সোমনাথ এসব বিশ্বাস করে না। কিন্তু বউদির সঙ্গে তর্ক করতে ইচ্ছে হয়নি।
হল-এর কাছাকাছি এসেই সোমনাথ কিন্তু আশা ছেড়ে দিয়েছিল। এ-যে স্কুল ফাইন্যাল পরীক্ষার বাড়া। হাজার-হাজার ছেলে আসছে। এবং তাও নাকি দফে-দফে কদিন ধরে পরীক্ষা। রোল নম্বরের দিকে নজর দিয়েই ব্যাপারটা বোঝা উচিত ছিল সোমনাথের। চব্বিশ হাজার কত নম্বর তার। আরও কত আছে কে জানে? হিন্দুস্থানী ফেরিওয়ালারা খবর পেয়েছে। তারা মুড়ি, বাদাম, পাঁউরটি, চা ইত্যাদির বাজার বসিয়েছে।
দিনের শেষে মুখ শুকনো করে সোমনাথ বাড়ি ফিরলো। বউদি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, জিজ্ঞেস করবেন কেমন পরীক্ষা হলো। কিন্তু সোমনাথের ক্লান্ত মখ-চোখ দেখে কিছুই জানতে চাইলেন না। কাজের অছিলায় বাবাও নেমে এলেন। কায়দা করে জিজ্ঞেস করলেন, “ফেরবার সময় বাস পেতে অসুবিধে হয়নি তো?”
সোমনাথ সব বুঝতে পারছে। বাবা কেন নেমে এসেছেন তাও সে জানে। সে গভীরভাবে বললো, “এইভাবে লোককে কষ্ট না দিয়ে চাকরিগুলো লটারি করতে পারে। ন’টা পোস্টের জন্যে ‘সাতাশ হাজার ছেলেমেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। এর থেকে কে যোগ্য কীভাবে ঠিক করবে?”
বাবা ব্যাপারটা বুঝলেন। আর কথা না বাড়িয়ে আবার ওপরে উঠে গেলেন, যদিও প্রশ্নগুলো তাঁর দেখবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু কোশ্চেন পেপার নিয়ে আসতে দেয়নি, পরীক্ষা হল-এই ফেরত নিয়েছে।
পরের দিন সকালে সুকুমার আবার এসেছে। ওর মুখ-চোখের অবস্থা দেখে বউদি পর্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে তোমার? রাত্রে ঘুমোওনি?”
সুকুমার কষ্ট করে হাসলো। তারপর সোমনাথের খোঁজ নিলো। “কীরে? তোর পরীক্ষা কেমন হলো?”
সোমনাথ বিছানাতেই শুয়ে ছিল। উঠে বললো, “যা হবার তাই হয়েছে।”
সুকুমার বললো, “ইংরাজী রচনায় কোনো অলটারনেটিভ ছিল না। এম-এল-এ-দার কাছে শুনে গেলাম ‘গরিবী হটাও পড়বে। ওই প্রবন্ধটা এমন মুখস্থ করে গিয়েছিলাম যে চান্স পেলে ফাটিয়ে দিতাম। জীবেন মুখজ্যে গোল্ড মেডালিস্টের লেখা।”
সোমনাথ চুপচাপ সুকুমারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। সুকুমার বললো, “আনএমপ্লয়মেন্ট সম্বন্ধেও একটা রচনা খেটেখটে তৈরি করেছিলাম। বেকার সমস্যা দূর করবার জন্যে অডিনারি বইতে মাত্র ছ’টা কর্মসূচী থাকে তার জায়গায় আমি সতেরটা দফা, ঢুকিয়েছিলাম। পড়লে ফাটিয়ে দিতাম। কিন্তু এমনই পোড়া কপাল যে রচনা এলো ‘ভারতীয় সভ্যতায় অরণ্যের দান’।”
মুখ কাঁচুমাচু করে সুকুমার জিজ্ঞেস করলো, “তুই কি লিখলি রে? তোর নিশ্চয় বিষয়টা তৈরি ছিল!”
“মুণ্ডু ছিল,” সোমনাথ রেগে উত্তর দিলো।
“আমারও রাগ হচ্ছিল, কিন্তু চাকরি খুঁজতে এসে রাগ করলে চলবে না। তাই ফেনিয়ে ফেনিয়ে লিখে দিলুম, অরণ্য না থাকলে ভারতীয় সভ্যতা গোল্লায় যেতে-কেউ তাকে বাঁচাতে পারতো না।” সুকুমার অসহায়ভাবে বললো।
তুই তো তব লিখেছিস, আমি ছেড়ে দিয়ে এসেছি।”
সুকুমার সমস্ত বিষয়টাকে ভীষণ গুরত্ব দিয়েছে। এবার মুখ কাঁচুমাচু করে বললো, “ভাই সোম, লাস্ট পেপারে এসে ড়ুবলাম। জেনারেল নলেজে ভীষণ খারাপ করেছি।”
সোমনাথের এসব বিষয় আলোচনা করতেই ভালো লাগছিল না। কিন্তু সুকুমার। নাছোড়বান্দা।
সুকুমার বললো, “একটা মাত্র প্রশ্ন পেরেছি—ভারতে বেকারের সংখ্যা কত? মুখস্থ ছিল—পাঁচ কোটি। দু নম্বর কোনো বেটা আটকাতে পারবে না।”
“একশ’র মধ্যে দু নম্বর মন্দ কী?” ব্যঙ্গ করলো সোমনাথ।
সুকুমারের মাথায় ওসব সক্ষম ইঙ্গিত ঢাকলো না। সে বললো, “আরেকটা কোশ্চেনে দু নম্বর দিতেও পারে, নাও দিতে পারে। সেইটে নিয়ে চিcীয় পড়ে গেছি। নীলগিরি’ সম্বন্ধে আমি ভাই লিখে দিয়েছি-দাক্ষিণাত্যের পর্বত। কিন্তু অন্য ছেলেরা বললো, আমাকে নম্বর দেবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার চাকরি তো! লিখতে হবে ভারতের নতুন ফ্রিগেট।”
খুব দুঃখ করতে লাগলো সুকুমার। “আমার মাথায় সত্যিই গোবর। কাগজে বেরিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নিজে নীলগিরি জলে ভাসালেন—আর আমি কিনা ছাই লিখে ফেললাম নীলগিরি পর্বত।”
বউদি চা দিতে এসে ব্যাপারটা শুনলেন। বললেন, “আমার তো মনে হয় তুমিই ঠিক লিখেছো। নীলগিরি পর্বত তো চিরকাল থাকবে, যুদ্ধ জাহাজ নীলগিরির পরমায়, ক’বছর?”
সুকুমার আশ্বস্ত হলো না। আপনি ভুল করছেন বউদি। ফ্রিগেট নীলগিরি যে গভরমেণ্টের। গভরমেন্টের কোম্পানিতে চাকরির চেষ্টা করবে আর গভরমেন্টের জিনিস সম্বন্ধে লিখবে না, এটা কেন চলবে? নেহাত আমাকে যদি বাঁচাতে চায়, এগজামিনার হয়তো দ-এর মধ্যে এক নম্বর দেবে।”
“ওসব ভেবে কী হবে?” সোমনাথ এবার বন্ধুকে বোঝাবার চেষ্টা করে। কিন্তু সুকুমার নিজের খেয়ালেই রয়েছে। বললো, “যা দুঃখ হচ্ছে না, মাইরি। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট প্রজাতন্ত্রের নামটা জেনে যাইনি।”
‘ডজন ডজন দেশ যখন রয়েছে, তখন তার মধ্যে একটা বৃহত্তম এবং একটা ক্ষুদ্রতম হবেই,” সোমনাথের কথায় এবার বেশ শ্লেষ ছিল।
সুকুমার কিন্তু এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। বললো, “খবরের কাগজ অফিসের নকুল চ্যাটার্জির সঙ্গে বাসে দেখা হলো। উনি বলে দিলেন, উত্তর হবে, স্যান মেরিনো রাজ্য, ইটালির কাছে। দেশটার সাইজ কলকাতার মতো, মাত্র পনেরো হাজার লোক থাকে।” খুব দুঃখ করতে লাগলো সুকুমার। “আগে থেকে জেনে রাখলে আরও দু নম্বর পেতুম।”
সোমনাথ এবার রাগে ফেটে পড়লো। “আপিসের জেনারেল ম্যানেজার এইসব প্রশ্নের উত্তর জানে?”
