হঠাৎ শঙ্কর রাও বললেন-–একে যেন আমি কোথায় দেখেছি বলে মনে হচ্ছে। গলার স্বরটাও যেন শুনেছি।
বুড়ী কাঁদতে কাঁদতে বলে– তা দেখবেন হুজুর, আমি সব সময় লোকের বাড়িতে কাজ করি–
মিঃ আলম এবার কথা বললেন– মিঃ রাও, আপনি ভাল করে স্মরণ করে দেখুন ওকে কোথায় দেখেছিলেন?
ঠিক মনে পড়ছে না।
গভীরভাবে চিন্তা করুন।
মিঃ রাও বুড়ীর মুখের দিকে তাকালেন, বুড়ী মুখটা ঘুরিয়ে দাঁড়াল।
মিঃ আলম কঠিন কণ্ঠে বললেন– এই দিকে মুখ করে দাঁড়াও।
তারপর মিঃ জাফরকে লক্ষ্য করে বললেন– স্যার, একে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।
মিঃ জাফরী বলেন স্বচ্ছন্দে করুন মিঃ আলম।
মিঃ আলম এবার বুড়ীকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন–তোমার নাম কি?
আমার নাম, আমার নাম তো তেমন কিছুই নেই। সবাই আমাকে ‘মাসী’ বলে ডাকে।
তা ডাকুক, তোমার নাম শুনতে চাচ্ছি?
নাম…এবার বুড়ী তাকালো জয় সিংয়ের মুখে, উভয়ের দৃষ্টি বিনিময় হল। বুড়ী আবার ঢোক গিলে বলল– আমাকে ছোটবেলায় সবাই সই’ বলে ডাকত।
গর্জে উঠলেন মিঃ আলম–মিথ্যে কথা! তোমার সঠিক নাম শুনতে চাই।
মিঃ জাফরী এবং অন্যান্য পুলিশ অফিসার মিঃ আলমের বজ্র কঠিন কণ্ঠস্বরে চমকে উঠলেন। তারা সবাই তাকালেন মিঃ আলমের মুখের দিকে।
মিঃ আলমের সুন্দর মুখমণ্ডল রাগে রক্তাভ হয়ে উঠেছে। উজ্জ্বল দীপ্ত চোখ দুটিতে যেন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। দাঁতে দাঁত পিষে বললেন– জান মিথ্যার শাস্তি কি? এ মুহূর্তে আমি তোমার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব।
বুড়ীর মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে। অসহায় দৃষ্টি নিয়ে একবার তাকাচ্ছে সে জয়সিংয়ের দিকে, আর একবার তাকাচ্ছে মিঃ আলমের চোখ দুটোর দিকে। জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট দু’খানা বারবার চেটে নিচ্ছে।
বুড়ীর মুখ দেখেই মনে হচ্ছে, ওর মনের মধ্যে ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়েছে। মিঃ আলমের মুখোভাব লক্ষ্য করে বুড়ী শিউরে ওঠে কম্পিত কণ্ঠে বলে আমার নাম সতী দেবী …
হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। তুমি–তুমিই সেই সতী দেবী, যাকে দস্যু নাথুরামের ওখানে দেখেছিলাম। সেই সতী দেবী তুমি– এখানে কেন– এখানে কেন তুমি? শঙ্কর রাও এবার বুড়ীর ওপর রেগে ফেটে পড়লেন।
কক্ষের সবাই আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছেন। মিঃ জাফরীর দু’চোখেও বিস্ময়।
মিঃ হারুনের মুখোভাব কঠিন হয়ে উঠেছে।
মিঃ আলমের মুখমণ্ডল পূর্বের চেয়ে অনেকটা স্বচ্ছ হয়ে এসেছে। তিনি মিঃ রাওকে লক্ষ্য করে বললেন– এই স্মরণশক্তি নিয়ে আপনি গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছেন।
মিঃ আলম যদিও তার বন্ধুলোক তবুও তার কথায় লজ্জিত হলেন মিঃ রাও।
মিঃ আলম মিঃ জাফরীকে লক্ষ্য করে বললেন– স্যার, আমি জয়সিংকে অ্যারেস্ট করার জন্য। অনুরোধ করছি।
মিঃ জাফরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন– আমারও সেই মত।
মিঃ হারুন পুলিশকে ইঙ্গিত করলেন জয় সিংয়ের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিতে।
সতী দেবীর হাতেও হাতকড়া লাগিয়ে দেয়া হল।
জয় সিং প্রায় কেঁদেই ফেললেন–আমাকে বিনা অপরাধে এভাবে অপমানিত করছেন কেন?
মিঃ আলম বললেন, তার জবাব পাবেন বিচারের পরে। এবার তিনি মিঃ জাফরীকে লক্ষ্য করে বললেন– স্যার,লাশ মর্গে পাঠানোর পূর্বে একজন ক্যামেরাম্যানের আবশ্যক। ভগবৎ সিংয়ের ছবি রাখা দরকার।
মিঃ জাফরী অবাক হলেও মনোভাব প্রকাশ না করে ক্যামেরাম্যানকে নিয়ে আসার আদেশ দিলেন।
মৃত ভগবৎ সিংয়ের ফটো নেয়া হল। পর পর দুটো।
মিঃ আলম এবার মৃতের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, বললেন আপনারা সবাই ভগবৎ সিংয়ের যে রূপ দেখতে পাচ্ছেন সেটা তার আসল চেহারা নয়।
কক্ষের সবাই অবাক হলেন। মিঃ জাফরী বললেন– কি বলছেন মিঃ আলম।
হ্যাঁ দেখুন। মিঃ আলম মৃত ভগবৎ সিংয়ের মুখ থেকে গোঁফ জোড়া খুলে নিলেন। কপালের ওপরের কিছুটা চুল টেনে তুলে ফেললেন।
মিঃ হারুন তীব্র কণ্ঠে বলে উঠলেন এ যে ডাকু নাথুরাম। সর্বনাশ, আমরা এতদিনেও একে চিনতে পারিনি।
মিঃ জাফরী বললেন– এই সেই নাথুরাম? দস্যু নাথুরাম।
হ্যাঁ স্যার। আমাদের ডায়েরীতে এর নাম এবং ফটো আছে। বড় শয়তান– দুর্দান্ত ডাকু। কথাটা বললেন মিঃ হারুন।
শঙ্কর রাও যেন খুশি হলেন না। তিনি রাগে গস গস করে বললেন– বেটা আমাকে যা ভুগিয়েছিল। বেঁচে থাকলে আমি ওকে ফাঁসি দিয়ে, তবে ছাড়তাম।
মিঃ হারুন মিঃ আলমকে বুকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করে বললেন– আপনাকে ধন্যবাদ মিঃ আলম। ভগবৎ সিংয়ের আসল পরিচয় উদঘাটিত না হলে একটা জটিল রহস্য। অন্ধকারের আড়ালে চাপা পড়ে যেত। ডাকু নাথুরামের ছদ্মবেশে এবং তার এই ভয়ঙ্কর পরিণতি আমরা কেউ জানতে সক্ষম হতাম না।
মিঃ জাফরীও মিঃ আলমের সঙ্গে হ্যাঁণ্ডশেক করলেন। কিন্তু তার মুখমণ্ডল খুব প্রসন্ন বলে মনে হল না। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন– এই হত্যা রহস্য আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। জানি না এর সমাপ্তি কোথায়।
লাশ মর্গে পাঠানোর পূর্বে নাথুরামের আরও দুখানা ফটো নেয়া হল।
মিঃ জাফরী দলবলসহ জয় সিং এবং সতী দেবীকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ অফিসে নিয়ে চললেন।
চৌধুরী সাহেবের হত্যারহস্য আরও জটিল হয়ে উঠল।
বালিশে মুখ গুঁজে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করছিল বনহুর। আজ কদিন থেকে একেবারে নীরব হয়ে পড়েছে সে। নিজ অনুচরদের সঙ্গে পর্যন্ত তেমন করে আর কথা বলে না।
হঠাৎ দস্যু বনহুরের হল কি?
