.
বার বার যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে শত্রুপক্ষ পিছু হটে গেল। পুনরায় আক্রমণের চেষ্টা তাদের মন থেকে কর্পূরের মত উবে গেল। ফরহাদের পরিচালনায় বিমানবাহিনী শত্রুপক্ষকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জয়ী হল মিত্রপক্ষ। পরাজয়ের কালিমা মুখে মেখে হটে পড়ল শত্রুপক্ষ। সেনাপতি নাসের আলীর আনন্দ আর ধরে না! শুধু তিনিই নন, সমস্ত সামরিক অফিসারদের মুখমণ্ডল জয়ের উল্লাসে দীপ্ত হয়ে উঠলো। সবাই একবাক্যে ক্যাপ্টেন ফরহাদের রণকৌশলের প্রশংসা করতে লাগলেন।
কিন্তু এক আশ্চর্য ব্যাপার-সবাই যখন ক্যাপ্টেন ফরহাদের গুণগান করেছেন, তখন দেখা গেল ফরহাদ আর তাদের মধ্যে নেই! আর নেই জব্বার খা।
এ ব্যাপার নিয়ে দেশময় একটা হুলস্থুল পড়ে গেল। সেনাপতি নাসের এবং মেজর জেনারেল হাশেম খান ও অন্যান্য সামরিক অফিসার গভীর চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
পত্রিকায় পত্রিকায় যখন ক্যাপ্টেন ফরহাদের জয়গান প্রচারিত হচ্ছে, এমন দিনে শোনা গেল ফরহাদের নিরুদ্দেশের কথা।
কথাটা জানতে পেরে দেশবাসী গভীর শোকাভিভূত হয়ে পড়ল। সকলের মুখমণ্ডল বিষণ্ণ মলিন হলো। নিশ্চয়ই শত্রুপক্ষ তাঁকে গোপনে চুরি করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে।
দেশবাসী যখন ক্যাপ্টেন ফরহাদের নিরুদ্দেশ ব্যাপার নিয়ে চিন্তিত, এমন দিনে মেজর। জেনারেল একখানা চিঠি পেলেন। চিঠিখানা পড়ে তিনি স্তম্ভিত-হতবাক হয়ে পড়লেন। চিঠিতে লেখা রয়েছে মাত্র একটি কথা–
মাতৃভূমি রক্ষার্থে আমাদের প্রচেষ্টা
সার্থক হয়েছে। এজন্য আমরা
ধন্য। আপনাদের অভিনন্দন আমি সানন্দে গ্রহণ করেছি।
-দস্যু বনহুর
চিঠির কথা অল্পক্ষণের মধ্যেই ফোনে সমস্ত সামরিক অফিসে পৌঁছে গেল। পৌঁছল পুলিশ অফিসে প্রত্যেকটা অফিসারের কানে। সবাই নির্বাক, বিস্ময়ে স্তম্ভিত-এ যে কল্পনার অতীত”! যে দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের জন্য অহঃরহ পুলিশ বাহিনী উন্মাদের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে, পুলিশ সুপার যাকে জীবিত কিংবা মৃত এনে দেবার জন্য লাখ টাকা ঘোষণা করেছেন, সেই দস্যু বনহুর আজ সকলের অভিনন্দন গ্রহণের পাত্র।
কথাটা পত্রিকায় বিরাট আকারে প্রকাশ পেল।
লোকের মুখে মুখে, পথে-ঘাটে-মাঠে সর্বত্র দস্যু বনহুরের জয়-জয়কার!
নূরী গহন বনে বসে শুনলো সব। আনন্দে স্ফীত হয়ে উঠলো তার বুক। তার বনহুর আজ জয়ের টিকা ললাটে পরে ফিরে এসেছে। কি বলে যে সে অভিনন্দন জানাবে খুঁজে পেল না। আনন্দোচ্ছাসে গুণ গুণ করে গান গাইতে লাগলো সে। ইচ্ছে হল, হাওয়ায় ডানা মেলে ভেসে বেড়াবে-কিন্তু সে যে মানুষ! বনে বনে ঘুরে অনেক ফুল সগ্রহ করলো, ঝর্ণার পাশে বসে সুন্দর করে মালা গাঁথলো। তারপর পা টিপে টিপে প্রবেশ করলো বনহুরের বিশ্রামকক্ষে। অতি সন্তর্পণে বনহুরের বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বনহুর বিছানায় অর্ধশায়িত অবস্থায় শুয়ে শুয়ে কি যেন ভাবছিল। শরীর ক্লান্ত, তাই কোথাও বের হয় নি সে। নূরী ঠিক তার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর চট করে মালাখানা পরিয়ে দিল সে তার গলায়।
বনহুর মৃদু হেসে বললো–খুব যে খুশি দেখছি, ব্যাপার কি নূরী?
নূরী হেসে বললো–হুর, আজ কি বলে তোমাকে……
থাক, ঐ ঢের হয়েছে। বস।
নূরী বনহুরের বিছানার একপাশে বসে পড়ে বলল–হুর, আজ তোমার জয়গানে দেশবাসী পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছে।
কে বলল এসব কথা তোমাকে?
কেন, রহমান–রহমান সব পত্রিকাগুলো আমাকে এনে দিয়েছে।
তুমি পত্রিকা পড়তে শিখেছ?
বাঃ তোমার বুঝি মনে নেই? তুমিই তো আমাকে লেখা আর পড়া শিখিয়েছ?
এতোবড় যে পণ্ডিত হয়েছ তা জানতাম না।
পত্রিকা পড়তে পারলেই বুঝি পণ্ডিত হয়? অভিমান-ভরা কণ্ঠস্বর নূরীর।
বনহুর ওর চিবুক উঁচু করে ধরে ছিঃ, সামান্যতেই অমন রাগ করতে নেই। নূরী, ধরো আর যদি ফিরে না আসতুম?
নূরী বনহুরের মুখে হাতচাপা দেয়।
বনহুর কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় রহমান দরজার ওপাশে এসে দাঁড়ায়–সর্দার!
বনহুর গলা থেকে মালাটা খুলে পাশের টেবিলে রেখে বিছানায় সোজা হয়ে বসে বলে– এসো।
রহমান এসে দাঁড়াতেই নূরী হেসে বলে–রহমান নয়, জব্বার খাঁ।
সবাই হাসলো।
রহমান বলল–সর্দার, একটি কথা আছে।
বনহুর বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলল–চলো।
বাইরে আকাশের নিচে এসে দাঁড়ালো বনহুর আর রহমান। বনহুর জিজ্ঞাসা করলো–কি কথা রহমান?
সর্দার সেই মেয়েটি…থেমে যায় রহমান।
বনহুর ভ্রু কুচকে তাকায় রহমানের মুখের দিকে-কোন মেয়েটি? কি ব্যাপার?
সর্দার, সেই যে মনসাপুরের জমিদার-কন্যা সুভাষিণীর কথা বলছি।
কেন, হসপিটাল থেকে সে বাড়ি ফিরে যায় নি?
গিয়েছে–কিন্তু…
থামলে কেন, বল?
মেয়েটি নাকি পাগল হয়ে গেছে?
বল কি? মেয়েটি পাগল হয়ে গেছে? কিন্তু কেন?
রহমান একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলে–সুভাষিণী এমন একজনকে ভালবাসছে, যাকে–যাকে সে কোনদিন পাবে না।
সকলের অজ্ঞাতে নূরী একটি গাছের আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছিল। গোপনে সে রহমান আর বনহুরের কথাবার্তা সব শুনছিল। সুভাষিণীর নাম তার পরিচিত। গোপনে তার বিষয়ে আলোচনা শুনেই চমকে উঠছিল সে। এখন কিছুটা ঘেমে উঠে। না জানি কাকে ভালবেসেছে। আশঙ্কা জাগে মনে–তার হুরকে নয়তো। আরো ভালোভাবে কান পাতে নূরী।
বনহুরের কণ্ঠস্বর শোনা যায়–এটাই তোমার গোপন কথা?
