অনুচরদের মধ্যে এ নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হল। কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলার সাহস পেল না।
নূরীও কম বিস্মিত হয় নি, বনহুরকে সে এই প্রথম নীরবে অশ্রু বিসর্জন করতে দেখল।
সন্ধ্যার অন্ধকারে নিজের বিশ্রামকক্ষে নিশ্চুপ শুয়েছিল বনহুর। নূরী ধীর পদক্ষেপে তার পাশে গিয়ে বসল। বনহুরের চুলের ফাঁকে আংগুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল–হুর, কি হয়েছে তোমার?
নূরীর কোমল স্পর্শে বনহুর মুখ তুলে তাকাল। দু’চোখে তার অশ্রুর বন্যা। নূরী নিজের আঁচল দিয়ে বনহুরের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল হুর আমার কাছে কিছুই অজানা নেই। বলো, কি হল তোমার?
নূরী, কি বলব, আজ আমার মত দুঃখী কেউ নেই।
কি হয়েছে বল?
ছোটবেলায় আম্মা-আব্বার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম, কিন্তু তাদের অপরিসীম আশীর্বাদ থেকে কোনোদিন বঞ্চিত হইনি। আজ তাও হারিয়েছি। আমার ….আমার আব্বা আর বেঁচে নেই।
তোমার আব্বা! বিস্মিত কণ্ঠস্বর নূরীর।
হ্যাঁ, আমার আব্বা। নূরী তোমার কাছে আমি বড় অপরাধী।
ছিঃ ও কথা বল না হুর। আমিই যে তোমার কাছে চির অপরাধী। কত মহৎ তুমি, তাই তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ…
শোনো নূরী, আমার আব্বা-আম্মা উভয়েই বেঁচে ছিলেন এতদিন।
বেঁচে ছিলেন?
হ্যাঁ নূরী।
কেন তবে যাওনি তুমি তাদের কাছে?
আমি তাদের অপরাধী সন্তান। আমি তাঁদের বংশের কলংক অভিশাপ। তাই সন্তান হয়েও পুত্রের দাবী নিয়ে কোনদিন তাঁদের সম্মুখে দাঁড়াবার সাহস পাইনি, পিতার মৃত্যুকালে বুক ফেটে গেছে, কিন্তু আব্বা বলে ডাকবার সুযোগ পাইনি; নূরী, আমি যে তাঁদের অভিশপ্ত সন্তান। ছোট্ট। বালকের মত ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে বনহুর।
নূরীও কেঁদে ফেলে, বনহুরের চোখের পানি নূরীর হৃদয়ে প্রচণ্ড আঘাত হানে। বনহুরকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে তার।
নূরী ধীরে ধীরে বনহুরের চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
এমন সময় বাইরে পদশব্দ শোনা যায়। নূরী উঠে দাঁড়িয়ে বলে–কে?
আমি মহসীন। দরজার বাইরে থেকে কথাটা ভেসে আসে।
নূরী বনহুরকে লক্ষ্য করে বলে হুর, মহসীন তোমার সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়। ওঠো।
বনহুর উঠে বসে। নূরী নিজের আঁচল দিয়ে বনহুরের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলে– মহসীন তোমায় ডাকছে।
গম্ভীর কণ্ঠে বলে বনহুর– আসতে বল। নিজের চোখমুখ হাতের তালুতে ঘষে স্বাভাবিক করে নেয় সে।
মহসীন কুর্ণিশ করে দাঁড়ায়।
বনহুর বলল– কাসেমের সন্ধান পেয়েছ?
সর্দার। যারা ওর সন্ধানে গিয়েছিল, সবাই ফিরে এসেছে। সর্দার, আমার মনে হয় ও নেকলেসটার লোভ সামলাতে পারেনি। ফেরত দিতে গিয়ে আত্মসাৎ করে পালিয়েছে।
আমি তো জানি এত সাহস ওর হবে না।
সর্দার, তাহলে সে রয়েছে কোথায়?
ধরা পড়ে যায়নি তো?
না সর্দার। আমরা গোপনে সব জায়গায় সন্ধান নিয়ে দেখেছি।
এমন সময় রহমতের গলার আওয়াজ পাওয়া যায়– সর্দার, কাসেম এসেছে।
বনহুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল দরজার দিকে, বলল–নিয়ে এসো।
রহমতের পেছনে নতমুখে কাসেম এসে দাঁড়াল।
বনহুর নূরীকে বলল– নূরী, তুমি যাও, বিশ্রাম করোগে।
নূরী চলে গেল।
বনহুর অগ্নিদৃষ্টি মেলে তাকাল কাসেমের দিকে। কে মনে করবে এই সেই বনহুর, যে একটু পূর্বেই পিতৃশোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল। বনহুরের দু’চোখে আগুন ঠিকরে বের হয়। গম্ভীর কণ্ঠে গর্জে ওঠে–কাসেম!
সর্দার!
খবর কি তোমার?
সর্দার …
কোথায় গুম হয়েছিলে?
সর্দার, আমি নেকলেসখানা…
বল থামলে কেন?
সর্দার নেকলেস আমি ফেরত দিতে পারিনি।
তার মানে?
আমি তাকে খুঁজে পাইনি সর্দার।
খুঁজে পাওনি! তাই আত্মগোপন করে থাকতে চেয়েছিলে?
মাফ করবেন, আমি আপনার সামনে আসার সাহস পাইনি।
আজ তবে কেমন করে সাহস হল?
রহমত বলে ওঠে– সর্দার, আমি নারন্দি থেকে ফিরে আসার সময় কান্দাইয়ের বনের নিকটে ওকে দেখতে পাই। ও আমাকে দেখে চোরের মত পালাতে যাচ্ছিল। আমি ওকে ধরে আনি।
বনহুর হুঙ্কার ছাড়ে– এ কথা সত্যি?
পালাচ্ছিলাম সত্য, কিন্তু কিছু আমি চুরি করিনি।
নেকলেসখানা কি করেছ?
আমার কাছেই আছে। এই যে সর্দার। ফতুয়ারা পকেট থেকে নেকলেস ছড়া বের করে বনহুরের সম্মুখে মেলে ধরে–আমি তাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান পেরেশান হয়ে গেছি–তাই নেকলেসটা আমার কাছেই রয়েছে।
বনহুর কিছু বলার পূর্বে মহসীন বলে ওঠে– সর্দার, কাসেম যা বলছে সত্য নয়। এখন ধরা পড়ে সাধু সেজেছে।
গর্জে ওঠে বনহুর–চুপ কর মহসীন। কাসেম যা বলছে মিথ্যা নয়।
সর্দার! আনন্দধ্বনি করে ওঠে কাসেম। দু’চোখে তার কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ে। এতদিন যার ভয়ে সে বন হতে বনান্তরে, শহরে, গ্রামে লুকিয়ে লুকিয়ে ফিরেছে– তিনি স্বয়ং তার পক্ষে। আনন্দ উপচে পড়ল কাসেমের মুখমণ্ডলে।
বনহুর কাসেমের হাত থেকে নেকলেস ছড়া হাতে উঠিয়ে নিয়ে বলল যাও কাজে যোগ দাও।
কাসেম এবং মহসীন বেরিয়ে গেল।
বনহুর রহমতকে লক্ষ্য করে বললো– রহমত, সেই অন্ধ রাজার খবর কি?
খবর ভাল। তাঁকে তাঁর ছোট ভাই বন্দী করবার ফন্দি এঁটেছিলো, আমি তা নষ্ট করে দিয়েছি।
কিভাবে এ কাজ করলে তুমি?
আমি তাঁর সেই দলিল চুরি করে এনেছি। কাজেই আদালতে বিনা বিচারে অন্ধ রাজা মোহন্ত সেন খালাস পেয়ে গেছেন।
একথা তুমি তো জানাওনি রহমত?
সর্দার, কদিন আপনার সাক্ষাৎ কামনায় ঘুরেছি, কিন্তু সাক্ষাৎ পাইনি।
