“আঃ! সুকুমার,” বকুনি লাগালো সোমনাথ।
সুকুমার বললো, “তোকে একটা কোশ্চেন করি। বল দিকিনি বেকার ক’রকমের?”
মাথা চুলকে সোমনাথ উত্তর দিলো, “শিক্ষিত বেকার এবং অশিক্ষিত বেকার।”
বেশ বিরক্ত হয়ে সুকুমার চিৎকার করে উঠলো, “তুই একটা গর্দভ। তুই চিরকাল ধর্মের ষাঁড় হয়ে বউদির দেওয়া ভুষি খেয়ে যাবি। তোর কোনোদিন চাকরি-বাকরি হবে না তোর জেনারেল নলেজ খুবই পুওর!”
হাঁপাতে লাগলো সুকুমার। তারপর বললো, “টুকে নে—বেকার দু’রকমের। কুমারী অথবা ভার্জিন বেকার এবং বিধবা বেকার। তুই এবং আমি হলুম ভার্জিন বেকার কোনোদিন চাকরি পেলুম না, স্বামী কি দোব্য জানতে পারলাম না। আর ছাঁটাই হয়ে যারা বেকার হচ্ছে তারা বিধবা বেকার। যেমন আমার ছাত্তরের বাবা। রাধা গ্লাস ওয়ার্কসে কাজ করতো, দিয়েছে আর-পি-এল-রানিং পোঁদে লাথি। আমার বাকি মাইনেটা দিলো না—এখনও ব্লেড কিনতে পারছি না। আমার বাবাও বিধবা হবে, এই মাসের শেষ থেকে।”
সোমনাথ বললো, “বাড়ি চল। তোকে চা খাওয়াবো।”
সুকুমার রেগে উঠলো। “চাকরি হলে অনেক চা খাওয়া যাবে। এখন মরবার সময় নেই। জেনারেল নলেজের অনেক কোশ্চেন বাকি রয়েছে।’
একটু থেমে কী যেন মনে করার চেষ্টা করলো সুকুমার। তারপর সোমনাথের হাতটা ধরে বললো, “তুই জানিস ‘পেরেডেভিক কী? নকুলবাবু বললেন, পেরেডেভিক এক ধরনের সর্যমুখী ফলের বিচি—ওয়েস্টবেঙ্গলে আনানো হচ্ছে রাশিয়া থেকে, যাতে আমাদের রান্নার তেলের দঃখ ঘুচে যায়। কিন্তু কোনো জেনারেল নলেজের বইতে উত্তরটা খুঁজে পাচ্ছি না! ভুল হয়ে গেলে দুটো নম্বর নষ্ট হয়ে যাবে।”
পাথরের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো সোমনাথ। সুকুমার বললো, “রাখ রাখ—এমন পোজ দিচ্ছিস যেন সিনেমার হিরো হয়েছিস। চাকরি যদি চাস আমার সঙ্গে জেনারেল নলেজে লড়ে যা। কোশ্চেন অ্যানসার দই-ই বলে যাচ্ছি। কারুর মুরোদ থাকে তো চ্যালেঞ্জ করুক। ডং হা কোথায়?–দক্ষিণ ভিয়েৎনামের বিখ্যাত জেলা। গাম্বিয়া এবং জাম্বিয়া কী এক?—মোটেই না। গাম্বিয়া পশ্চিম আফ্রিকায়, আর পুরানো উত্তর রোডেশিয়ার নতুন নাম জাম্বিয়া।”
বন্ধুকে থামাতে গেলো সোমনাথ। কিন্তু সুকুমার বলে চললো, “শুধু পলিটিক্যাল সায়েন্স জানলে চলবে না। ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য, স্বাস্থ্য, ফিজিকস, কেমিসট্রি, ম্যাথমেটিকস—সব বিষয়ে হাজার হাজার কোশ্চেনের উত্তর রেডি রাখতে হবে। আচ্ছা, বল দিকি শরীরের সবচেয়ে বড় গ্লান্ডের নাম কী?”
চুপ করে রইলো সোমনাথ। প্রশ্নটার উত্তর সে জানে না।
“লিভার, লিভার,” চিৎকার করে উঠলো সুকুমার। তারপর নিজের খেয়ালেই বললো, “ফেল করিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু হাজার হোক বউদির ধর্মশালায় আছিস, দেখলে দঃখ হয়, তাই আর একটা চান্স দিচ্ছি। কোন ধাতু সাধারণ ঘরের টেমপারেচারে তরল থাকে?”
এবারেও সোমনাথকে চুপ করে থাকতে দেখে সুকুমার বললো, “তুই কি চিরকাল বৌদির আঁচল ধরে থাকবি? এই উত্তরটাও জানিস না? ওরে মখ, ‘পারা,’—মার্কারির নাম শুনিসনি?”
সুকুমার তারপর বললো, “দুটো ইমপর্টেন্ট কোশ্চেনের উত্তর জেনে রাখ! লাস্ট সাপার’ ছবিটি কে এঁকেছিলেন? উত্তর : লিওনার্ডো দা ভিঞ্চি। দ্বিতীয় কোশ্চেন : ‘বিকিনি’ কোথায়? খুব শক্ত কোশ্চেন। যদি লিখিস মেমসায়েবদের স্নানের পোশাক, স্রেফ, গোল্লা পাবি। উত্তর হবে : প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ—এটম বোমার জন্যে বিখ্যাত হয়ে আছে।”
সোমনাথকে আরও অনেক কোশ্চেন শোনাতো সুকুমার। সোমনাথ বুঝলল, ওর মাথার গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। মনের দুঃখে সে হাঁটতে আরম্ভ করলো। সুকুমার বললো, “তোর আর কি! হোটেল-ডি-পাপায় রয়েছিস-পড়াশোনা না করলেও দিন চলে যাবে। আমাকে দশদিনের মধ্যে চাকরি যোগাড় করতেই হবে।”
চোখের সামনে সুকুমারের এই অবস্থা দেখে সোমনাথের চোখ খুলতে আরম্ভ করেছে। একটা অজানা আশঙ্কা ঘন কুয়াশার মতো অসহায় সোমনাথকে ক্রমশ ঘিরে ধরেছে। তার ভয় হচ্ছে, কোনোদিনই সে চাকরি যোগাড় করতে পারবে না। সুকুমারের মতো তার ভাগ্যেও চাকরির কথা লিখতে বিধাতা ঠাকুর বোধহয় ভুলে গেছেন।
০৯. অফিসের এক বন্ধুকে
মেজদা অফিসের এক বন্ধুকে সস্ত্রীক বাড়িতে নেমন্তন্ন করেছে। জুনিয়রমোস্ট অ্যাকাউনটেন্ট কাজলের তুলনায় এই ভদ্রলোক অনেক বড় চাকরি করেন। কিন্তু কাজলের সঙ্গে ইনি মেলামেশা করেন। একবার বাড়িতে নেমন্তন্ন না করলে ভালো দেখাচ্ছিল না।
বুলবুলের বিশেষ অনুরোধে সোমনাথকে গড়িয়াহাটা থেকে বাজার করে আনতে হয়েছে।
হাতে কোনো কাজ-কর্ম নেই, তবও আজকাল বাজারে যেতে প্রবৃত্তি হয় না সোমনাথের। অরবিন্দর সঙ্গে ওইখানে দেখা হয়ে যেতে পারে। এবং দেখা হলেই জিজ্ঞাসা করবে, ফরেনে যাবার ব্যবস্থা কতদরে এগুলো। বাজারে যাবার আগে বুলবুল বলেছিল, “তোমার মেজদাকে বাজারে পাঠিয়ে লাভ নেই। হয়তো পচা মাছ এনে হাজির করবেন।”
দুর থেকে কমলা বউদি হাসতে-হাসতে বললেন, “দাঁড়াও, কাজলকে ডাকছি।”
বুলবুল ঘাড় উঁচু করে বললো, “ভয় করি নাকি? যা সত্যি, তাই বলবো। অফিসে ঠাণ্ডা ঘরে বসে হিসেব করা আর জিনিস বুঝে-শনে সংসার করা এক জিনিস নয়।”
মেজদার কানে দই বউয়ের কথাবার্তা এমনিতেই পৌঁছে গেলো। মাথার চুল মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে বউদিকে অভিজিৎ জিজ্ঞেস করলো, “কী বলছো?”
