ্যাডমায়ার করতেন। মা তখনো বেচে। অঙ্কের খাতায় সোমনাথ একটা কবিতা লিখেছিল। তার জন্যে মায়ের কি বকুনি। “অঙ্কের খাতায় কবিতা লিখে তুমি রবিঠাকুর হবে?”।
বউদি কিন্তু ছোট দেওরকে তুচ্ছ করেননি। গোপনে দাদাকে দিয়ে অক্সফোর্ডের দোকান থেকে নরম চামড়ায় মোড়া কালো রংয়ের একটা সুন্দর খাতা কিনে আনিয়েছিলেন। তার প্রথম পাতায় নিজের হাতে লিখেছিলেন একজন তরণ কবিকে—তার বউদি, খাতাটা হাতে দিয়ে সোমনাথকে বউদি অবাক করে দিয়েছিলেন। বউদি বলেছিলেন, “কবিতা আমার খুব ভালো লাগে, ঠাকুরপো। যত তাড়াতাড়ি পারো ভরিয়ে ফেলবে, তারপর আবার খাতা দেবো।”
সোমনাথের দুঃখ, কমলা বউদি অপাত্রে আস্থা স্থাপন করেছিলেন এবং আজও অপাত্রে নিজের ভালোবাসা অপচয় করে চলেছেন।
ছোটবেলায় সেই খাতাটা সোমনাথ দ্রুত বোঝাই করে ফেলেছিল। অনেকগুলো কবিতা লিখেছিল সোমনাথ। দুপুর বেলায় সবাই যখন শুয়ে পড়তো তখন বউদির সাথে সোমনাথের কাব্য আলোচনা চলতো। সোমনাথ বলতো, “স্কুলে দু-একটা কবিতা শুনিয়েছি বউদি। কিন্তু মাস্টারমশাই বললেন কিসস, হয়নি।” বউদি দমতেন না——”বলক গে যাক। তোমার কবিতা আমার খুব ভালো লাগে। লিখতে লিখতে তোমার কবিতা নিশ্চয় আরও ভালো হবে। তখন দেশের সবাই তোমার নাম করবে।”
খাতাটা যত্ন করে রাখতে বলেছিলেন বউদি। বউদি কোথায় শুনেছিলেন, কবিদের প্রথম কবিতার খাতা পরে অনেক দামে বিক্রি হয়।
সোমনাথ কিছু বলেনি। কিন্তু খাতার এক কোণে তার অলিখিত প্রথম কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গটা লিখে রেখেছিল। যদি কখনও বই ছাপা হয়, তাহলে প্রথমেই লেখা থাকবে—যিনি আমাকে কবি বলে প্রথম স্বীকার করেছেন তাঁকে।
বউদি বলেছিলেন, “এর মানেটা সন্দেহজনক। কারণ মোক্ষদাও হতে পারে। তুমি যখনই মোক্ষদাকে কবিতা শুনিয়েছে সে শুনেছে। ঐতিহাসিকরা প্রমাণ করে দেবে তখন এ-বাড়িতে আমার বিয়ে হয়নি।”
সোমনাথ হেসেছিল। বলেছিল, “ঐতিহাসিকদের কে পাত্তা দিচ্ছে? নিজের জীবনস্মৃতিতে সমস্ত গোপন কথা ফাঁস করে দেবো, মোক্ষদার স্বীকৃতির পিছনে রীতিমতো লোভ ছিল। দ-আনা পয়সার পান-দোক্তা প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি না পেলে সে কিছুতেই কবিতা শুনতে বসতো না। অথচ বৌদির স্বীকৃতিতে কোনো স্বার্থ ছিল না। রবীন্দ্রনাথের কাব্যলক্ষ্মী এবং সোমনাথের কাব্যকমলা।”
বউদি তখনও ছোট্ট মেয়ের মতো সরল ছিলেন। জিনিসটাকে রসিকতা ভেবে পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারেননি। আন্তরিক বিশ্বাস ছিল দেওরটির ওপর। বলেছিলেন, “তুমি বিখ্যাত কবি হলে গ্র্যান্ড হয়। কবি, সোমনাথের সঙ্গে আমারও নাম হয়ে যাবে।”
