বনহুর অদূরে একটা ঘন ঝোঁপের আড়ালে তাজকে রেখে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে এই কক্ষে প্রবেশ করেছে। এই পথটুকু যে কেমন করে সে এসেছে সেই জানে।
প্রায় আধঘন্টা বনহুর সুযোগের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। যেমনি মেয়েরা ওদিকে বিয়ে পড়ানো দেখতে গেছে, অমনি সে আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়েছে।
আর বিলম্ব না করে বনহুর মনিরাকে নিয়ে পেছন জানালার শিক বাঁকিয়ে সেই পথে বেরিয়ে পড়ল।
এবার আর তাদের কে পায়!
বনহুর মনিরাকে নিয়ে তাজের পাশে এসে দাঁড়াল।
আসগর আলী সাহেবের বাড়িতে তখন করুণ সুরে সানাই বেজে চলেছে।
বনহুর নববধূর সাজে সজ্জিত মনিরাকে তুলে নিল অশ্বপৃষ্ঠে। বাঁ হাতে মনিরাকে চেপে ধরে দক্ষিণ হাতে তাজের লাগাম টেনে ধরল।
বন-প্রান্তর পেরিয়ে উল্কাবেগে ছুটতে শুরু করলো তাজ।
মনিরার মনে অফুরন্ত আনন্দ। দক্ষিণ হাতে বনহুরের কন্ঠ বেষ্টন করে বলল– চিরদিন এমনি করে যদি তোমার বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারতাম!
বনহুর আবেগভরা কণ্ঠে বলে–তাই রয়েছ তুমি! মনিরা, কখনো তুমি আমার বুকের মধ্য থেকে দূরে সরে যাবে না।
এই তো আর একটু হলেই কোথায় থাকত তোমার মনিরা?
হয়ত তোমার চাচার ছেলের বৌ হতে, এই তো।
না। তার পূর্বে আমি এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেবার আয়োজন করে নিয়েছিলাম…
মনিরা! বনহুর অশ্বপৃষ্ঠে বসেই মনিরাকে আরও নিবিড়ভাবে বুকে জড়িয়ে ধরল।
মনিরা বুঝল, এখন তার কিছু বলা উচিত হবে না। হঠাৎ কোন বিপদ ঘটে যেতে পারে। তাই নিশ্চুপ রইল।
মনিরাকে নিয়ে বনহুর যখন চৌধুরীবাড়ি পৌঁছল তখন রাত প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। যদিও পাখিরা এখনও বাসা ছেড়ে বেরিয়ে যায়নি, তবু কলরব শুরু করেছে। নতুন দিনের মধুর পরশে মন তাদের খুশিতে ভরে উঠেছে। সুমিষ্ট স্বরে গান গাইছে ওরা।
বনহুর মনিরাকে সঙ্গে করে মায়ের সম্মুখে হাজির হল– মা, এই নাও তোমার মনিরাকে।
নিদ্রাহীন কোটরাগত চোখ দুটি তুলে তাকালেন মরিয়ম বেগম। মনিরাকে দেখে উচ্ছ্বসিত আনন্দে বলে উঠলেন– এনেছিস বাবা, আমার হারানো রত্ন তুই ফিরিয়ে এনেছিস? কিন্তু আমার মায়ের এ বেশ কেন?
ভয় নেই মা, তুমি যা ভাবছ তা হয় নি। আর একটু বিলম্ব হলে হয়ত–
হায় হায়, একি সর্বনাশটাই না হত। মনি যে একটা মতলব এটে তবেই মনিরাকে নিয়ে গেছেন আসগর আলী সাহেব তা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। বাবা মনির, শোন, একটা কথা শোন্, সরে আয় আমার পাশে।
বনহুর মায়ের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়– বল মা?
ওরে, তোকে আর আমি ছেড়ে দেব না। আজ মনিরার এই বিয়ের সাজ আমি বৃথা নষ্ট হতে দেব না।
মা!
হ্যাঁ, মনিরাকে তোর বিয়ে করতে হবে।
হ্যা!
মনির, আজ তোর কোনো আপত্তিই আমি শুনব না। মনিরাকে তোর বিয়ে করতেই হবে, নইলে আমি আজই আত্মহত্যা করব।
এ তুমি কি বলছো মা? বনহুর একবার মায়ের মুখে আর একবার মনিরার মুখের দিকে তাকায়।
মনিরার দু’চোখে অশ্রু ছলছল করছে। নিষ্পলক নয়নে এতক্ষণ বনহুরের দিকে তাকিয়ে ছিলো মনিরা, বনহুরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই দৃষ্টি নত করে নেয় সে।
বনহুর মায়ের দিকে তাকাল–তারপর স্তকণ্ঠে বলল– মনিরার সুন্দর জীবনটা তুমি নষ্ট কর না মা।
আমি জানি মনি তোকে ভালোবাসে, তোর সঙ্গে বিয়ে হলে সে অসুখী হবে না।
আমি যে মানুষ নামের কলঙ্ক। লোকসমাজে আমার যে কোন স্থান নেই। ভুল কর না মা, তুমি ভুল করো না–বনহুর মায়ের বিছানায় বসে পড়ে দু’হাতে নিজের মাথার চুল টানতে লাগল। অধর দংশন করতে লাগল সে।
মনিরা পাথরের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটা কথাও তার মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না।
মরিয়ম বেগম পুত্রের পার্শ্বে গিয়ে দাঁড়ান, পিঠে হাত রেখে বলেন– যত কথাই বলিস না কেন মনির আমার কথা তোকে রাখতেই হবে। বিয়ে তোকে করতেই হবে– করতেই হবে। নইলে আমি মাথা ঠুকে মরব– মরিয়ম বেগম ছুটে গিয়ে দেয়ালে মাথা ঠুকতে শুরু করলেন।
বনহুর আর স্থির থাকতে পারল না, দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মাকে ধরে ফেলল চমকে উঠলো বনহুর, মায়ের ললাট কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল সে একি করলে মা!
না না, ছেড়ে দে আমায়; আমি আর বাঁচতে চাই না। মনিরাকে যদি অন্যের হাতে তুলে দিতে হয় তবে আমার মৃত্যুই ভাল…
মা!
মনির, ওকে তুই বিয়ে কর।
বনহুর মাকে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে তাকাল মনিরার দিকে। মনিরার গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা। নীরব ভাষায় যেন বলছে–ওগো, তুমি সদয় হও। ওগো, তুমি সদয় হও! একটিবার ফিরে তাকাও দুনিয়ার দিকে…
বনহুর মনিরার দিকে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে বলে ওঠে–তোমার কথাই সত্য হউক মা, মনিরাকে আমি বিয়ে করব।
এতক্ষণে মরিয়ম বেগমের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। তিনি আঁচলে ললাটের রক্ত মুছে ফেলে বললেন– আমাকে বাঁচালি বাবা। দাঁড়া, তুই যেন আবার পালিয়ে যাসনে–মরিয়ম বেগম বেরিয়ে যান।
সরকার সাহেব তাঁর নিজের কামরায় ঘুমিয়েছিলেন। মরিয়ম বেগম কক্ষে প্রবেশ করে ডাকেন সরকার সাহেব, উঠুন তো?
ধড়মড় করে উঠে বসেন সরকার সাহেব, চোখ মেলে তাকিয়ে অবাক হন। হঠাৎ রাতের বেলায় বেগম সাহেবা, কারণ কি? ঢোক গিলে বললেন– আপনি!
মরিয়ম বেগম বললেন আমার সঙ্গে আসুন দেখি।
কি হয়েছে বেগম সাহেবা?
আসুন, পরে বলছি।
মরিয়ম বেগম এগিয়ে চলেন, তাঁকে অনুসরণ করেন বৃদ্ধ সরকার সাহেব।
