শিকারী যখন লোকালয়ে পৌঁছে দস্যু বনহুর সম্বন্ধে সমস্ত কথা ইনিয়ে বিনিয়ে বলছে, তখন দস্যু বনহুর এক কর্মকারের বাড়ির দরজায় গিয়ে নেমে দাঁড়াল।
গভীর রাত। সবাই ঘুমে অচেতন।
কর্মকার সারাদিনে ক্লান্তির পর ছেঁড়া কাঁথার নিচে গা মুড়ি দিয়ে সুখন্দ্রিা উপভোগ করছে।
এমন সময় বনহুর তার পাশে এসে দাঁড়াল। রিভলভারের ডগা দিয়ে মুখের কথা সরিয়ে দিল সে। সঙ্গে সঙ্গে কর্মকারের সুখনিদ্রা ছুটে গেল, চোখ মেলে তাকিয়ে অপরিচিত এক ব্যক্তিকে তার কক্ষে দেখে ত্বরিতগতিতে বিছানায় ওঠে বসল।
কর্মকার কিছু বলার পূর্বেই বনহুর রিভলভার উঁচু করে ধরল।
কর্মকার হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে কিছু বুঝতে না পেরে হা করে তাকিয়ে রইল। ভাবল, স্বপ্ন দেখছে না তো– দু’হাতে চোখ রগড়ে ভাল করে তাকাল।
বনহুর বলে উঠল-ওঠো।
কর্মকার চিত্রার্পিতের ন্যায় উঠে দাঁড়াল। বারবার তাকাতে লাগল বনহুরের হাতের রিভলভারখানার দিকে।
বনহুর চাপাকণ্ঠে বলল–এই যে– আমার এ দুটো খুলে দাও।
কর্মকার এতক্ষণে বনহুরের হাতের হাতকড়ার দিকে নজর করেনি। লণ্ঠনের স্বল্পালোকে তাকিয়ে শিউরে উঠল। ভাবলো নিশ্চয়ই এ ভাল লোক নয়, কোন কয়েদী, পালিয়ে এসেছে তার কাছে।
কর্মকারের দু’চোখ গোলাকার হয়ে ওঠে। সে জানে পলাতক কয়েদী ধরে দিলে পুরস্কার পাওয়া যায়। হয়তো কোন চোর কিংবা ডাকু হবে। মোটা পুরস্কার পাবে সে। তার মুখটা হাসিমাখা করে বলল, কে তুমি বাবা?
বনহুর কর্মকারের মুখোভাব দেখে তার মনের ভাব বুঝেছিল, হেসে বলল– আমি একজন পলাতক আসামী। দেখো ভাই, আমার হাতের এ দুটো খুলে দাও। আর একটু থাকার জায়গা যদি দিতে।
তা আর বলতে হবে না। আমরা হিন্দু, অতিথি আমাদের কাছে দেবতার সমান।
বেশ, তাহলে আমার হাতের এ দুটো খুলে দাও।
বনহুর কর্মকারের বুকের কাছ থেকে রিভলভারখানা সরিয়ে নিয়েছিল। কর্মকার বনহুরকে নিয়ে তার কারখানার মধ্যে প্রবেশ করল কিছুক্ষণ পরিশ্রম কারার পর বনহুরের হাত দুখানা মুক্ত হয়ে আসে।
হাত দু’খানাতে হাত বুলিয়ে বলে বনহুর–এর জন্য তুমি পুরস্কার পাবে। এবার আমার শোবার জায়গা করে দাও দেখি।
কর্মকারের আনন্দ আর ধরে না। মনে মনে বলে হাতকড়া খুলে দিয়েছি বলেই তোমাকে ছাড়ছিনে বাছাধন। কিন্তু প্রকাশ্যে বলে–এসো বাবা এসো, এই যে আমার বিছানায় শোও, আমি ভিতরে গিয়ে শুই।
আচ্ছা! বনহুর কর্মকারের তেলচিটে বিছানায় শুয়ে কাঁথাটা টেনে দিল চোখেমুখে। তারপর কাঁথার নিচে বারবার হাই তুলে বলল–তুমি যাও, বড় ঘুম পাচ্ছে আমার।
কর্মকার বেরিয়ে যাবার পূর্বে আর একবার বলে–তুমি বাবা নিশ্চিন্তে ঘুমোও। কাল ভোরে ডেকে দেব।
বনহুর কাথার নিচে থেকে বলে–আচ্ছা।
কর্মকার বেরিয়ে দরজা টেনে বন্ধ করে দিল। বনহুর শুনতে পেল শিকলটাও আটকে দিল সে।
দরজা বন্ধ হবার সংগে সংগে কাঁথা সরিয়ে দরজার পাশে এসে কান পেতে শুনতে লাগল বনহুর।
ওপাশ থেকে ভেসে আসছে কর্মকারের চাপা কণ্ঠস্বর-ওগো, ওঠো-ওঠো!
মেয়েলী কণ্ঠ– বলি এত রাতে কি হলো তোমার?
শোনো, একটা কয়েদী পালিয়ে এসেছে।
তাতে আমার কি?
তোমার কি, শোনোই না! ওকে ধরিয়ে দিতে পারলে কি পাব জান?
কি পাবে?
গভর্ণমেন্ট আমাকে মোটা পুরস্কার দেবে। অনেক টাকা– বুঝেছ?
বুঝেছি। কিন্তু কয়েদী কোথায়?
ঐ যে আমার ঘরে ঘুমাচ্ছে। আমার নরম বিছানায়, গরম কাথার নিচে ঐ শোনো নাক ডাকছে। দেখো, তুমি চুপ করে এই দরজার পাশে থাক। আমি চট করে থানায় খবরটা দিয়ে আসি।
সে কি গো! খবরটা দিয়ে আসবে, না পুলিশ নিয়ে আসবে?
হ্যাঁ, পুলিশকে একেবারে সংগে করে নিয়ে আসব। তুমি এখান থেকে নড়ো না, বুঝেছ?
হ্যাঁ গো বুঝেছি। যাও, চট করে এসো কিন্তু। আমার বড্ড ঘুম পাচ্ছে। আরে রেখে দাও তোমার ঘুম, দেখো দরজা যেন আবার খুলে দিও না।
না গো না, দেব না–দেব না।
চটি জুতা পায়ে বেরিয়ে যাবার শব্দ শোনা যায়।
বনহুর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে হাসে।
একটা কাগজে নিজের নাম লিখল বনহুর। তারপর বিছানার ওপর রেখে পেছনের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। জানালার সরু শিকগুলোতে হাত দিয়ে মৃদু হাসলো সে। মাত্র কয়েক মিনিট-বনহুর জানালা দিয়ে ঘরের পেছনে বেরিয়ে এলো। অদূরে অশ্বটা ঘাস চিবুচ্ছিল। বনহুর বিলম্ব না করে অশ্বে চেপে বসল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অঞ্চলের থানার ছোট দারোগা মিঃ হাকিম আর কয়েকজন পুলিশ কর্মকারের সংগে এসে হাজির হলেন।
কর্মকার এসে দেখে তার বৌ দরজার পাশে আঁচল বিছিয়ে দিব্যি আরামে ঘুমাচ্ছে।
দারোগা সাহেবকে বলল কর্মকার-হুজুর এই ঘরে কয়েদীকে আটকে রেখেছি। আমার কাছ থেকে পালাবে এমন বেটা আছে নাকি? দাঁড়ান, দরজা খুলে দিই। কর্মকার নিজ হাতে দরজা খুলে ফেলল।
দারোগা, জমাদার এবং পুলিশ একসংগে কক্ষে প্রবেশ করেন। কিন্তু একি, কোথায় কয়েদী! শূন্য বিছানা পড়ে রয়েছে।
ছোট দারোগা মিঃ হাকিম ধমক দিলেন–কোথায় কয়েদী? পাঁজি কোথাকার। জানিস মিথ্যে বলার শাস্তি কি?
কর্মকার কাঁপতে কাঁপতে বলল– হুজুর মিথ্যে বলিনি। আমরা হিন্দু, এই যেন কান ধরে বলি………..
কর্মকারের কথা শেষ হয় না। একজন পুলিশ উবু হয়ে বিছানা থেকে কাগজখণ্ড তুলে নিয়ে লণ্ঠনের সম্মুখে ধরে চিৎকার করে উঠলেন– দস্যু বনহুর!
