সুকুমার এমনই বোকা যে ভাবছে ওরা নিশ্চয়ই অনেক কিছু জানে, না হলে বড় বড় পোস্টে কী ভাবে বসলো?
সুকুমার বললো, “পরের কোশ্চেনটায় অবশ্য অনেকেই মার খাবে—পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণীর নাম। আমি তো ভাই সরল মনে হাতির নাম লিখে বসে আছি। নকুলবাবু বললেন, সঠিক উত্তর হবে ব্লু হোয়েল। এক-একটার ওজন দেড়শ’ টন। হাতি সে তুলনায় শিশ!”
“চুলোয় যাক ওসব।” আবার তেড়ে উঠলো সোমনাথ। “করবি তো কেরানির চাকরি। তার জন্যে হাতির ডাক্তার হয়ে লাভ কী?”
বেচারা সুকুমার একটু মুষড়ে পড়লো। বললো, “তোর তো আমার মতো অবস্থা না। তুই এসব কথা বলতে পারিস। তুই মজাসে বাবা-দাদার হোটেলে আছিস। যে কোনো কোশ্চেন তুই ছেড়ে দিতে পারিস। আমার বাবাকে রিটায়ারের বিপিত্তর শুকিয়ে দিয়েছে। সামনের মাস থেকে বাবার চাকরি থাকবে না। পরের মাস থেকে মাইনে পাবে না। প্রতি সপ্তাহে আটটা লোকের রেশন তুলতে হবে আমাদের। বাড়ি ভাড়া আছে। মায়ের অসুখ। সুতরাং সমস্ত কোশ্চেনের উত্তর আমাকে দিতে হবে। আমার যে একটা চাকরি চাই-ই।”
০৮. সুকুমার সেদিন চলে গিয়েছিল
সুকুমার সেদিন চলে গিয়েছিল। যাবার পর সোমনাথের একটু দুঃখ হয়েছিল। দুনিয়ার ওপরে তার যে রাগ সেটা সুকুমারের ওপর ঢেলে দেওয়া উচিত হয়নি। সুকুমার বেচারার কী যে হলো সেই থেকে। বিশেষ আসে না। দিনরাত নাকি সাধারণ জ্ঞান বাড়াচ্ছে। একদিন বিকেলে সুকুমার দেখা করতে এলো। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। বললো, “বাবার কাছে খুব বকুনি খেলাম। বোনটাও আবার দলে যোগ দিয়ে বললো, কোনো কাজকম্মই তো নেই। শুধু নমোনমো করে একটা দশ টাকা মাইনের টিউশনি সেরে আসো। বসে না থেকে সাধারণ জ্ঞান বাড়াতে পারো না?”
সোমনাথকে কেউ এইরকম কথা বলেনি। কিন্তু হঠাৎ কেমন যেন ভয় হলো সোমনাথের। এ-বাড়িতে তো একদিন এমন কথা উঠতে পারে।
সুকুমারের মন যে শক্ত নয় তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। ওর কীরকম ধারণা হয়ে যাচ্ছে, সাধারণ জ্ঞানটা ভালো থাকলেই ও সেদিনের চাকরিটা পেয়ে যেতো।
সুকুমার নিজেই বললো, “বাবা ঠিকই বলেছিলেন—সযোগ রোজ রোজ আসে না। অত বড় সুযোগ এলো অথচ পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম রিপাবলিকের নামটা লিখতে পারলাম না। দোষ তো কারো নয়, দোষ আমারই। বাঙালীদের তো এই জন্যই কিছু হয় না। নিজেরা একদম চেষ্টা করে না, পরীক্ষার জন্যে তৈরি হয় না।”
সুকুমারের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। ঠিক গাঁজাখোরের মতো দেখাচ্ছে। “সুকুমার মিত্তির আর ভুল করবে না। সবরকমের জেনারেল নলেজ বাড়িয়ে যাচ্ছি। এবার চান্স পেলে ফাটিয়ে দেবো।”
“তা দিস। কিন্তু দাড়ি কাটছিস না কেন? বরশ কোম্পানিকে নিজের খোঁচা দাড়ি বিক্রি করবি নাকি?” সোমনাথ রসিকতা করলো।
ঠোঁট উল্টোলো সুকুমার। বললো, “সুকুমার মিত্তির বেকার হতে পারে কিন্তু এখনও বেটাছেলে আছে। সুকুমার মিত্তির প্রতিজ্ঞা করেছে বাপের পয়সায় আর দাড়ি কামাবে না। টিউশনির মাইনে দিতে দেরি করছে। তাই ব্লেড কেনা হচ্ছে না।”
সোমনাথ উঠে দাঁড়ালো। ঘরের কোণ থেকে একটা ব্লেড বার করে সুকুমারকে বললো, “নে। এটা তোর বাবার পয়সায় কেনা নয়।”
সুকুমার শান্ত হয়ে গেলো। প্রথমে ব্লেড নিলো। পকেটে পরলো। তারপর কী ভেবে পকেট থেকে ব্লেডটা বার করে ফিরিয়ে দিলো। বললো, “কাররে বাবার ব্লেড আমি নেবো।”
হন হন করে বেরিয়ে গেলো সুকুমার। বেশ মুষড়ে পড়লো সোমনাথ। যাবার আগে সুকুমার কি তাকেই অপমান করে গেলো? সকলের সামনে মনে করিয়ে দিয়ে গেলো, সোমনাথও রোজগার করে না, অন্যের পয়সায় দাড়ি কামায়।
সুকুমারের অবস্থা যে আরও খারাপ হবে তা সোমনাথ বুঝতে পারেনি। মেজদা একদিন বললেন, “তোর বন্ধু, সুকুমারের কী হয়েছে রে?”
“কেন বলো তো?” সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো।
মেজদা বললেন, “তোর বন্ধুর মুখে এক জঙ্গল দাড়ি গুজিয়েছে। চুলে তেল নেই। পোস্টাপিসের কাছে আমার অফিসের গাড়ি থামিয়ে বললো, একটা আজেট প্রশ্ন ছিল। আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি। ও নিজেই পরিচয় দিলো, ‘আমি সোমনাথের বন্ধ, সুকুমার।” আমি ভাবলাম সত্যিই কোনো প্রশ্ন আছে। ছোকরা বেমালুম জিজ্ঞেস করলো, “চাঁদের ওজন কত? আমি ্বললাম, জানি না ভাই। সুকুমার রেগে উঠলো। জানেন। বলবেন না তাই বলুন। আমি ্বললাম, বিশ্বাস করো, আমি সত্যিই চাঁদের ওজন জানি না। ছোকরা বললো, “এত বড় কোপানির অফিসার আপনি, চাঁদের ওজন জানেন না? হতে পারে? তারপর ছোকরা কী বিড়বিড় করতে লাগলো, পুরো দুটো নম্বর কাটা যাবে।”
মেজদা বললেন, “এর পর আমি আর দাঁড়াইনি। অফিসের ড্রাইভারকে গাড়িতে সাট দিতে ্বললাম।” একটু থেমে মেজদা বললেন, “এর আগে ছোকরা তো এমন ছিল না। বদসঙ্গে আজকাল কী গাঁজা খাচ্ছে নাকি?”
সৎ কিংবা বদ কোনো সঙ্গীই নেই সুকুমারের। নিজের খেয়ালে সে ঘুরে বেড়ায়। গড়িয়াহাট ওভারব্রিজের তলায় সুকুমারকে দূর থেকে সোমনাথ একদিন দেখতে পেলো। খুব কষ্ট হলো সোমনাথের। কাছে গিয়ে ওর পিঠে হাত দিলো, “সুকুমার না?”
সুকুমারের হাতে একখানা শতচ্ছিন্ন হিন্দুস্থান ইয়ারবক, একখানা জেনারেল নলেজের বই, আর কমপিটিশন রিভিউ ম্যাগাজিনের পুরানো কয়েকটা সংখ্যা। একটা বড় পাথরের ওপরে বসে সুকুমার পাতা ওল্টাচ্ছিল। বিরক্ত হয়ে সোমনাথের দিকে তাকিয়ে সুকুমার বললো, “মন দিয়ে একটু পড়ছি, কেন ডিসটার্ব করলি?”
