সেই কাওসার আজ উচ্চশিক্ষা লাভ করে মানুষের মত মানুষ হয়েছে, আর তার মনির আজ কি হয়েছে?-লোকসমাজে তার কোন স্থান নেই!
মনিরা নিশ্চুপ। পাথরের মূর্তির মতই স্তব্ধ হয়ে বসে রইল সে।
মরিয়ম বেগম গভীর স্নেহে টেনে নিলেন ওকে কাছে-মা, জানি তুই ঐ হতভাগাকে ভালবাসিস। কিন্তু… সে আমার সন্তান হলে কি হবে, ওর হাতে আমি তোকে তুলে দিতে পারব না। না না, কিছুতেই তা সম্ভব নয়। মনিরা বল্ আমার কথা রাখবি। আমি খালেদাকে কথা দিয়ে এসেছি, কাওসারের সঙ্গে তোর বিয়ে দেব….
মামীমা! আর্তস্বরে বলে ওঠে মনিরা।
হ্যাঁ, আমি তোকে পরের হাতে সঁপে দিতে পারব তবু তোর ফুলের মত জীবনটাকে বিনষ্ট করতে পারব না।
মামীমা, তুমি জানো না….
সব জানি মনিরা সব জানি। কিন্তু কোন উপায় নেই। মনিরকে তোর ভুলতে হবে।
মামীমা!
আমি পাষাণের চেয়েও কঠিন হবো। যত আঘাতই আসুক না কেন, সব আমি সহ্য করব। হঠাৎ মরিয়ম বেগম চিৎকার করে ডাকেন– সরকার সাহেব, সরকার সাহেব!
হন্তদন্ত হয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন সরকার সাহেব-আমায় ডাকছেন বিবি সাহেবা?
হ্যাঁ। শুনুন সরকার সাহেব, আমি মনিরার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছি। আমার চাচাতো বোন। খালেদার ছেলে কাওসারের সঙ্গে। আপনি বিয়ের সব আয়োজন করুন।
আচ্ছা বিবি সাহেবা। কবে থেকে বিয়ের আয়োজন শুরু করব?
কাল। কাল থেকেই আপনি কাজ শুরু করুন। বাড়িঘর সমস্ত হোয়াইট ওয়াশ করিয়ে নিন। দরজা জানালা সব নতুন রঙ করাবেন। পুরানো পর্দা সরিয়ে নতুন পর্দার ব্যবস্থা করুন! চৌধুরী সাহেব মরে গেছেন বলে আমিও মরিনি। আমি বেঁচে থাকতে আমার মেয়ে মনিরা চোখের পানি ফেলবে–এ আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না। ওকে যদি আমি সুখী করতে না পারি তাহলে আমি মরেও শান্তি পাব না।
ওর মা মৃত্যুকালে ওকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলে গেছে-মনিরাকে সুখী করো ভাবী। রওশন আরার সেই মৃত্যুকালের শেষ কথা আমি কোন দিন ভুলব না। নিজের সুখ-সুবিধার জন্য ওকে আমি সাগরে ভাসাতে পারি না।
সরকার সাহেব মাথা দোলালেন–আপনি ঠিক বলেছেন বিবি সাহেবা, এখন মা মনির বিয়ে দেওয়া একান্ত দরকার। পাড়া-প্রতিবেশীরা এ নিয়ে অনেক কথাই বলে, তাদের মুখে যেন কালি পড়ে।
পাড়া-প্রতিবেশীদের কথাবার্তা শুনে শুনে কান আমার ঝালাপালা হয়ে গেছে। মেয়ে বড় হয়েছে আমার হয়েছে তাতে অন্যের কি? চৌধুরী সাহেব বেঁচে থাকতে যারা টু’ শব্দটি করতে সাহসী হয়নি, আজ তারা আমাদের সম্বন্ধে যা-তা বলতে শুরু করেছে। যাক, এবার আমি সকলের কথার শেষ করব; মনিরার বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হব।
মরিয়ম বেগম মুখে যতই বলুন না কেন, শেষ পর্যন্ত তিনি মনিরাকে খালেদার ছেলে কাওসারের সঙ্গে বিয়ে দিতে পারলেন না। মনকে যতই কঠিন করবেন ভেবেছিলেন সব ভেসে গেলো–অদৃশ্য মায়ার বন্ধন মরিয়ম বেগমের সমস্ত অন্তর আচ্ছন্ন করে ফেলল।
তিনি সব ছাড়তে পারেন কিন্তু মনিরাকে ত্যাগ করতে পারেন না।
পরদিন ভোরে নামান্তে সরকার সাহেবকে ডেকে বললেন-মনিরার বিয়ে আমি দেব না–সরকার সাহেব। অযথা ঘরদোর নতুন করে সাজাবার আমার কোন দরকার নেই।
সরকার সাহেব সব বুঝতে পেয়ে মৃদু হাসলেন, তারপর চলে গেলেন নিজের কাজে।
.
বনহুরের মাথায় পাগড়ীটা পরিয়ে দিয়ে হেসে বলল নূরী–জানি তুমি ছায়ামূর্তির সন্ধানে চলেছ।
হ্যাঁ নূরী, পুলিশমহল যে ছায়ামূর্তির সন্ধানে ঘাবড়ে উঠেছে–আমি তাকে খুঁজে বের করতে চাই।
সত্যি হুর, বড় আশ্চর্য! কে এই ছায়ামূর্তি? ছায়ামূর্তি যে অত্যন্ত চালাক এবং ধূর্ত, এতে কোন সন্দেহ নেই।
সে কারণেই তো আজও পুলিশ তাকে গ্রেফতারে সক্ষম হয় নি।
তুমি কোথায় পাবে তার সন্ধান?
দস্যু বনহুরের চোখে ধুলো দিতে পারে এমন ছায়ামূর্তি আছে? নূরী, ছায়ামূর্তি যেই হোক, আমি তাকে পাকড়াও করবোই। কিন্তু সাবধান, ছায়ামূর্তি যেন এখানে এসে হাজির না হয়।
হেসে বলে নূরী-হুর, তোমার আস্তানায় আসবে ছায়ামূর্তি? এত সাহস হবে তার? সিংহের গহ্বরে শৃগালের প্রবেশ–
আচ্ছা, আমি চললাম। খোদা হাফেজ! বনহুর নূরীর মুখের দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যায়।
বনহুর চলে যেতে নূরী ফিরে দাঁড়ায়, বনহুরের পরিত্যক্ত শয্যায় গা এলিয়ে দিয়ে দু’চোখ বন্ধ করে। মনের কোণে ভেসে ওঠে বনহুরের সুন্দর মুখখানা। কানের কাছে ভাসে তার কণ্ঠস্বর।
নূরী উঠে বনহুরের ছোরাখানা তুলে নেয় হাতে, বুকে চেপে ধরে অনুভব করে তার স্পর্শ।
হঠাৎ পেছনে একটা শব্দ হয়! চমকে ফিরে তাকায় নূরী। মুহূর্তে তার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়।
নূরী দেখতে পায়, একটা অদ্ভুত কালো আলখেল্লায় সমস্ত শরীর ঢাকা ছায়ামূর্তি দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
নূরী হতবাকের মত তাকিয়ে থাকে।
ছায়ামুর্তি এগিয়ে আসে।
নূরী চিৎকার করে ওঠে–কে তুমি?
ছায়ামূর্তি! চাপা অস্ফুট কণ্ঠে বলে ছায়ামূর্তি।
ছায়ামূর্তি তুমি! কি চাও এখানে?
আমি জান নিতে এসেছি।
জান?
হ্যাঁ, তোমার নয়-দস্যু বনহুরের।
নূরী দু’পা সরে দাঁড়ায়, সাহস সঞ্চয় করে বলে–শয়তান, জানো তুমি কোথায় এসেছ?
দস্যু বনহুরের বিশ্রামকক্ষে।
এখানে তুমি কেমন করে প্রবেশ করলে?
ছায়ামূর্তির প্রবেশ সর্বক্ষণ সর্বস্থানে অতি সহজ…. একটু থেমে বলে ছায়ামূর্তি-এতক্ষণ তোমার আর দস্যু বনহুরের মধ্যে যে কথাবার্তা হলো সব আমি শুনেছি!
