“আমরাও প্রো-চাইনীজ—বিশেষ করে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে!” অভিজিৎ মন্তব্য করলো।
একবার হাসির হল্লোড় উঠলো। মিস্টার নন্দী বললেন, “সুইডেনের প্রফেসর জোরগেনসেন এসেছিলেন কিছুদিন আগে। জগদ্বিখ্যাত পণ্ডিত। এই চাকরি-বাকরির ব্যাপারে নানা দেশে অনেক, গবেষণা করেছেন। আমার সঙ্গে এক ডিনারে আধঘণ্টার জন্যে দেখা হয়ে গেলো। তিনি বললেন, অর্থনীতি এবং রাজনীতির অনেক প্রাথমিক আইনই তোমাদের এই বেঙ্গলে খাটে না। অন্য দেশে বেকার বললেই একটা ভয়াবহ ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একটা রক্ষ মেজাজের সর্বনাশা চেহারার লোক—যার কোনো সামাজিক দায়দায়িত্ব নেই, যে প্রচণ্ড রেগে আছে। ইংলন্ডের কিছু-কিছু প্রি-ওয়ার উপন্যাসে এদের পরিচয় পাবে। লোকটা বোমার মতন কারণ সে অনাহারে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার আশ্রয় নেই, জামা-কাপড় নেই। যে-কোনো মুহূর্তে সে ফেটে পড়তে পারে।”
একটু থামলেন মিস্টার নন্দী। তারপর আরম্ভ করলেন, “প্রফেসর জোরগেনসেন বললেন, তোমাদের এই বেঙ্গলে এসে কিন্তু তাজ্জব বনে গেলাম। রাস্তায় রাস্তায় পাড়ায় পাড়ায় এমন কি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়েও বেকার সমস্যার বাহ্যিক ভয়াবহতা দেখলাম না। অথচ তোমাদের এখানে যত বেকার আছে তার এক-দশমাংশ কর্মহীন অন্য যে-কোনো সভ্য দেশকে লণ্ডভণ্ড করে দিতো। তোমাদের বেকাররা অস্বাভাবিক শাত। আর বেকারি ভাতা না থাকলেও তোমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলি এদের সর্বনাশ করে দিচ্ছে। অনেকেরই যেন-তেন উপায়ে খাওয়া জরুটে যাচ্ছে। তোমাদের পারিবারিক জীবন এই বোমাগুলোকে ফিউজ করে দিচ্ছে—এরা ফেটে পড়তে পারছে না। নতুন জীবনের অ্যাডভেঞ্চারেও নামতে পারছে না এরা। তাই সমস্যা সমাধানে কোনো তাড়া নেইনাউ অর নেভার, একথা কারও মুখে শোনা যাচ্ছে না।”
মিস্টার নন্দী থামলেন না। বললেন, “জানেন মিস্টার ব্যানার্জি, প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করলে বলতাম—বেকারি অনেকটা ম্যালেরিয়া এবং কালাজ্বরের মতো। এখনই মৃত্যুভয় নেই, কিন্তু আস্তে আস্তে জীবনের প্রদীপ শুকিয়ে আসছে। পৃথিবীর সর্বত্র মানুষ যুগে যুগে যৌবনকে জয়টীকা পরিয়েছে। ক্যাপিটালিস্ট বলুন, সোসালিস্ট বলুন, কম্যুনিস্ট বলুন, সবদেশে যৌবনের জয়জয়কার। আর আমাদের এই পোড়া বাংলায় যুবকদের কি অপমান। লাখ লাখ নিরপরাধ শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের যৌবন কেমন বিষময় হয়ে উঠেছে দেখুন। ওরা যদি বলতো, সমাধান আজই চাই। আজ সমাধান না হলে, কাল সকালেই যা হয় করবো—তাহলে হয়তো দেশের ভাগ্য পাল্টে যেতো।”
মিস্টার নন্দীর কথাগুলো শুনতে শুনতেই সোমনাথের রক্তে আগুন ধরে যাচ্ছিল। একবার মনে হলো, তাকে শোনাবার জন্যেই যেন গোপন ষড়যন্ত্র করে নন্দীকে আজ এ-বাড়িতে আনা হয়েছে।
কিন্তু এ-সমস্ত কথা যে সোমনাথের কানে যাচ্ছে তা মেজদা এবং বুলবুল কল্পনাও করতে পারেনি। সোমনাথের ঘরে কে বুলবুল একবার বলতে এলো, “সোম, তুমিও এসো। সবাই একসঙ্গে খেয়ে নেওয়া যাবে।”
সোমনাথ রাজী হলো না। বললো, “আজকে খাওয়াটা বাদ দেবো ভাবছি। পেটের অবস্থা খারাপ।”
বুলবুল চলে গেলো। খবর পেয়ে কমলা বউদি এলেন। “কখন পেট খারাপ করলো? আগে বলেনি তো।”
সোমনাথ বললো, “এমন কিছু নয়, আপনি অতিথিদের দেখুন।
কমলা বউদি বললেন, “ফ্রিজে রই মাছ রয়েছে—একটু পাতলা ঝোলের ব্যবস্থা করে ফেলি?”
“পাগল হয়েছেন,” সোমনাথ আপত্তি করলো। “একদিন শাসন করলেই ঠিক হয়ে যাবে। পেটকে অনেকদিন আস্কারা দিয়ে এই অবস্থা হয়েছে।”
১০. সোমনাথ মনস্থির করে ফেলেছে
সোমনাথ মনস্থির করে ফেলেছে। কিন্তু বাড়ির লোকেরা বুঝতে পারেনি। সেদিন সকালে বেরোবার সময় বউদি আবার সোমনাথকে মনে করিয়ে দিলেন, “বাবা বলছিলেন, আজ এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের কার্ড রিনিউ করবার দিন।”
সোমনাথের যে এ-বিষয়ে আগ্রহ নেই তা বউদি বুঝলেন—তাই বললেন, “বাবা বলছিলেন আজ, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের কার্ড না থাকলে অনেক অফিসে কথাই শুনবে না।”
সোমনাথ এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে সকালটা কাটালো। ওখান থেকে বেরুবার সময়ে বিশুবাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো।
বিশুবাবুর সঙ্গে ফুটবল খেলার মাঠে আলাপ। সুকুমারই বিশুবাবুর সঙ্গে প্রথম ভাব জমিয়েছিল। ভদ্রলোক ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের বিশ্বস্ত ভক্ত। বিশুবাবু বিজনেস করেন, এ-খবরও খেলার মাঠে অনেকবার শুনেছে সোমনাথ।।
বিশুবাবুর কালো আবলুশ কাঠের মতো গায়ের রং। মাথার চুলগুলো কপালের দিক থেকে পাতলা হতে আরম্ভ করেছে। তার ফলে কপালটা চওড়া মনে হয়। মধ্যপ্রদেশেও ঈষৎ মেদ জমতে শুরু করেছে বিশুবাবুর। বয়স চুয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হবে।
হাতে একটা ফোলিও ব্যাগ নিয়ে বিশুবাবু রাস্তার হিন্দুস্থানী দোকান থেকে বাংলা পান কিনছিলেন। সোমনাথকে দেখে বিশুবাবু চিৎকার করে উঠলেন, “কী মোহনবাগান? খবর কী?
সোমনাথের মতামত না নিয়েই বিশুবাবু আর একটা পানের অর্ডার দিলেন। পান নিতে সোমনাথ একটু ইতস্তত করছিল। বিশুবাবু বকুনি লাগালেন। “এটা জেনে রাখবে পানের কোনো সময় নেই। যে-কোনো সময় যতগুলো ইচ্ছে চিবোতে পারো—শুধু ওই লাল মসলাগলো খেয়ো না।”
পানওয়ালার কাছে নিজের গণ্ডিমোহিনী বিশুবাবু আলাদাভাবে চেয়ে নিলেন। তারপরে বললেন, “মোহনবাগানের কতগুলো অপয়া ছেলে কালকে ইস্টবেঙ্গল-স্পোর্টিং ইউনিয়নের খেলা দেখতে এসেছিল। উদ্দেশ্য ইস্টবেঙ্গলের একটা পয়েন্ট খাওয়া, দিস, ইজ ব্যাড।” মতামত দিলেন বিশুবাবু। তোমার ক্লাবকে তোমার সাপোর্ট করবার রাইট আছে, কিন্তু গায়ে-পড়া অপয়া ছেলেকে অন্য ক্লাবের সাপোর্টে পাঠিয়ে তাদের পয়েন্ট খাওয়া মোটেই স্পোর্টসম্যান-লাইক নয়।”
