শয়তান! তবে কার ভয়ে লুকিয়েছিলে। তখন এখানে প্রবেশ করতে পারলে না? দস্যু বনহুর তোমায় উচিত সাজা দিয়ে তবেই ছাড়ত! এসেছ একটা নারীর কাছে বাহুবল দেখাতে? নূরী দ্রুত পদক্ষেপে দরজার সম্মুখে গিয়ে হাতের ছোরাখানা বাড়িয়ে ধরে-খবরদার, এক-পা এগুলে আমি তোমাকে হত্যা করব।
ছায়ামূর্তি চাপাস্বরে হেসে ওঠে– হাঃ হাঃ হাঃ ছায়ামূর্তিকে তুমি হত্যা করবে? এসো তবে-ছায়ামূর্তি এগুতে থাকে নূরীর দিকে।
ক্রুদ্ধ নাগিনীর ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছিল নূরী। রুখে দাঁড়ায়-শয়তান! সঙ্গে সঙ্গে ছোরাখানা বসিয়ে দিতে যায় সে ছায়ামূর্তির বুকে।
মুহূর্তে ছায়ামূর্তি নূরীর হাতখানা বলিষ্ঠ হাতের মুঠায় চেপে ধরে। অতি সহজেই নূরীর হাত থেকে ছোরাখানা খসে পড়ে মেঝেতে।
এবার হাত ছেড়ে দেয় ছায়ামূর্তি, তারপর আবার সে হেসে ওঠে অট্টহাসি।
নূরী ‘থ’ মেরে দাঁড়িয়ে থাকে।
ছায়ামূর্তি হাসি থামিয়ে বলে–বনহুরের জীবন যদি বাঁচাতে চাও, তবে তাকে আমার অন্বেষণ থেকে ক্ষান্ত কর। নচেৎ আবার আসব …..কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ছায়ামূর্তি অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায়।
নূরী ছুটে গিয়ে বিপদ সংকেত ঘণ্টাধ্বনি করে।
মুহূর্তে সমস্ত দস্যু এসে জড়ো হয় নূরীর চারপাশে।
নূরী সকলকে লক্ষ্য করে বলে–ছায়ামূর্তি! এই মুহূর্তে এখানে ছায়ামূর্তি এসেছিল– যাও, তোমরা শিগগির তার অনুসন্ধান কর। যাও।
সমস্ত অনুচরের চোখেমুখে বিস্ময় ঝরে পড়ল-আশ্চর্য! তাদের এত সাবধানতা সত্ত্বেও কি করে এখানে ছায়ামূর্তি প্রবেশ করলো! সবাই ছুটলো চারদিকে। আস্তানা তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো কিন্তু কোথাও কোন সন্ধান পাওয়া গেল না।
.
ভোরের দিকে তাজের পদশব্দে নূরীর ঘুম ভেঙে গেল।
গোটারাত নূরীর নিদ্রা হয় নি, এই অল্পক্ষণ সে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাজের শব্দ তার অতি পরিচিত। তাড়াতাড়ি শয্যা ত্যাগ করে ছুটে গেল সে বনহুরের কক্ষে।
বনহুর কক্ষে প্রবেশ করেই নূরীকে উত্তেজিতভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্মিত হল, হেসে বলল–এখনও ঘুমোওনি নূরী?
নূরী তার কথার কোন জবাব না দিয়ে বলে–হুর, জানো কি ঘটেছে? তুমি যা বলেছিলে তাই?
কি বলেছিলাম?
ছায়ামূর্তি! সেই ছায়ামূর্তি এসেছিল…..
ছায়ামূর্তি এসেছিল, বল কি নূরী!
হ্যাঁ, কি ভয়ঙ্কর তার চেহারা। তেমনি অসুরের মত শক্তি তার দেহে।
তার চেহারাও দেখেছ। তার শক্তিও পরীক্ষা করা হয়ে গেছে দেখছি।
সব, বলছি হুর, শোনো। সে তোমার জীবন নিতে এসেছিল!
আমার জীবন?
হ্যাঁ, তোমার জীবন। তুমি যদি ছায়ামূর্তির অনুসন্ধানে ক্ষান্ত না হও, তবে—
আমার জীবন নেবে সে–এই তো?
আমি ওকে হত্যা করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সে আমার হাত মুঠায় চেপে ধরে….
ছোরাখানা কেড়ে নিয়েছে–এই তো?
তুমি ঠাট্টা করছ হুর! আমার ভয় হচ্ছে, শয়তানটা তোমার না কিছু করে বসে।
ভয় নেই নূরী, ছায়ামূর্তির সাধ্য কি তোমার হুরের গায়ে হাত দেয়।
সত্যি তুমি কত শক্তিশালী! হুর, তোমার দিকে চাইলে আমি গোটা দুনিয়াটাকে ভুলে যাই। তোমার মত পুরুষ বুঝি দুনিয়াতে আর দ্বিতীয়টি নেই।
নূরী, তুমি আমাকে অত্যন্ত ভালবাস, তাই তুমি এ কথা বলতে পারলে।
হুর! অস্ফুট শব্দ করে বনহুরের বুকে মাথা রাখে নূরী, তারপর আবেগভরা কণ্ঠে বলে ওঠে–আজ তুমি এ কথা স্বীকার করলে! আমার ভালবাসার আঁচ এতদিনে অনুভব করলে তুমি। হুর, আজ যে আমার কি আনন্দ হচ্ছে তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারবো না।
নূরী! বনহুর নূরীর মাথায় ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দেয়।
গভীর আবেগে নূরী বনহুরের বুকে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করে। এমনি করে সে যদি চিরদিন হুরের বুকে মাথা রেখে কাটিয়ে দিতে পারত! পৃথিবীর আর কোন সুখ সে চায় না-শুধু চায় এইটুকু।
মানুষ যা চায় তা সবসময় পায় না। তাই নূরীরও এই সুখ, এই অনাবিল আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না।
হঠাৎ বনভূমি প্রকম্পিত করে বেজে ওঠে বিপদ সঙ্কেতধ্বনি।
বনহুর তাড়াতাড়ি নূরীকে সরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। নিজের অজ্ঞাতে তার দক্ষিণ হাতখানা বেল্টে ঝুলান রিভলভারের গায়ে গিয়ে ঠেকে। সচকিত হয়ে ওঠে বনহুর।
নূরী উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বলে–নিশ্চয়ই আবার সেই ছায়ামূর্তির আবির্ভাব হয়েছে।
তক্ষুণি রহমত হন্তদন্ত হয়ে কক্ষে প্রবেশ করে–সর্দার, পুলিশ?
বনহুর মুহূর্তে ফিরে দাঁড়াল-পুলিশ?
হ্যাঁ সর্দার। পুলিশ ফোর্স অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এগিয়ে আসছে।
রহমত?
সর্দার?
পুলিশ আমার আস্তানার সন্ধান কি করে পেল?
সর্দার, এ প্রশ্ন আমার মনেও জাগছে!
কিন্তু এখন ওসব আর ভাববার সময় নেই, আমার অনুচরদেরকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে বল। একটা পুলিশও যেন ফিরে না যায়। আর শোনো, আমার ভূগর্ভ সুড়ঙ্গমুখ খুলে রাখ, প্রয়োজন হলে…
যাও।
রহমত দ্রুত বেরিয়ে যায়।
নূরী শঙ্কিত কণ্ঠে বলে ওঠে–হুর, এখন উপায়?
নূরী, শিগগির তুমি ভূগর্ভ সুড়ঙ্গপথে নিচে নেমে যাও। আর এক মুহূর্ত এখানে বিলম্ব করো না।
হুর, তোমাকে ছেড়ে আমি কিছুতেই যাব না।
নূরী যাও। বনহুর চিৎকার করে ওঠে!
ওদিকে গুড়ুম গুড়ুম করে রাইফেল গর্জে ওঠার শব্দ হচ্ছে।
নূরী বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে–তুমিও চলো হুর, নইলে আমি যাব না।
নূরী!
বনহুরের কঠিন কণ্ঠস্বরে নূরীর হৃদয় কেঁপে ওঠে, দু’চোখে গড়িয়ে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। একবার বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায় সে।
