ছ’তলাটাও একটা ছোটোখাটো পাড়ার মতো। অসংখ্য সর, গলি এদিক-ওদিক চলে গিয়েছে। সোমনাথ বললো, “এর মধ্যে লোকে নিজেদের অফিস খুঁজে পায় কী করে?”
বিশুবাবু হেসে উত্তর দিলেন, “প্রথম প্রথম আমারও তাই মনে হতো। নিজের অফিসই খুঁজে পেতাম না। তারপর অভ্যাস হয়ে গেলো।”
বাহাত্তর নম্বর ঘরের সামনে এসে বিশুবাবু বললেন, “এই আমার অফিস।”
বিশুবাবু আরও যা বললেন তার থেকে জানা গেলো অফিসটা একসময় পুরোপুরি বিশুবাবুর ছিল। এখন তিনি অনেককে সাবলেট করেছেন। এই ঘরখানার মধ্যেই গোটা কুড়ি কোম্পানি চালু রয়েছে। এরা কিছু কিছু, ভাড়া দেয় বিশুদাকে। তার থেকে বাড়িওয়ালার পাওনা চুকিয়েও বিশুবাবুর সামান্য লাভ থেকে যায়।
বিশুবাবু বলছেন এতোগুলো অফিস। কিন্তু ঘরে লোকজন তেমন দেখা গেলো না। গোটা দশেক টেবিল অবশ্য রয়েছে। বিশুবাবু হাসলেন। বললেন, “প্রত্যেক টেবিলে দুখানা করে কোম্পানি। এক কোম্পানি এধারে এবং আরেক কোম্পানি ওধারে। অফিসে বসে থাকলে তো পেট চলবে না। মালিকরা সবাই বাজারে মাছ ধরতে বেরিয়েছেন।”
বিশুবাবুর ওখানেই আর একটি লোকের সঙ্গে আলাপ হলো। বিশুবাবু বললেন, “ইনিই আমাদের কমান্ডার-ইন-চীফ ফকিরচন্দ্র সেনাপতি। নামে সেনাপতি কাজেও সেনাপতি। আমার সঙ্গে লাস্ট বাইশ বছর আছে। বাবা সেনাপতি, সোমনাথবাবু নতুন এলেন, একটু চা খাওয়াবি নাকি?”
কসেনাপতি এতোক্ষণ পিটপিট কবে সোমনাথের দিকে তাকাচ্ছিল। সে ময়লা একটা ধুতি পরেছে, তার ওপর ঘরে-কাচা পরিষ্কার কিন্তু ইস্তিরিবিহীন খাকি কোট। সেনাপতির ঠোঁট লাল, দাঁতে পানের ছোপ। ফকিরচন্দ্র কেটলি হাতে নিয়ে বিশুবাবুর দিকে ইঙ্গিত করে কী যেন জানতে চাইলো।।
বিশুবাবু হাসতে হাসতে বললেন, “ও-হরি ভুলেই গিয়েছিলুম। তিন নম্বর চা নিয়ে আয়।”
সেনাপতি চলে যেতেই বিশুবাবু বললেন, “এই নম্বরের ব্যাপারটা বুঝলে না নিশ্চয়। তিন নম্বর হলো ভালো চা উইথ ওমলেট অ্যান্ড টোস্ট। দু নম্বর হলো ভালো চা উইথ বিস্কুট। এবং এক নম্বর হলো স্রেফ অর্ডিনারি চা। যে-কোনো ভদ্র জায়গায় হলে অর্ডিনারি চায়ের নম্বর হতো তিন। কিন্তু এটা বিজনেসের জায়গা। কাস্টমার বা গেস্ট কিছুই বুঝতে পারবে না—ভাববে মিস্টার বোস এক নম্বর কায়দাতেই আপ্যায়ন করছেন।”
ফকির সেনাপতি চা ও খাবার নিয়ে আসতেই বিশুবাবু বললেন, “এই শ্ৰীমানকেই দেখো। আগে যেখানে কাজ করতো সেখানে সবাই ফকির বলে ডাকতো। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগলো না। বিজনেসে আমরা কেউ ফকির হতে আসিনি। এখানে সব সময় ঐ অপয়া ডাক মোটেই ভালো লাগলো না। তখন থেকে শ্রীমানকে সেনাপতি করে দিলাম।”
লাজুক-লাজুক মুখভঙ্গিতে ফকিরচন্দ্র ফিক করে হাসলো। বিশুবাবু বললেন, “শ্রীমানের গণের শেষ নেই। সব ক্রমশ জানতে পারবে। মিঃ সেনাপতি এই ঘরে রাত্রে থাকেন এবং এই অফিসের দণ্ডমুণ্ডের কত।”
ফকির সেনাপতি আবার ফিক করে হাসলো।
বিশুবাবু এবার সোমনাথকে বললেন, “তোমার যদি ইচ্ছে হয় বিজনেসে লেগে যাও। আমার ঘরটা তো রয়েছে। ছ’নম্বর টেবিলের এগারো নম্বর সীট খালি পড়ে আছে। নোপানি নামে এক ছোকরা ভাড়া নিয়েছিল। মাস তিনেক তার কোনো পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। খবর নেবার জন্যে নোপানির বাড়িতে সেনাপতিকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সেখান থেকেও শ্রীমান কেটে পড়েছেন। সুতরাং তুমি ইচ্ছে করলে শনা চেয়ারে বসে পড়তে পারো।”
বিশুবাবু বললেন, “আমার খুব ইচ্ছে বাঙালীরা বিজনেস লাইনে আসুক। কিন্তু আসে কই? তুমি যদি সাহস দেখাতে পারো খুব খুশী হবো। তিনটে মাস ট্রাই করে দ্যাখো না? ওই তিন মাস আমি ভাড়া চার্জ করবো না। কিন্তু তারপর আশি টাকা করে নেবো। আশি টাকা ড্যাম চিপ বলতে পারো। এর মধ্যে বাড়ি ভাড়া, ফার্নিচার ভাড়া, সেনাপতির সার্ভিস এবং আলো-পাখার সব খরচ থাকবে। বাইরে থেকে কল এলে টেলিফোনও ফ্রি। শুধু এখান থেকে ফোন করলে কল পিছ, চল্লিশ পয়সা চার্জ। সঙ্গে সঙ্গে পয়সা দিতে হবে না, সেনাপতি খাতায় লিখে নেবে। টেলিফোনে চাবি মারা থাকে-সেনাপতিকে বললেই খুলে দেবে।”
সোমনাথ একটু ভরসা পাচ্ছে। চাকরি পাবার ইচ্ছেটা যদিও পুরোপুরি মন থেকে মুছে যাচ্ছে না, তবু সে ভাবছে ব্যবসা জিনিসটা মন্দ কি?
বিশুবাবু বললেন, “বসে থেকো না ব্রাদার। বসে থাকলেই মরচে পড়ে। বিবেকানন্দ স্বামী বলতেন, মরচে পড়ে পড়ে খতম হওয়ার থেকে ঘষে ঘষে শেষ হয়ে যাওয়া শতগুণে ভালো।”
ঘড়ির দিকে তাকালেন বিশুবাবু। বললেন, “আজ আমার বাজারে একটু কাজ আছে। তুমি যদি কালকে এখানে মুখ দেখাও তাহলে বুঝবো বিজনেসে ইচ্ছে আছে। না হলে যেমন মাঠে দেখা হচ্ছে তেমন হবে।”
কানোরিয়া কোর্ট থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ডালহৌসি স্কোয়ারে এসেছে সোমনাথ। পথের দুধারে অনেক লোককে দেখে সে একটু ভরসা পাচ্ছে। এরা সবাই তো চাকরি করে না, কিন্তু মোটামটি খেয়ে-পরে বেঁচে আছে। তাহলে সোমনাথের একবার চেষ্টা করে দেখতে আপত্তি কি?
পাঁচ নম্বর বাসে বসেও সোমনাথ ভেবেছে। ওর মনে পড়ে গেলো, কিছুদিন আগে কমলা বউদিকে নিয়ে ট্রেনে চড়ে শ্রীরামপুর গিয়েছিল। ফেরবার পথে ইলেকট্রিক ট্রেনে এক ছোকরা চিল্কার করে ভারি মজার কথা বলেছিল : “আমার নাম নিশীথ রায়। বয়স তেইশ। পড়াশোনা স্কুল ফাইনাল। আমি নিজের চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারে নিজে সই করেছি অ্যাজ ম্যানেজিং ডিরেকটর। আমার কর্মচারি হিসেবে আমার মাইনে ঠিক করি। গত মাসে দিয়েছি ছিয়াশি টাকা। নিশীথ রায় যদি খাটতে পারে তাহলে তাকে ঠকাবো না। দেড়শ-দশ-আড়াইশ পর্যন্ত মাইনে করে দেবো।” এরপর ছোকরা পকেট থেকে কিছু, ফাউনটেনপেন বার করেছিল বিক্রির জন্যে।
