বনহুর মনিরার আবেগভরা কণ্ঠে মুগ্ধ হয়। মাথার পাগড়ীটা খুলে পাশের টেবিলে রাখে।
মনিরা বনহুরের জামার বোতাম খুলে দেয়।
বনহুর মনিরার শয্যায় শুয়ে পড়ে।
মনিরা বনহুরের পা থেকে জুতো জোড়া খুলে রাখে।
বনহুর এবার মনিরাকে টেনে নেয় কাছে–এসো।
মনিরা স্বামীর বুকে মাথা রাখে।
ভোরের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। পাখির কলরবে মুখর হয়ে উঠেছে ধরণী। অজানা ফুলের সুরভি মুক্ত জানালাপথে সাদর সম্ভাষণ জানায় মনিরা ও বনহুরকে।
কুয়াশার ফাঁকে পাইনগাছগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। মৃদুমন্দ বাতাস শিহরণ জাগায় তার পাতায় পাতায়। হিমশীতল রাতের শিশির বিন্দুগুলো দুর্বাশিরে মুক্তার মত চিকমিক করে ওঠে।
দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসে মোয়াজ্জেমের কণ্ঠের ধ্বনি। অতি সুন্দর মোলায়েম সে সুর। চৌধুরীবাড়ির কন্দরে কন্দরে সেই সুরের আবেশ এক মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি করে। আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনি জাগে…. আল্লাহু আকবার।
মনিরা আবেগ মধুর কণ্ঠে বলে–ভোর হয়ে গেছে!
বনহুর শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ায়, পাগড়ীটা মাথায় দিয়ে বলে তাজ আমার জন্য প্রতীক্ষা করছে।
মনিরা বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে–আবার কবে দেখা পাব তোমার?
যখন তুমি আমাকে স্মরণ করবে তখনই।
সত্যি?
হ্যাঁ মনিরা।
যাও।
বনহুর মনিরার চিবুক উঁচু করে ধরে বলে– খোদা হাফেজ।
মনিরা অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করে– খোদা হাফেজ।
বেরিয়ে যায় দস্যু বনহুর।
মনিরা ছুটে গিয়ে মুক্ত জানালায় ঝুঁকে পড়ে দেখে।
বনহুর তখন তাজের পিঠে চেপে বসেছে।
মনিরা অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকে।
বনহুর তাজের পিঠে বসে ফিরে তাকায় মনিরার কক্ষের মুক্ত জানালার দিকে।
মনিরা হাত নাড়ে।
বনহুরের অশ্ব সামনের দু’পা উঁচু করে আনন্দসূচক শব্দ করে ওঠে, তারপর ছুটতে শুরু করে।
মনিরা ফিরে আসে শয্যার পাশে। অভূতপূর্ব একটা আনন্দ তার সমস্ত মনকে আচ্ছন্ন করে। ফেলেছে। আজ সে নিজকে ধন্য মনে করে। দুনিয়ার কেউ না জানুক, সে জানে দস্যু বনহুর তার স্বামী!
মনিরা বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে! বনহুরের কথাগুলো তার কানের কাছে ভেসে উঠে। একটু পূর্বে বনহুরের বলিষ্ঠ হাতের ছোঁয়া এখনও যেন তার দেহে লেগে রয়েছে। দোলা জাগায় তার মনে। ভাবে সে, তার মত ভাগ্যবতী নারী আর কে আছে!
.
দস্যু বনহুর দক্ষিণ হাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে তার নিজস্ব পাতালপুরীর আস্তানার একটি কক্ষে প্রবেশ করল। উজ্জ্বল দীপ্ত তার মুখমণ্ডল। শরীরে জমকালো ড্রেস, মাথায় কালো পাগড়ি।
যে কক্ষে দস্যু বনহুর এই মুহূর্তে প্রবেশ করলো, সেটা তাঁর পাতালপুরীর গোপন কক্ষ। এ কক্ষে বনহুর তার বন্দীদের আটক করে রাখে। দস্যু বনহুর এবং তার বিশ্বস্ত দু’একজন অনুচর। ছাড়া আর কেউ এ কক্ষে প্রবেশ করতে পারে না।
বনহুর জ্বলন্ত মশাল হাতে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। ওদিকে একটা চোরা-কুঠরী রয়েছে। বনহুর মশাল নিয়ে সেই চোরা-কুঠরীর সামনে এসে দাঁড়ায়। দেয়ালের একটা জায়গায় চাপ দিতেই চোরা-কুঠরীর দরজা খুলে যায়। একটা নীলাভ আলো ছিটকে পড়ে দরজার বাইরে। বনহুর প্রবেশ করে এবার সেই কুঠরীতে।
সুন্দরভাবে সজ্জিত সেই চোরা-কুঠরীর একপাশে একটি খাট পাতা রয়েছে। দুগ্ধফেননিভ বিছানায় শায়িত এক ভদ্রলোক।
দস্যু বনহুর সেই খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো, গম্ভীর শান্ত গলায় ডাকলো– মিঃ আলম, এবার আপনার ছুটি।
বিছানায় উঠে বসলেন মিঃ আলম, তাকালেন দস্যু বনহুরের দিকে। গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলেন, একে যেন কোথাও দেখেছেন ইতোপূর্বে। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল সেই প্রথম দিনের কথা, যেদিন তিনি এ শহরে প্রথম এসে পৌঁছেছিলেন, আশ্চর্য হয়েছিলেন এরোড্রামে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে কেউ আসেনি। এমনকি বন্ধু মিঃ শঙ্কর রাও পর্যন্ত আসেন নি। ব্যাপারটা তাঁর অত্যন্ত বিস্ময়কর লেগেছিল। তিনি আসার পূর্বে টেলিগ্রাফ করে জানিয়ে দিয়েছিলেন, অথচ এরোড্রামে তাঁকে সম্ভাষণ জানাতে একজন পুলিশ অফিসারও আসেন নি। ব্যাপার কি মিঃ আলম। যখন এরোড্রামে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাচ্ছেন, এমন সময় এক যুবক এগিয়ে এসে হাস্যোজ্জ্বল। মুখে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিজের পরিচয় দিয়েছিল–আমি কিঙ্কর রাও, আপনার বন্ধু শঙ্কর রাওয়ের ছোট ভাই। মিঃ আলম তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলেছিলেন– আপনি কিঙ্কর রাও? আপনার বড় ভাই এলেন না কেন? জবাব দিয়েছিল এই যুবক–দাদার অসুখ, তাই আমাকে পাঠিয়েছেন। আসুন–আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি।
মিঃ আলম বিনা দ্বিধায় যুবকের গাড়িতে উঠে বসেছিলেন সেদিন। অনেক দিন পর বন্ধু শঙ্কর রাওয়ের সঙ্গে মিলিত হবার আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন মিঃ আলম। তিনি গাড়িতে বসে নতুন শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে চলেছিলেন। কখন যে গাড়ি শহরের পথ ছেড়ে নির্জন পথে চলতে শুরু করেছিল খেয়াল ছিল না তার। হঠাৎ বলে উঠেছিলেন মিঃ আলম– শঙ্কর বুঝি শহরের বাইরে থাকে? ড্রাইভ আসন থেকে জবাব দিয়েছিল এই যুবক–হ্যাঁ দাদা অসুস্থ হওয়ায় তাকে শহরের বাইরে থাকতে হয়।
তারপর বেশ মনে আছে মিঃ আলমের, একটি সুমিষ্ট গন্ধ তাঁর নাকে প্রবেশ করায় কেমন যেন ঝিম ঝিম করেছিল মাথাটা, ধীরে ধীরে চোখ দুটো মুদে এসেছিল তার। তারপর আর কিছু মনে ছিল না, জ্ঞান হবার পর দেখেছিলেন সুন্দর নরম একটি বিছানায় তিনি শুয়ে আছেন, কতক্ষণ শুয়ে শুয়ে ভেবেছিলেন তিনি-এ কোথায় শুয়ে আছেন, কিছুই বুঝতে পারছেন না। প্রায় গোটা দিনটাই তার মনে পড়েনি কিছু। পরদিন ঘুম থেকে জেগে উঠে বসতেই সব কথা স্মরণ হয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলেন, এখন তিনি বন্দী। কিন্তু কেন তাকে এভাবে আটক করা হয়েছে? যে তাকে। এরোড্রাম থেকে শঙ্কর রাওয়ের ভাইয়ের পরিচয় দিয়ে নিজে ড্রাইভ করে নিয়ে এসেছে, সে–ই যে তাকে এভাবে আটক করেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কে সেই যুবক, কি তার উদ্দেশ্য, কেন তাকে এভাবে আটকে রেখেছে, ভেবে পাননি মিঃ আলম। যুবক যেই হউক, সে যে উদ্দেশ্যেই তাঁকে বন্দী করে রাখুক, তার ওপর কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি। যে কক্ষে তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে সে কক্ষটি অতি সুন্দর। মূল্যবান আসবাবপত্রে সজ্জিত। কক্ষটা খুব বড় নয়। কক্ষের দেয়াল ফিকে সবুজ। কোন জানালা না থাকলেও কক্ষে আলো বা বাতাসের কোন অভাব নেই। যদিও প্রাকৃতিক আলো বা বাতাসের প্রবেশ সেখানে অসাধ্য তবুও বৈজ্ঞানিক উপায়ে সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে এসবের। একপাশে বইয়ের সেলফ, তাতে নানা ভাষায় লিখিত নানা ধরনের মূল্যবান বই। টেবিলে নানারকম ফলমূল সাজানো। এমন কি গরম দুধও ছিল সেখানে, কিন্তু এই একটি বছরের মধ্যে তিনি মানুষের মুখ দেখতে পান নি। ঠিক সময়মতো টেবিলে খাবার, ফলমূল এবং দুধ যে কোথা থেকে আসত তিনি বুঝতে পারতেন না। ভেবে ভেবে অবাক হতেন। আজ এই যুবককে দেখে যেমন বিস্ময়, তেমনি হতবাক হন মিঃ আলম।
