অন্য সময় হলে ফিক করে হেসে ফেলতে সোমনাথ। এমনকি বিশবার সঙ্গে তক করে বলতো শত্রকে হারাবার জন্যে কোনো চেষ্টাই অন্যায় নয়। সত্যি কথা বলতে কি, সুকুমারের প্ররোচনায় সোমনাথ একবার ইস্টবেঙ্গলের পয়েন্ট খেয়ে এসেছে। আজকে এসব প্রসঙ্গের অবতারণা করবার মতো মনের অবস্থা নেই সোমনাথের।।
পান চিবোতে চিবোতে বিশদ জানতে চাইলেন, “হোয়ার ইজ ইওর ফ্রেন্ড সুকুমার?”
সুকুমার গোল্লায় যেতে বসেছে। আজ সকালেও বাসস্ট্যান্ডের কাছে সুকুমারকে দেখতে পেয়েছে সোমনাথ। এক ভদ্রলোককে মোটর সাইকেল থেকে নামিয়ে জিজ্ঞেস করছে, পৃথিবীর ওজন কত?
সোমনাথ চটে না-এলে ভদ্রলোক হয়তো বেচারা সুকুমারকে মেরে বসতেন। মারের হাত থেকে বেঁচে সুকুমার বললো, “দেখছিস তো, কোনো লোক জেনারেল নলেজে হেল্প করতে চায় না। আমার চাকরি হলে তোমার কি ক্ষতি বাবা?” কোনোরকমে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সোমনাথ ওকে যাদবপরের বাসে তুলে দিয়েছিল। কন্ডাকটরের হাতে বাসের ভাড়া দিয়ে বলেছিল লেখা স্টপেজের পরেই নামিয়ে দিতে।
বিশুবাবুর কাছে সোমনাথ এসব কিছুই বললো না। “তোমার খবর কী?” বিশুবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
সঙ্কোচ কাটিয়ে সোমনাথ এবার জিজ্ঞেস করলো, “বিশুদা, যাদের চাকরি-বাকরি হয় না তাদের কী করা উচিত?”
পানের পিচটা হজম করে নিয়ে জাঁদরেল বিশুদা বললেন, “ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। সামনে যা পাওয়া যায় তাই পাকড়ে ধরতে হয়।” একটু ভেবে একগাল হেসে বিশুদা বললেন, “এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে লাইন মেরে বিরক্তি ধরে গিয়েছে বুঝি? বোম কালী কলকাত্তাওয়ালী বলে ঝাঁপিয়ে পড়ো!”
“কোথায় ঝাঁপাবো?” সোমনাথ একটু ঘাবড়ে যায়।
“ঘাবড়াবার কিছুই নেই,” বিশুদা সোমনাথের পিঠে এক আলতো চাপড় লাগালেন। “চলো আমার সঙ্গে।
বিশুবাবুর সঙ্গে হাঁটতে আরম্ভ করলো সোমনাথ। জি পি ও, রাইটার্স বিল্ডিংস এবং লালবাজার পেরিয়ে ওরা দুজনে এবার চিৎপুর রোডে পড়লো। আরও একটু এগিয়ে ডানদিকে পোন্দার কোর্ট। তারপরে বাগড়ি মারকেট। বিশুবাবু বললেন, “ব্যাটাছেলের কোনো ইচ্ছে হলে সঙ্গে সঙ্গে কাজে নেমে পড়তে হয়।”
সোমনাথ বললো, “আচ্ছা বিশুদা, বিজনেস করতে হলে কত টাকা লাগে?”
বিশুদা হেসে ফেললেন। বললেন, “হোল বিজনেস লাইফে এমন ডিফিকাল্ট কোশ্চেন আমাকে কেউ করেনি। এর উত্তর হলো—দশ পয়সা থেকে দশ কোটি টাকা। ঐ যে কলাওয়ালা দেখছো ওর দু টাকাও পজি নেই। আর সামনে পোন্দার কোর্ট দেখছো, বুঝতেই পারছো কত টাকা খরচ হয়েছে বাড়িটা করতে। টাটা-বিড়লাদের টাকার যদি হিসেব চাও তাহলে মাথায় হাত দিয়ে বসবে। ওদের কোম্পানিগুলোর ব্যালান্সসীট থেকে ফিগার বার করে যোগ দিতে গেলে স্রেফ হেদিয়ে যাবে।”
“টাকা না-হলেও বিজনেস হতে পারে?” সোমনাথ একটু ভয়ে ভয়েই জিজ্ঞেস করলো।
“আলবৎ হয়! এই যে কলকাতার সব লক্ষপতি, কোটিপতি গোয়েঙ্কা, জালান, থাপার, কানোরিয়া, বাজোরিয়া, সিংহানিয়া দেখছো এরা সব কি রাজস্থান, হরিয়ানা থেকে লাখ লাখ টাকা পকেটে নিয়ে কলকাতায় বিজনেস করতে এসেছিল? খোঁজ নিলে দেখা যাবে, মূলধন বলতে অনেকেরই আদিতে রয়েছে ওয়ান লোটা এবং ওয়ান কম্বল।”
বিশুদা বললেন, “অন্য লোক কেন? আমার নিজেরই কেস দ্যাখো না। পার্টিশনের সময় যশোর থেকে চলে এসেছিলাম। ক্যাপিটাল বলতে পৈতৃক এই গতরটি। বিদ্যেরও জাহাজটি টি এম পি অর্থাৎ কিনা টেনে-টুনে-ম্যাট্রিক পর্যন্ত। কলকাতায় হাইকোর্ট বিল্ডিং ছাড়া কিছুই চিনি না। ওই বাড়িটা নেহাত প্রত্যেক বাঙালকেই তখন চিনতে হতো, ঘটিরা প্রথম চান্সেই বাঙালকে হাইকোর্ট দেখিয়ে দিতো। এই শহরে কে তখন আমাকে চাকরি দেবে! তাই জয়-মা-কালী কলকাত্তাওয়ালী বলে ব্যবসায় লেগে গেলম। তারপর কোয়ার্টার-অফ-এ সেঞ্চরি তো ম্যানেজ হয়ে গেলো।”
বিশুদা এরপর সোমনাথকে কানোরিয়া কোর্টে তাঁর অফিসে নিয়ে গেলেন। বললেন, এ আর-এক অজানা জগৎ, বুঝলে ব্রাদার। সত্তর-আশিখানা ঘর আছে এই বাড়িতে। আবার প্রত্যেক ঘরে যে কতগুলো করে কোম্পানি আছে তা ভগবানই জানেন। পনেরো বছর আগে তখন আমার রমরমা অবস্থা চলছিল, সেই সময় ছ’তলার বাহাত্তর নম্বর ঘরখানা বাড়িওয়ালার দরোয়ানকে আড়াই হাজার টাকা সেলামী দিয়ে ম্যানেজ করেছিলাম। এখনও চালাচ্ছি সেই অফিস থেকে।
এই বাড়িতে একটা প্রাগৈতিহাসিক লিফট আছে। লিফটের সামনে বিরাট লাইন। বিশুদা বললেন, “সর্বদাই ভিড় লেগে রয়েছে। আগে দিনকাল ভালো ছিল। মাসে পাঁচ টাকা বকশিশ পেলে লিফটম্যান সুন্দরলাল প্রেফারেন্স দিয়ে নিয়ে যেতে। বলতো মালিকের অদমী। এখন সে-উপায় নেই। বাবু থেকে আরম্ভ করে বেয়ারা পর্যন্ত সবাই আপত্তি তোলে। সুতরাং লাইনে দাঁড়াতে হয়। অনেক সময় লেগে যায়।”
সোমনাথ অবাক হয়ে শুনছিল বিশুদার কথা। বিশুবাবু বললেন, “জানো ব্রাদার, বিজনেসম্যান হলেই সোজা পথে কিছু করতে ইচ্ছে হয় না। তাড়াতাড়ি ম্যানেজ করবার জন্যে ছটফটানি লেগে থাকে! হয় লাইন ভেঙে এগিয়ে যাবো, দু-চার পয়সা দিয়ে ম্যানেজ করবো—আর তা যদি সম্ভব না হয় সিড়ি বেয়েই উঠবো।”
এরপর সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যাওয়ার প্রস্তাব করলেন বিশুদা। সোমনাথের আপত্তি নেই। হাঁপাতে হাঁপাতে ছ’তলায় উঠে বিশুবাবু বললেন, “বুঝতে পারছি বয়স হচ্ছে এখন ছ’তলায় উঠতেই কষ্ট হয়। তোমাদের আর কি ইয়ংম্যান–কেমন তরতর করে উঠে এলে।”
