চৌধুরী সাহেব নামাযান্তে তসবী তেলাওয়াত করছিলেন, আশ্চর্য কণ্ঠে বলেন সেকি কথা?
হ্যাঁ, আমি বাড়ির সব জায়গা খুঁজে দেখলুম, কোথাও সে নেই।
বাইরে কোথাও যায়নি তো?
না, এতো ভোরে সে কোনদিন ঘুম থেকেই উঠে না, আর আজ সে কাউকে কিছু না বলে বাইরে যাবে। ওগো, একি কাণ্ড?
আচ্ছা দাঁড়াও ড্রাইভারকে ডাকি। দেখি বাইরে গেছে কিনা।
এমন সময় বয় ছুটে আসে হাউ মাউ করে কাঁদছে সে ভয়াতুর কণ্ঠে বলে–স্যার খুন খুন…
ব্যস্তকণ্ঠে বলে উঠেন চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগম–খুন কে খুন হয়েছে?
বয় কাঁপতে কাঁপতে বলে–দারওয়ান-দারওয়ান খুন হয়েছে!
চৌধুরী সাহেব বলে উঠে–কি বলছিস তুই?
হা স্যার, সব সত্যি বলছি। দেখবেন আসুন, দরজার পাশে দারওয়ান মৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
মিঃ চৌধুরী এবং মরিয়ম বেগম ছুটলেন সিঁড়ি বেয়ে নিচে।
সদর দরজার নিকটে পৌঁছে স্তম্ভিত হতবাক হলেন। বহু দিনের পুরানো দারওয়ান মংলু মিয়ার রক্তাক্ত দেহটা ভূতলে লুটিয়ে আছে। চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগমের দু’চোখ ছাপিয়ে পানি এলো; রুমালে চোখ মুছলেন চৌধুরী সাহেব।
অল্পক্ষণেই লোকজনে বাড়ি ভরে গেল।
মনিরার অন্তর্ধান ব্যাপারের সঙ্গে এ খুন রহস্য নিশ্চয়ই জড়িত আছে। চৌধুরী সাহেব পুলিশ অফিসে ফোন করলেন। তিনি অত্যন্ত চিন্তিত এবং ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মনিরার নিরুদ্দেশ তাঁকে ভাবিয়ে তুলল। কারণ, এটা চৌধুরী বাড়ির ইজ্জৎ নিয়ে ব্যাপার!
কিছুক্ষণের মধ্যেই মিঃ হারুন কয়েকজন পুলিশসহ চৌধুরী বাড়িতে হাজির হলেন। সমস্ত ঘটনা শুনে মিঃ হারুন মৃদু হাসলেন; ভাবলেন, এ দস্যু বনহুরের কাজ ছাড়া আর কারো নয়। তিনি প্রকাশ্যে বলেন–চৌধুরী সাহেব, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। কারণ, মনিরা এখন আপনার পুত্রের পাশেই রয়েছে।
মুহূর্তে চৌধুরী সাহেবের মুখমণ্ডল রাঙা হয়ে উঠে, তিনি ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে বলেন–আপনি কি বলতে চান মনির দারওয়ানকে খুন করে মনিরাকে নিয়ে পালিয়েছে?
হ্যাঁ মিঃ চৌধুরী, এ কথা নির্ঘাত সত্য। আপনার পুত্র ছাড়া এ কাজ কেউ করতে পারে না।
মিথ্যা সন্দেহ করছেন ইন্সপেক্টর সাহেব। আমার মনির কখনও নরহত্যা করতে পারে না। তাছাড়া মনিরাকে নিয়ে তার পালাবার কোন প্রয়োজনই নেই।
মিঃ হারুন বলেন–চৌধুরী সাহেব, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আপনার ভাগনী মনিরা আপনার পুত্রকে ভালবাসে।
সেই কারণেই দারওয়ানকে খুন করার কোন দরকার ছিল না তার।
মিঃ হারুন এবং চৌধুরী সাহেব কথাবার্তা বলছেন, এমন সময় ডিটেকটিভ মিঃ শঙ্কর রাও এসে হাজির হলেন। তিনি পুলিশ অফিসে এসে ঘটনাটা জানতে পেরে থাকতে পারেন নি, সোজা চলে এসেছেন চৌধুরী বাড়িতে।
তিনিও ঘটনাটা বিস্তারিত শুনলেন। মিঃ রাও বলেন–চলুন, মনিরার কক্ষটি একবার পরীক্ষা করে দেখব।
চৌধুরী সাহেব বলেন…কক্ষের একটি জিনিসপত্র এলোমেলো হয় নি বা কোন কিছুর চিহ্ন নেই,..
উঠে দাঁড়ান মিঃ রাও-চলুন, তবু একবার দেখা দরকার।
সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে চললেন মিঃ হারুন, মিঃ রাও এবং চৌধুরী সাহেব।
উঠতে উঠতে জিজ্ঞাসা করলেন মিঃ রাও উপরে উঠবার সিঁড়ি কি এই একটি?
জবাব দিলেন চৌধুরী সাহেব হাঁ, এই একটি সিঁড়িই রয়েছে।
তাহলে এই সিঁড়ি দিয়েই নেমে গেছে মনিরা এবং যে তাকে নিয়ে গেছে সে।
হ্যাঁ, তাই হবে। নীরস কণ্ঠস্বর চৌধুরী সাহেবের।
মিঃ রাও সকলের অলক্ষ্যে সিঁড়ির প্রত্যেকটা ধাপে লক্ষ্য রেখে এগুচ্ছিলেন। হঠাৎ তার নজরে পড়ে যায় সিঁড়ির এক পাশে একটি লেডিস স্যান্ডেল কাৎ হয়ে পড়ে আছে। মিঃ রাও স্যান্ডেলখানা হাতে উঠিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন–এটা কার?
চৌধুরী সাহেব জুতোখানা লক্ষ্য করে বলেন–মনিরার। কিন্তু একখানা জুতো এখানে এল কি করে?
তাইতো?
কথার ফাঁকে তারা উপরে এসে পৌঁছে গেছেন। তখনও মনিরার স্যান্ডেলখানা মিঃ রাও-এর হাতে ধরা রয়েছে।
মিঃ রাও স্যান্ডেলখানা বারান্দার একপাশে রেখে বলেন–মনিরা স্বইচ্ছায় কারো সঙ্গে যায় নি। তাকে কেউ বা কারা জোরপূর্বক ধরে নিয়ে গেছে।
মিঃ হারুন বলে উঠেন–দস্যু বনহুর ছাড়া তাহলে এ কাজ কে করতে পারে?
গোটা কক্ষটা তারা সুন্দরভাবে পরীক্ষা করে দেখলেন। কক্ষের একটি জিনিসও স্থানচ্যুত হয়। নি। দরজা মনিরা যে স্বহস্তে খুলেছে তার প্রমাণ রয়েছে। কারণ, দরজার খিল ভাঙ্গেনি বা কোনরকম আগলা হয় নি।
ক্রমেই ব্যাপারটা ঘোরালো হয়ে উঠছে।
দস্যু বনহুরকে মনিরা ভালবাসে–এ কথা সবাই জানে।
মনিরাকে চুরি করে নিয়ে যাবার তার কোন প্রয়োজন হবে না, মনিরা ইচ্ছা করেই যেতে পারতো। দারওয়ানকে খুন করবার কোন দরকারই নেই তাদের। তাছাড়া সিঁড়ির ধাপে মনিরার একটি স্যান্ডেলই বা পড়ে থাকবে কেন?
আরও একটি প্রমাণ তারা পেলেন। বারান্দার মেঝেতে লক্ষ্য করে দেখল, কয়েকটি পায়ের ছাপ বেশ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। আরও দেখলেন তারা, পায়ের ছাপগুলো খালি পা এবং থেবড়ো থেবড়ো পাগুলো।
মিঃ হারুন পায়ের ছাপগুলো বিশেষভাবে লক্ষ্য করে বললেন–দস্যু বনহুর যেখানেই হানা দিয়েছে, আমরা লক্ষ্য করেছি, কখনও তার খালি পা ছিল না।
মিঃ রাও বলেন–এ নিশ্চয়ই অন্য কোন শয়তানের কাজ। দস্যু বনহুর মনিরাকে নিয়ে যায় নি-এ সত্য।
চৌধুরী সাহেব মাথায় হাত দিয়ে একটি সোফায় বসে পড়লেন-তাহলে উপায়?
