তবে? তবে যে তোর চিঠি।
ও চিঠি আমার নয় মামীমা।
কি বললি, ও চিঠি তোর নয়?
আমার হাতের লেখা, কিন্তু আমার কথা নয়।
এ তুই কি বলছিস মনিরা?
হ্যাঁ মামীমা, ও চিঠি আমাকে দিয়ে জোর করে লেখানো হয়েছে।
কে–ঐ পাঁজি মনিরটা বুঝি?
না। সে অন্য এক শয়তান।
কে? সে কে মনিরা?
যারা আমাকে সেদিন জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তার নাম শয়তান মুরাদ– তোমাদের সেই জামাতা।
খান বাহাদুরের ছেলে মুরাদ?
হ্যাঁ।
তাই তো বলি এতবড় সর্বনাশ আমার মনির করবে! দাঁড়া–এক্ষুণি তোর মামাকে সব বলি।
না, না, মামীমা এসব তুমি আর কারও কাছে বল না, এতে আমার কলঙ্ক বাড়বে। সবাই জানে আমি তোমাদের সন্তান দস্যু বনহুরের সঙ্গে গিয়েছি। তাই জানুক– সে কলঙ্ক হবে আমার। অঙ্গের ভূষণ।
মনির এ কথা যদি জানতে পারে তোকে অন্য একজন চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল?
সে সব জানে। তোমাদের কোন ভয় নেই মামীমা। সেই তো আমাকে শয়তানের হাত থেকে উদ্ধার করেছে।
সত্যি!
সব সত্যি। মামীমা, আমায় কিছু খেতে দাও। তারপর তোমার বিছানায় শুয়ে সব বলছি।
মরিয়ম বেগম তাড়াতাড়ি ঘরে যা ছিল এনে মনিরাকে খেতে দিলেন।
মনিরা খেতে খেতে বলল–কতদিন তোমার হাতের রান্না খাইনি।
খাওয়া শেষ করে মামীমার পাশে শুয়ে সমস্ত কথা এক এক বলে গেল মনিরা।
.
পুলিশ ভ্যানগুলো দৃষ্টির অন্তরালে চলে যেতেই একটা ঝোঁপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে বনহুর। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে –হাঃ হাঃ হাঃ–
সে হাসির প্রতিধ্বনি নিস্তব্ধ বনভূমি প্রকম্পিত করে তোলে। গাছের পাতাগুলো যেন থর থর করে কেঁপে ওঠে। পাখিগুলো উড়ে উঠে আকাশে।
বনহুরের হাতে তখনও হাতকড়া পরানো। দক্ষিণ হাতে মিঃ হারুনের সেই রিভলবারখানা ধরা রয়েছে। শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় হিংস্র জন্তু যেমন ভয়ঙ্কর ভাব ধারণ করে, তেমনি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে দস্যু বনহুর!
সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসছে।
বনহুর তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকায় চারদিকে। এখন যে কোন উপায়ে প্রথম তাকে হাত দু’খানা মুক্ত করতে হবে। কিন্তু কি করা যায়?
মাথা নিচু করে ভাবছে, এমন সময় তার কানে ভেসে আসে অশ্ব পদশব্দ। চমকে ফিরে তাকায় বনহুর। দেখতে পায়, যে পথের ওপর সে দাঁড়িয়ে আছে সেই পথ বেয়ে একজন অশ্বারোহী দ্রুত এগিয়ে আসছে।
বনহুর চট করে একটা ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। নিপুণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে। অশ্বারোহী ক্রমান্বয়ে পথ বেয়ে এগিয়ে আসছে, বড় রাস্তার দিকেই যাবে সে।
অশ্বারোহী নিকটবর্তী হতেই বনহুর সন্ধ্যার ঝাপসা অন্ধকারে দেখল, অশ্বারোহীর পিঠে একটা বন্দুক বাঁধা রয়েছে। লোকটার শরীরে শিকারীর ড্রেস। কয়েকটা পাখিও ঝুলছে অশ্বের সম্মুখ ভাগে। বিভীষিকাময় রাত্রির আগমন আশঙ্কায় অশ্বারোহী দ্রুত অশ্ব চালনা করছিল।
বনহুরের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠে। যে কোন উপায়ে এই অশ্বারোহীকে রুখতে হবে।
শিকারী অতি নিকটে পৌঁছে গেছে।
রুদ্ধ নিঃশ্বাসে প্রতীক্ষা করছে বনহুর। অশ্বারোহী তার সম্মুখে আসতেই বনহুর রিভলভার উঁচু করে ধরে চিৎকার করে ওঠে– থামো।
সম্মুখে ভূত দেখার মত চমকে উঠে অশ্বারোহী। ভয়ে থর থর করে কেঁপে ওঠে তার হৃৎপিণ্ড। বিবর্ণ হয়ে ওঠে ওর মুখমণ্ডল। অশ্বের লাগাম টেনে ধরে অশ্ব থামিয়ে ফেলে।
বনহুর রিভলভার উদ্যত করে গম্ভীর কণ্ঠে বলে–ভয় নেই, আমি তোমাকে হত্যা করব না।
শিকারীর চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যার অন্ধকারে সে বনহুরের হাতে হাতকড়া লাগানো দেখেই বুঝতে পারে–এ লোকটি নিশ্চয়ই কোন পলাতক আসামী।
কিন্তু বনহুর শিকারীকে বন্দুকে হাত দিতে দেয় না। বলে ওঠে– খবরদার! ওটাতে হাত দিয়েছ কি মরেছ?
অগত্যা শিকারী ফ্যাকাশে মুখে বলে ওঠে–তুমি কি চাও? আমার কাছে টাকা-পয়সা নেই।
টাকা পয়সা আমি চাই না–চাই তোমার অশ্ব।
অশ্ব!
হ্যাঁ। কিন্তু একেবারে চাই না–আবার তুমি ফেরত পাবে। বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে ওঠে শিকারী–তাহলে আমার ব্যবস্থা কি হবে?
তুমি যদি ভদ্রলোকের মত ব্যবহার কর, তাহলে কথা শেষ না করেই বনহুর দ্রুত পাশের একটা টিলার মত উঁচু জায়গায় উঠে লাফিয়ে পড়ল অশ্বের পিঠে শিকারীর পেছনে। রিভলভার। শিকারীর পিঠে চেপে ধরে চালাও।
অশ্ব আবার ছুটতে শুরু করে।
সরু রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তা ধরে চলতে শুরু করলো তারা।
সম্মুখে ভয়বিহ্বল শিকারী পেছনে দুর্ধর্ষ, দস্যু বনহুর।
প্রায় ঘণ্টা কয়েক চলার পর একটি পল্লীর নিকটে এসে পৌঁছল ওরা। এবার বনহুর শিকারীর পিঠ থেকে বন্দুকখানা খুলে নিয়ে সামনের জলাশয়ের মধ্যে নিক্ষেপ করল। তারপর ওকে অশ্ব থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল– আগামীকাল তুমি এই স্থানে অপেক্ষা করবে, আমি তোমার অশ্ব ফেরত দেব। কিন্তু মনে রেখ, কোনরকম চালাকি করতে গেলে মরবে। আমি ক্ষমা করব না।
শিকারী স্তব্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল–তুমি কে?
বনহুর একটু হেসে জবাব দিল– দস্যু বনহুর।
শিকারী চমকে দু’পা পিছিয়ে গেল, তার কণ্ঠ দিয়ে একটা অস্ফুট শব্দ বের হলো–দস্যু বনহুর!
বনহুর ততক্ষণে অশ্ব ছুটিয়ে চলেছে।
শিকারীর দু’চোখে রাজ্যের বিস্ময়। স্তম্ভিত হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সে।
বনহুর দৃষ্টির বাইরে চলে যেতেই শিকারী ভদ্রলোক ছুটল লোকালয়ের উদ্দেশ্যে। যে দস্যু বনহুরের ভয়ে আজ দেশময় ত্রাহি ত্রাহি ভাব, সেই সেই দস্যু বনহুর আজ তাকে স্পর্শ করে গেল এমনকি একই অশ্বে এতদূর এসেছে তারা দুজনে।
