মরিয়ম বেগম নিজের কক্ষে প্রবেশ করে, ডাকেন– আসুন সরকার সাহেব।
বনহুরের চোখে-মুখে বিস্ময়, মা তার কি করতে কি করে বসলেন। সরকার সাহেবকে আবার কেন ডাকলেন ভেবে পায় না সে।
ততক্ষণে সরকার সাহেব কক্ষে প্রবেশ করে বনহুরকে দেখতে পেয়ে চমকে ওঠেন। এ কে? বনহুরের শরীরে কালো ড্রেস, মাথায় পাগড়ী, কোমরের বেল্টে রিভলভার সরকার সাহেব ঘাবড়ে গেলেন। তিনি তো কোনদিন বনহুরকে দেখেন নি তাই ঘাবড়ানোটা স্বাভাবিক। তারপর মনিরাকে দেখতে পেয়ে যেমন বিস্মিত তেমনি আনন্দিত হলেন। কিছু বুঝতে না পেরে তাকালেন মরিয়ম বেগমের মুখের দিকে।
মরিয়ম বেগম হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন– সরকার সাহেব, একে চিনতে পারেন নি? পারবেনই বা কি করে! ভাল করে একবার ওর দিকে চেয়ে দেখুন তো চিনতে পারেন কিনা।
সরকার সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগলেন। তারপর বললেন– কই না, ওকে তো আমি কোনদিন দেখিনি।
এবার মরিয়ম বেগম বললেন আমার মনিরকে আপনার মনে আছে সরকার সাহেব?
তা থাকবে না? মনির– সে যে আমাদের সকলের নয়নের মনি ছিল বেগম সাহেবা।
সেই নয়নের মনি, আমার প্রাণের প্রাণ মনির আপনার সম্মুখে দাঁড়িয়ে।
অস্ফুট ধ্বনি করে ওঠেন সরকার সাহেব– মনির!
হ্যাঁ, আমার মনির।
বৃদ্ধ সরকার সাহেবের চোখেমুখে আনন্দের দ্যুতি খেলে যায়। দু’হাত বাড়িয়ে বনহুরকে বুকে, টেনে নেন। বনহুর নীরবে সরকার সাহেবের কাঁধে মাথা রাখে।
সরকার সাহেবের সেকি আনন্দ! উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন– কোথায় ছিলে বাবা তুমি এতদিন? তা ছাড়া মা মনিরাই বা–
মরিয়ম বেগম বললেন– সব পরে বলবো আপনাকে সরকার সাহেব। আজ খুব তাড়াতাড়ি একটা কাজ করতে হবে।
বলুন বেগম সাহেবা?
মনিরাকে ওর বড় চাচা তার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছিলেন মনির সেই বিয়ের মঞ্চ থেকে মাকে আমার নিয়ে এসেছে। আমি চাই মনিরের সঙ্গে এক্ষুণি মনিরার বিয়েটা শেষ করতে।
এক্ষুণি!
হ্যাঁ আর এক মুহূর্তও বিলম্ব নয় সরকার সাহেব। রাত ভোর হবার আর দেরী নেই, তার পূর্বেই আমি ওদের বিয়ে দিতে চাই। আমি জানি আপনি আরও অনেক জায়গায় বিয়ে পড়িয়েছেন, নিশ্চয়ই আপনার ভুল হবে না।
তা হবে না কিন্তু এত তাড়াহুড়া করে–
আর কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না সরকার সাহেব। দেখছেন না মনিরার শরীরে বিয়ের পোশাক–
সরকার সাহেব ওজু বানিয়ে কেতাব নিয়ে আসলেন। মনিরা আর দস্যু বনহুরকে পাশাপাশি বসিয়ে বিয়ের কলেমা পাঠ করলেন।
মরিয়ম বেগম নীরবে আশীর্বাদ করে চললেন।
ওদিকে ভোরের আজানধ্বনি ভেসে এলো–আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর।
দস্যু বনহুরের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল মনিরার।
পাখিরা তখন নীড় ছেড়ে মুক্ত আকাশে ডানা মেলেছে।
বনহুর মনিরার হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে বলল– মনিরা এ তুমি কি করলে?
সবচেয়ে যা আমার মঙ্গলময় তাই করলাম।
সুখী হবে কি?
মনিরা স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে বলল–আমার মত সুখী কে!
বনহুর আর মনিরাকে একা রেখে, বেরিয়ে গিয়েছিলেন মরিয়ম বেগম আর সরকার সাহেব। বিয়ের পর ওদের দুজনের কাছে দু’জনের যা বলবার থাকে বলে নিক ওরা।
এবার বনহুর বিদায় চাইল মনিরার কাছে–আসি তবে?
এসো। ছোট্ট একটা শব্দ বেরিয়ে এলো মনিরার মুখ থেকে।
স্বামীর বাহুবন্ধন থেকে সরে দাঁড়াল মনিরা।
বনহুর একবার মনিরার মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
.
মরিয়ম বেগম সরকার সাহেবকে গোপনে সব খুলে বললেন বারবার অনুরোধ করলেন– দেখুন সরকার সাহেব, এ কথা যেন কোনদিন কাউকে বলবেন না। শুধু সাক্ষী রইল আল্লাহ আর আপনি ও আমি। ।
সরকার সাহেব বললেন– আমি কোনদিন কারও কাছে এ কথা প্রকাশ করব না।
এখানে যখন মরিয়ম বেগম আর সরকার সাহেব কথাবার্তা বলছিলেন, তখন আসগর আলী সাহেবের বাড়িতে ভীষণ কাণ্ড-পাত্রী উধাও হয়েছে।
গোটা পাড়া তন্নতন্ন করে খোঁজা হল–কিন্তু কোথাও মনিরাকে পাওয়া গেল না।
আসগর আলী সাহেব তো রাগে ফেটে পড়তে লাগলেন। তার এতবড় আয়োজন সব পণ্ড হয়ে গেল। তাছাড়া মনিরা গেল কোথায়–এই চিন্তাই তাঁকে অস্থির করে তুলল। বাড়ির সকলকে ধমকানো শুরু করলেন কেন তাকে একা রেখে যাওয়া হয়েছিল।
কিন্তু যে চলে গেছে তাকে কি আর এত সহজে পাওয়া যায়! আসগর আলী সাহেব মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। আসগর আলী সাহেবের স্ত্রী মনিরার বড় চাচীর অবস্থাও তাই। অনেক আশা করেই তিনি আজ মনিরার সঙ্গে পুত্রের বিয়ে দিতে চলেছিলেন।
আসগর আলী সাহেব আর তাঁর স্ত্রীর যত রাগ গিয়ে পড়ল মনিরার মামীমা মরিয়ম বেগমের ওপর। নিশ্চয়ই তারই কোন চক্রান্তে মনিরা পালিয়েছে। কিন্তু মনিরা যেখানেই থাক তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। তার বিয়েও হবে শহীদের সঙ্গে। মনিরা তাদেরই মেয়ে, কোনো অধিকার নেই তার ওপর চৌধুরীবাড়ির কারও।
শহীদ তো হাউমাউ করে কাঁদা শুরু করে দিয়েছে। মাঝে মাঝে বিলাপের মত বলছে– আমার বৌ কোথায় পালিয়েছে? আমার বৌ কে নিয়ে গেছে? আমি তার মাথা আস্ত রাখব না। এমনি নানারকম আবোল তাবোল বলতে শুরু করেছে শহীদ।
আসগর আলী সাহেবের স্ত্রী পুত্রকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন– কাঁদিস না বাপু, মনিরা তোরই বৌ, কে তাকে নিতে পারে। কালই আমি তোর আব্বাকে চৌধুরীবাড়ি পাঠাব, কাঁদিস না বাপ।
আসগর আলী সাহেব তখনই লোক পাঠালেন চৌধুরীবাড়িতে–যা দেখে আয় মনিরা সেখানে গেছে কিনা।
