মিস্টার নন্দী যে বউয়ের বকুনিতে অভ্যস্ত তা বোঝা গেলো। বেশ শান্তভাবে ইন্ডিয়া কিং সিগারেট ধরিয়ে বউকে তিনি বললেন, “হরিয়ানা এবং স্বদেশীয়ানা যে একই জিনিস তা এখন অনেকেই হাড়ে-হাড়ে বুঝছে। কিন্তু মিন, সায়েবদের চলে যেতে বলছে কে? শুধু খোলস পাল্টাতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
মিসেস নন্দী বললেন, “কোম্পানির পার্টিতে যেতে আমার মোটেই ভালো লাগে না। কিন্তু বাধ্য হয়ে প্রেজেন্ট থাকতে হয়।”
“কী করবেন বলনে। যে-পজোর যে-মন্ত্র, সুদর্শনা ও সুসজ্জিতা মিসেস নন্দীকে সান্ত্বনা দিলো অভিজিৎ।
মিসেস নন্দী বললেন, “সেদিনের ককটেল পার্টিতেও স্বদেশীর কথা উঠেছিল। মিস্টার অ্যান্ড মিসেস চোপরা তিনমাস ফরেন বেড়িয়ে এসে ভীষণ স্বদেশী হয়ে উঠেছেন। বললেন, মেয়েদের কসমেটিকস এবং ছেলেদের স্কচ, হইকি ছাড়া আর সব জিনিস স্বদেশী হয়ে গেলে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই।”
বুলবুল সেদিন পাটিতে উপস্থিত ছিল। পার্টির শেষের দিকে বেশ কয়েক পেগ ফরেন হইস্কি পান করে মিসেস চোপরা আরও উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। বুলবুলের কোমরে হাত রেখে পঞ্চাশ বছরের যুবতী মিসেস চোপরা বলেছিলেন, “দেশের মঙ্গলের জন্যে ইমপোর্টেড কসমেটিকস আনা কয়েক বছর বন্ধ হলে তাঁর আপত্তি নেই।”
বুলবুলের কথা শুনে হা-হা করে হেসে উঠলেন মিস্টার নন্দী। “মিসেস ব্যানার্জি আপনি সত্যিই খুব সরল প্রকৃতির মানুষ। আপনি মিসেস চোপরার কথা বিশ্বাস করলেন? উনি বলবেন না কেন? এবার ফরেন থেকে ফেরবার সময় মহিলা যা কসমেটিকস এনেছেন তাতে ওঁর সমস্ত জীবন সুখে কেটে যাবে।”
“ও মা!” মিসেস নন্দী স্কুলের কিশোর বালিকার মতো বিস্ময় প্রকাশ করলেন।
মিস্টার নন্দী বললেন, “এসব ভিতরের খবর। বিশ্বাস না-হলে, ট্রাভেল ডিপার্টমেন্টের অ্যারো মুখার্জিকে জিজ্ঞেস করবেন। কাস্টমসের নাকের সামনে দিয়ে বিনা-ডিউটিতে ওই মাল ছাড়িয়ে আনতে বেচারার ব্লডি-প্রেসার বেড়ে গিয়েছে। উপায়ও নেই—রিজিওন্যাল ম্যানেজারের বউ। লিপস্টিকের ওপর ডিউটি ধরলে অ্যারো মুখার্জির চাকরি থাকবে না।”
“ওমা? তুমি তখন বললে না কেন চুপি চুপি।” মিসেস নন্দী আবার বালিকা-বিস্ময় প্রকাশ করলেন।
“কেন মিসেস নন্দী? সি-বি-আইকে খবর পাঠাতেন নাকি?” অভিজিৎ রসিকতা করলো।
“কিছুই করতাম না। শুধু মহিলাকে নেশার ঘোরে ভুলিয়ে-ভালিয়ে দু-একটা লিপস্টিক হাতিয়ে নিতাম,” মিসেস নন্দী আপসোস করলেন।
মিস্টার নন্দী সন্দেহ প্রকাশ করে বললেন, “সে-মুরোদ তোমাদের নেই। মিসেস চোপরার কালচারে মানুষ হলে চক্ষুলজ্জা থাকতো না, তখন হেসে কেদে কিংবা স্রেফ অঙ্গভঙ্গী দেখিয়ে ঠিক ম্যানেজ করে আনতে। ওরা যেমন নির্লজ্জভাবে বড়কর্তাদের জন্যে তেল পাম্প করে, তেমনি নির্দয়ভাবে নিচু থেকে তেলের সাপ্লাই প্রত্যাশা করে।”
একতলা ঘরে ঘরে দেখতে দেখতে চারজনের মধ্যে কথা হচ্ছে। নিজের ঘরে বসেই সোমনাথ এসব স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।
ঘুরতে ঘুরতে ওরা যে এবার সোমনাথের ঘরের সামনে দাঁড়িয়েছে তা সোমনাথ বুঝতে পারলো। দরজাটা অর্ধেক খোলা ছিল। অভিজিৎ একটা আলতো টোকা মারলো। সোমনাথ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো।
“উঠবেন না, উঠবেন না, বসুন।” হাঁ-হাঁ করে উঠলেন মিস্টার নন্দী।
মেজদা বললো, “আমার ইয়ংগেস্ট ভাই সোমনাথ।” তারপর সোমনাথকে বললো, “খোকন, আমাদের অফিসের ট্রেনিং অ্যান্ড টাফ ম্যানেজার মিস্টার নন্দী।”
সোমনাথ সম্পর্কে শূন্যস্থান পূরণের জন্যে মিসেস নন্দী স্বভাবসিদ্ধ কৌতূহলী দৃষ্টিতে বুলবুলের দিকে তাকালেন। বুলবুলের বুঝতে বাকি রইলো না, মিসেস নন্দী কী জানতে চাইছেন। বুলবুলের বেশ অস্বস্তি লাগছে।
অভিজিৎও অস্বস্তি বোধ করছে। কিন্তু সে কায়দা করে উত্তর দিলো, “সামনে ওর নানা পরীক্ষা রয়েছে। বাড়ির ছোট ছেলে তো, আমরা তাই একটু বেশি করে ভাবছি।”
“ঠিক করছেন মশায়,” উৎসাহিত হয়ে উঠলেন মিস্টার নন্দী। মার্চেন্ট ফার্মে অফিসার পোস্টে ঢুকিয়ে ওর জীবনটা বরবাদ করে দেবেন না। তার থেকে আই-এ-এস-টেস অনেক ভালো।”
কান লাল হয়ে উঠেছিল সোমনাথের। অপমান ও উত্তেজনার মাথায় সে হয়তো কিছু, বলেই ফেলতো। কিন্তু মিস্টার নন্দী বাঁচিয়ে দিলেন। বুলবুলকে বললেন, “ওঁর পড়াশোনায় ডিসটাব করে লাভ নেই। চলুন আমরা অন্য কোথাও যাই।”
সোমনাথের মখটা যে কালো হয়ে উঠছে, তা দাদা ছাড়া কেউ লক্ষ্য করলো না।
কমলা বউদি ভিতরে খাবারের ব্যবস্থা করছেন। আর বাইরের ঘরে ওঁরা চারজন এসে বসলেন। ওঁদের সব কথাবার্তা সোমনাথ এখান থেকে শুনতে পাচ্ছে।
মিস্টার নন্দী অভিযোগ করলেন, “জিনিসপত্তরের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে আর চলছে না, মিস্টার ব্যানার্জি। আপনারা অ্যাকাউনটেন্টরা দেশের যে কী হাল করলেন।”
“আমরা কী করলাম? দেশের ভার তো অ্যাকাউনটেন্টদের হাতে দেওয়া হয়নি, তাহলে—ইন্ডিয়ার এই অবস্থা হতো না!” অভিজিৎ হাসতে-হাসতে উত্তর দিলো।
“পার্সোনেল অফিসারদের হাতেও দেশটা নেই। থাকলে, অন্তত স্কুলে কলেজে, পথে-ঘাটে, কল-কারখানায়, অফিসে-আদালতে ডিসিপ্লিনটা বজায় রাখা যেতো।” দুঃখ করলেন মিস্টার নন্দী।
“তাহলে দেশটা রয়েছে কার হাতে?” একটু অবাক হয়েই প্রশ্ন করলেন মিসেস নন্দী।
“মা জননীদের হাতে!” রসিকতা করলেন মিস্টার নন্দী। “সঙ্গে তালিম দিচ্ছেন কয়েকজন ব্রীফলেস উকিল এবং টেকসট-বুক পড়া প্রফেসর। ম্যানেজমেন্টের ‘ম’ জানেন
