বউদি রসিকতার সুযোগ ছাড়লেন না। বললেন, “আমাকে কেন? নিজের বউকেই জিজ্ঞেস করো।”
বউকে কিছুই জিজ্ঞেস করলো না মেজদা। বললো, “নিজে বাজারে বেরোলেই পারো।”
“কী কথাবার্তার ধরন! দেখলেন তো দিদি।” বুলবুল স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো কমলা বউদির কাছে!
সোমনাথের এইসব রস-রসিকতা ভালো লাগছে না। সে নিজের ঘরের ভিতর চকে বসে রইলো।
এখান থেকেও ওদের সমস্ত কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। কমলা বউদি কাজলকে বললেন, “কেন তুমি বুলবুল বেচারার পিছনে লাগছো?”
বুলবুল সাহস পেয়ে গেলো। বরকে সোজা জানিয়ে দিলো, “ইচ্ছে হলে বাজার করতে পারি। কিন্তু অগ্নিসাক্ষী রেখে মন্তর পড়ে খাওয়ানো-পুরানোর দায়িত্ব নিয়েছিলে কেন?”
স্বামী-স্ত্রীর এই খুনসুটি অন্য সময় মন্দ লাগে না সোমনাথের। বুলবুলের মধ্যে সখীভাবটা প্রবল, আর কমলা বউদির মধ্যে মাতৃভাব। কমলা বউদি দু-একবার সোমনাথকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, “বুলবুলও বউদি, ওকে বউদি বলবে।” ওই জিনিসটা পারবে না সোমনাথ! ভূতপর্ক কলেজ-বান্ধবীকে রাতারাতি বউদি করে নিতে পারবে না। বুলবুলও একই পথ ধরেছে। সোমনাথকে ঠাকুরপো বলে না, কলেজের নাম ধরেই ডাকে।
কমলা বউদি বলেছিলেন, “নিদেনপক্ষে সোমদা বোলো।”
বুলবুল তাতেও রাজী হয়নি—“আমার থেকে বয়সে তত বড় নয়। সুতরাং হোয়াই দাদা?”
কমলা বউদির গলা শোনা গেলো। “বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাত্রে ঝগড়া কোরো বুলা। এখন খোকনকে ছেড়ে দাও।”
সোমনাথের ঘরে ঢুকে বুলবুল বললো, “ভাই সোম, রক্ষে করো।”
সোমনাথ নিজেই এবার হাল্কা হবার চেষ্টা করলো। বললো, “দাদার হাত থেকে কী করে রক্ষে করবো? জেনেশুনেই তো বিয়ের মন্ত্র পড়েছিলে?”
দেওরের দিকে তির্যক দৃষ্টি দিলো বুলবুল। তারপর শাড়ির আঁচলে ভিজে হাতদুটো মছলো। বললো, “তুমিও আমার পিছনে লাগছে সোম? অফিসের যে-লোকটা খেতে আসবে সে বেজায় খুতখুতে। বউটা তেমনি নাক উঁচু। যদি আপ্যায়নের দোষ হয় অফিসে কথা উঠবে। আর তোমার দাদা আমাকে আস্ত রাখবে না।”
সোমনাথ কপট গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললো, “বাজারে আস্তর চেয়ে কাটার দাম বেশি।”
বুলবুল ছাড়লো না। আঁচলটা কোমরে জড়াতে জড়াতে বললো, “এর প্রতিশোধ একদিন আমিও নেবো, সোম। তোমারও বিয়ে হবে এবং বউকে আমাদের খপরে পড়তে হবে।”
রসিকতায় খুশী হতে পারলো না সোমনাথ। এ-বাড়ির বেকার সোমনাথের বিয়ের কথা তোলা যে ব্যঙ্গ তা মোক্ষদা ঝিও জানে।
বুলবুল বললো, “ইলিশ এবং ভেটকি দু রকমই মাছ নিও, সোম। ওরা আবার আমাদের চিংড়ি মাছও খাইয়েছিল। আমি কিন্তু টেক্কা দেবার চেষ্টা করবো না।”
বাজার ঠিকমতো করেছিল সোমনাথ। কিন্তু বাড়িতে অতিথি আসবে শুনলেই সে অস্বস্তি বোধ করে। অতিথির সঙ্গে পরিচয়ের পর্বটা সোমনাথ মোটেই পছন্দ করে না। দুপুরবেলা হলে সোমনাথ কোথাও চলে যেতো-ন্যাশনাল লাইব্রেরির দরজা তো বেকারদের জন্যেও খোলা রয়েছে। কিন্তু অতিথি আসছেন রাত্রিবেলাতে।
অতিথি পরিচয়ের আধুনিক বাংলা কায়দটিা সোমনাথের কাছে মোটেই শোভন মনে হয় না। নমস্কার, ইনি অভিজিৎ ব্যানার্জির ভাই, বললেই পর্বটা চুকে যাবে না। একটা অলিখিত প্রশ্ন বিরাট হয়ে দেখা দেবে। ‘ভাই তো বুঝলাম, কিন্তু ইনি কী করেন?’ কলকাতার তথাকথিত ভদ্রসমাজে এ-প্ৰশ্ন এড়িয়ে যাবার কোনো উপায় নেই।
অতিথিরা সন্ধ্যা সাড়ে-সাতটার সময় এলেন। মিস্টার অ্যান্ড মিসেস এম কে নন্দীকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে বলল এক্সট্রা স্পেশাল সাজ করে সময় গণছিল। এই সাজের পিছনে বুলবুলের অনেক চিন্তা আছে। মেজদার সঙ্গে জল্পনা-কল্পনা হয়েছে। বুলবুলকে দেখে কমলা বউদি মন্তব্য করলেন, “এতো ভেবে-চিন্তে শেষ পর্যন্ত এই সাধারণ কাজ হলো?”
বুলবুল উত্তর দিলো, “আর বলেন কেন, দিদি। এইটাই নাকি এখনকার চালু স্টাইল। নিজের বাড়ি তো—খুব ব্রাইট কোনো শাড়ি পরলে এবং লাউড মেক-আপ থাকলে ভাববে ইনি নিজেই বাইরে নেমন্তন্ন রাখতে যাচ্ছেন। তাই মেক-আপ খুব টোন-ডাউন করতে হবে এবং শাড়িটা যেন সাধারণ মনে হয়। কিন্তু শাড়ির দামটা যে মোটেই সাধারণ নয় তা যেন অভ্যাগতরা বুঝতে পারেন। ভাবটা এমন, এতোক্ষণ রান্নাঘরেই ছিলাম, আপনারা এসেছেন শুনে আলতোভাবে মুখের ঘামটা মছে দুত চলে এসেছি। অতিথি আপ্যায়নের সময় কী নিজের সাজ-গোজের কথা খেয়াল থাকে?”
সোমনাথের হাসি আসছিল। অফিসার হয়েও তাহলে শান্তি নেই কত রকমের অভিনয় করতে হয়। বুলবুল অবশ্য পারবে—ওর এইসব ব্যাপারে বেশ ন্যাক আছে।
মিস্টার-মিসেস নন্দীকে গেটেই কাজল ও বলল অভ্যর্থনা করলো। এ-বাড়ির রীতি অনুযায়ী অতিথি দম্পতিকে একবার ওপরে বাবার কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। বাবার সঙ্গে দু-একটা কথার পর মিস্টার-মিসেস নন্দী নিচে নেমে এলেন।
মুখে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল বললো, “আমার ভাশরের সঙ্গে আপনার আলাপ হলো না। উনি এখন ট্যুরে রয়েছেন।”
মেজদা বললো, “বউদিকে ডাকো।” কমলা বউদিকে ধরে আনবার জন্যে বুলবুল বেরিয়ে যেতেই মিস্টার নন্দীকে মেজদা বললো, “দাদা ব্রিটিশ বিস্কুট কোম্পানিতে আছেন। কয়েক সপ্তাহের জন্যে বোম্বাই গিয়েছেন। ওদের কোম্পানির নাম পাল্টাচ্ছে—ইন্ডিয়ান বিস্কুট হচ্ছে।”
মিস্টার নন্দী বললেন, “হতেই হবে। সমস্ত জিনিসই আমাদের ক্রমশ দিশী করে ফেলতে হবে, মিস্টার ব্যানার্জি।”
“রাখো তোমার স্বদেশী মন্তর,” মিসেস নন্দী স্বামীকে বকুনি লাগালেন। “তোমাদের আপিসের সব সায়েবগলে চলে গিয়ে যখন হরিয়ানী বসবে তখন মজা বুঝতে পারবে।”
