মিঃ হারুন বিস্ময়ে অস্ফুট শব্দ করে ওঠেন– কি বললেন মুরাদকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
হ্যাঁ মিঃ হারুন আপনি স্বয়ং তাকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তার মানে।
মানে ভগবৎসিংবেশি নাথুরামের বাড়িতে তার আত্মীয়ের বেশে জয়সিংকে গ্রেফতারের কথা আপনার স্মরণ আছে ইন্সপেক্টার?
হ্যাঁ, জয়সিং নামে এক ব্যক্তিকে আমরা সেদিন গ্রেফতার করেছিলাম। এখনও সে জেলে আটক রয়েছে।
সেই জয়সিং খান বাহাদুর সাহেবের একমাত্র সন্তান মুরাদ।
মিঃ জাফরী বলে ওঠেন–মুরাদ তাহলে বন্দী হয়েছে, যাক তাহলে একটা দিক নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। কিন্তু আপনি রাতদুপুরে চৌধুরী সাহেবের কবরে ধারালো অস্ত্র নিয়ে কেন মাটি সরাচ্ছিলেন জানতে পারি কি?
আমি চৌধুরী সাহেবের কবর থেকে তাঁর একখানা হাড় সংগ্রহের চেষ্টা করছিলাম–কারণ আমি পরীক্ষা করে জানতে চাই তাকে কি ধরনের বিষ খাওয়ানো হয়েছিল। হাড় সংগ্রহ করতে। আমাকে কবরস্থানে গোপনে যেতে হয়েছিল।
এতক্ষণে কক্ষস্থ সকলের মুখমণ্ডল প্রসন্ন হলো।
হঠাৎ জাফরী এবার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করে বসলেন– মিঃ আলম, এবার বলুন ডক্টর জয়ন্ত সেন আর নাথুরামের হত্যাকারী কে?
হঠাৎ মিঃ আলম হো! হো! করে হেসে উঠলেন, তার সুন্দর মুখমণ্ডল দীপ্ত হলো, পরমুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে পড়লেন তিনি। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললেন– পিতার হত্যাকারীকে পুত্র হত্যা করেছে। ডক্টর জয়ন্ত সেন ও শয়তান নাথুরামকে হত্যা করেছে দস্যু বনহুর।
সকলেই একসঙ্গে অস্কুট ধ্বনি করে ওঠেন– দস্যু বনহুর!
হ্যাঁ আসল হত্যাকারী দস্যু বনহুর।
মিঃ জাফরী মিঃ আলমের সাথে হ্যাঁণ্ডশেক করলেন, বললেন–সত্যি, আপনার সূতীক্ষ্ণ বুদ্ধি প্রশংসা না করে পারছি না। মিঃ আলম, আপনি যে এত সুন্দরভাবে এই হত্যারহস্য উদঘাটন করেছেন তার জন্য আপনাকে আমরা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
কক্ষস্থ অন্যান্য অফিসার মিঃ আলমের সাথে হ্যাঁণ্ডশেক করলেন।
মিঃ আলম কিন্তু তার ছায়ামূর্তির ড্রেস পূর্বেই খুলে ফেলেছিলেন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবার আমি বিদায় গ্রহণ করছি। গুড নাইট।
কেউ কোনো কথা উচ্চারণ করার পূর্বেই মিঃ আলম কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মিঃ হারুনের দৃষ্টি মিঃ আলমের পরিত্যক্ত ছায়ামূর্তির আলখেল্লাটার উপরে গিয়ে পড়ল। তিনি হেসে বললেন– মিঃ আলমের ওটার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তাই ফেলে গেলেন।
মিঃ শঙ্কর রাও উঠে গিয়ে আলখেল্লাটা হাতে উঠিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন।
সবাই অবাক হয়ে দেখছেন, হঠাৎ মিঃ জাফরী বলে ওঠেন– ওটা কি? একখণ্ড কাগজ যেন পিন দিয়ে আটকানো রয়েছে আলখেল্লার গায়ে।
তাইতো! মিঃ শঙ্কর রাও কাগজের টুকরাখানা আলখেল্লা থেকে খুলে নিলেনই সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারার ভাব বদলে গেল, বিস্মিতকণ্ঠে বললেন একি! দস্যু বনহুরই মিঃ আলম ও ছায়ামূর্তি।
কি বলছেন! মিঃ জাফরী তাড়াতাড়ি শঙ্কর রাওয়ের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে পড়ে দেখলেন, তাতে লেখা রয়েছে—‘দস্যু বনহুর’।
মিঃ জাফরী ‘থ’ মেরে গেলেন। তাঁর মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে উঠেছে।
আর সবাই নির্বাক, নিশ্চুপ, হতভম্ব। সহসা মিঃ হারুন চিৎকার করে বললেন– পাকড়াও করো, মিঃ আলমকে পাকড়াও করো– গ্রেফতার করো ………..
সমস্ত পুলিশ উদ্যত রাইফেল হাতে ছুটল।
কিন্তু মিঃ আলমবেশি দস্যু বনহুর তখন কোথায় অদৃশ্য হয়েছে কে জানে।
১.০৭ মনিরা ও দস্যু বনহুর
দস্যু বনহুর মনিরার ঘোমটায় ঢাকা মুখখানা তুলে ধরে। বড় চাচার বাড়ির শাড়ি-অলঙ্কার এখনও তার দেহে শোভা পাচ্ছে। নববধুর বেশে মনিরাকে অপূর্ব দেখাচ্ছে।
দস্যু বনহুরের শরীরে জমকালো দস্যু-ড্রেস? নির্বাক নয়নে তাকিয়ে আছে বনহুর মনিরার চন্দন-আঁকা মুখখানার দিকে।
মনিরা লজ্জাবনত দৃষ্টি তুলে তাকায় বনহুরের মুখে। চার চক্ষুর মিলন হয়। মনিরা দৃষ্টি নত করে নেয়। আজ তার আনন্দের সীমা নেই! যাকে এতদিন কাছে পাবার জন্য সদা-সর্বদা উন্মুখ হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষা করে এসেছে, যাকে সে শয়নে-স্বপনে কামনা করে এসেছে, তাকে আজ অতি কাছে অতি আপনজন হিসেবে পেয়েছে। মনিরার কাছে সব যেন স্বপ্ন বলে মনে হয়।
বনহুর মনিরাকে বাহুবন্ধনে আবব্ধ করে বলে–কি ভাবছো মনিরা?
মনিরা বনহুরের বুকে মাথা রেখে বলে ভাবছি, আমি স্বপ্ন দেখছি না তো।
উঁহু স্বপ্ন নয়– সত্য।
এত সুখ আমার সইবে তো!
মনিরা!
মনির, জানো না, তুমি আমার কত সাধনার, কত কামনার। ভয় হয় আবার যদি তোমাকেই হারাই।
হাঃ হাঃ করে হেসে ওঠে বনহুর– অদ্ভুত সে হাসি!
মনিরা বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে তন্ময় হয়ে, যত দেখে ততই যেন ওকে দেখার সাধ হয়, এত সুন্দর বুঝি মানুষ হয় না।
বনহুর হাসি থামিয়ে বলে–কি দেখছ?
আমার জীবনের আরাধ্য দেবতাকে।
মনিরা—
বল?
এ তুমি কি করলে মনিরা! নিজের জীবনটা কেন তুমি নষ্ট করলে?
নষ্ট! কি বলছ তুমি?
দস্যু বলে সবাই যাকে ঘৃণা করে, পুলিশমহল যাকে গ্রেফতার করার জন্য অহরহ ঘুরে বেড়াচ্ছে, দেশবাসী যার নামে আতঙ্কগ্রস্ত তাকে তুমি স্বামী বলে গ্রহণ করলে!
এ আমার পরম ভাগ্য। দস্যু বনহুরকে সবাই যেমন ঘৃণা করে তেমনি করে শ্রদ্ধা। পুলিশমহল অহরহ খুঁজে ফিরলেও জানে তারা দস্যু বনহুরকে গ্রেফতার করা কত কঠিন। দেশবাসী দস্যু বনহুরের নামে আতঙ্কগ্রস্ত, হলেও তাকে দেখার একটু খানি লোভ সকলের মনে ফুলের সুবাসের মতই জেগে রয়েছে। তুমি যে সবার কত কামনার সে তুমি বুঝবে না।
