এরা।”
এবার তুলনামূলক সমালোচনা আরম্ভ করলেন মিসেস নন্দী। “পার্সোনেল অফিসারদের থেকে আপনারা অনেক ভালো আছেন, মিস্টার ব্যানার্জি।”
“এতো দুঃখ করছেন কেন, মিসেস নন্দী?” বুলবুল জিজ্ঞেস করলো।
“অনেক কারণে ভাই। বাড়িতে পর্যন্ত শান্তি নেই। লোকে যেমনি শুনলো পার্সোনেল অফিসার, অমনি চাকরির তদ্বির শুরু হয়ে গেলো।”
মিস্টার নন্দীও সায় দিলেন। “বন্ধুর বাড়ি, বিয়ে বাড়ি, এমনকি বাজার-হাটেও যাবার উপায় নেই। চেনা-অচেনা হাজার-হাজার চাকরির জন্যে খাই-খাই করছে। চাকরি কি মশাই আমি তৈরি করি?”
মিসেস নন্দী বললেন, “আগে ওঁর ঠাণ্ডা মাথা ছিল, লোকের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলতেন—এখন চাকরির নাম শুনলে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন।”
“ধৈর্য থাকে না, মিস্টার ব্যানার্জি,” এম কে নন্দীকে বলতে শোনা গেলো।
“মেয়ের বিয়ে এবং ছেলের চাকরির জন্যে বাঙালীরা তো চিরকালই ধরাধরি করে এসেছে, মিস্টার নন্দী,” বুলবুল হঠাৎ বলে ফেললো। পরে বুলবুলের মনে হলো কথাটা মিস্টার নন্দীর মনঃপুত নাও হতে পারে।
“বাঙালী ছেলেদের চাকরি!” আঁতকে উঠলেন মিস্টার নন্দী। তারপর বললেন, “কিছু যদি মনে না করেন, তাহলে সত্যি কথাই বলি। বাংলার শিক্ষিত বেকাররা বিধাতার এক অপূর্ব সৃষ্টি। এরা স্কুল-কলেজে দলে দলে কিছু, মানে-বই মুখস্থ করেছে—কিন্তু এক লাইন ইংরিজি স্বাধীনভাবে লিখতে শেখেনি। বারো-চোদ্দ বছর ধরে প্রতিদিন স্কুলে এবং কলেজে গিয়ে এরা এবং এদের মাস্টারমশায়রা যে কী করেছেন ভগবান জানেন! পৃথিবীর কোনো খোঁজই এরা রাখে না। এরা জানে না মোটর গাড়ি কীভাবে চলে; কোন সময়ে ধান হয়, সিপিয়া রংয়ের সঙ্গে লাল রংয়ের কী তফাত। এরা কলমের থেকে ভারী কোনো জিনিস তিন-পরষের মধ্যে তোলেনি। এরা রাঁধতে জানে না, খাবার খেয়ে নিজেদের থালাবাসন ধতে পারে না, মায় নিজেদের জামা-কাপড়ও কাচতে পারে না। অন্য লোকে ঝাঁটা না ধরলে এদের ঘরদোর পরিষ্কার হবে না। দৈহিক পরিশ্রম কাকে বলে এরা জানে না। এরা কোনো হাতের কাজ শেখেনি, ম্যানার জানে না, কোনো অভিজ্ঞতা নেই এদের। এরা শুধু আনএমপ্লয়েড নয়, আমাদের প্রফেশনে বলে আন-এমপ্লয়েবল। এদের চাকরি দিয়ে কোনো লাভ নেই।”
এ-ঘরে বসে সোমনাথ ভাবছে, মেজদা কিছু মতামত দিচ্ছে না এই যথেষ্ট।
মিস্টার নন্দী বোধহয় একটা সিগারেট ধরালেন। কারণ দেশলাই জ্বালানোর শব্দ হলো। তাঁর গলা আবার শোনা গেলো। এই ধরনের লক্ষ লক্ষ অদ্ভুত জীব আমাদের এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জগুলোতে নাম লিখিয়ে চাকরির আশায় বাড়িতে কিংবা পাড়ার রকে বসে আছে। হাজার পঞ্চাশেক স্কুল-কলেজ আরও কয়েক লাখ একই ধরনের জীবকে প্রতিবছর চাকরীর বাজারে উগরে দিচ্ছে। অথচ এই সব অভাগাদের জন্যে দেশের কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। এরা সমাজের কোন কাজে লাগবে বলতে পারেন? স্কুল-কলেজে এমন ধরনের অপদার্থ বাবু আমরা কেন তৈরি করছি পৃথিবীর কেউ জানে না।”
“আমাদের সমাজই তো এদের এইভাবে তৈরি করছে, মিস্টার নন্দী,” অভিজিৎ গভীর দুঃখের সঙ্গে মৃদু প্রতিবাদ করলো।
মিস্টার নন্দী বোধহয় সিগারেটে টান দিলেন। তারপর বললেন, “ইনটারভিউতে বসে এইসব বেঙ্গলী ছেলেদের তো দেখছি আমি। চোখ ফেটে জল আসে। উগ্রপন্থীরা যে বলতো স্কুল-কলেজ বোমা মেরে বন্ধ করে দাও, তার মধ্যে কিছু লজিক ছিল মিসেস ব্যানার্জি। কারণ স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের এইসব ছেলেদের স্বয়ং ভগবানও এই সমাজে প্রোভাইড করতে পারবেন না।”
“দোষটা তো এই ছেলেদের নয়।” অভিজিতের গলা শোনা গেলো।
“সেইটাই তো আরো দঃখের। এরা জানে না, এদের কি সর্বনাশের পথে ঠেলে দেওয়া রয়েছে। যে-হারে নতুন চাকরি হচ্ছে তাতে ইতিমধ্যেই যারা এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের লিস্টে নাম লিখিয়েছে তাদের ব্যবস্থা করতে আশি-পঁচাশি বছর লেগে যাবে। অর্থাৎ, এখন যদি মাইশ-তেইশ বছর বয়স হয়, চাকরির চিঠি আসবে একশ’ দুই বছর বয়সে।”
মিস্টার নন্দী বললেন, “শতখানেক সরকারী চাকরির জন্যে লাখদশেক অ্যাপ্লিকেশন পড়তে পারে এমন খবর পৃথিবীর কেউ কোথাও কোনোদিন শুনেছে? সবচেয়ে দুঃখের এখা, গভরমেন্টও এদের কাছে বেমালুম মিথ্যা কথা বলছে। ওরে বাবা, মুরোদ থাক-না-থাক এত সত্যবাদী হও। ইয়ংমেনদের কাছে স্বীকার করো, এ-সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কোনো সকারের নেই। তাহলে ছেলেগুলোর অন্তত চৈতন্যোদয় হয়, নিজের ব্যবস্থা নিজেরা করে ফেলতে পারে।”
“নিজের ব্যবস্থা আর কী করবে, মিস্টার নন্দী?” অভিজিৎ দঃখের সঙ্গে বললো।
“যাদের কেউ নেই, তাদের করতেই হয়,” মিস্টার নন্দী উত্তর দিলেন। “আপনি কলকাতার চীনেদের দেখুন। তিন-চারশ’ বছর ধরে তো ওরা কলকাতায় রয়েছে। ওদের ছেলেপুলেরাও তো লেখাপড়া শিখছে। কিন্তু কখনও এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে কোনো চীনেকে দেখেছেন? ওদের যে চাকরির দরকার নেই এমন নয়। কিন্তু ওরা জানে, এই সমাজে কেউ ওদের দেখবে না, কেউ ওদের সাহায্য করবে না, নিজেদের ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে। তাই নীরবে সেই অবস্থার জন্যে ছেলেদের ওরা তৈরি করেছে। এবং খুব দুঃখে কষ্টে নেই ওর।”
মিসেস নন্দী একটু বিরক্ত হলেন। “আমরা তো আর চীনে নই—সুতরাং বারবার চীনের কীর্তন গেয়ে কী লাভ?”।
হেসে ফেললেন মিস্টার নন্দী। “গিন্নির ধারণা আমি প্রো-চাইনীজ।”
