যে সকল ভাস্কর এই সমুদয় দৃশ্য খোদিত করিয়াছিল, তাহাদের শিক্ষা ও সমাজ খুব উচ্চশ্রেণীর নহে। উত্তীর্ণ পুরুষ ও নারীমূর্ত্তির গঠন অতি সাধারণ, এমনকি কুৎসিত বলাও চলে। তাহাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সৌষ্ঠবহীন এবং অনেক সময় অস্বাভাবিক, পরিধেয় বসন-ভূষণ অতিশয় সংক্ষিপ্ত ও সাধারণ; তাহাদের গতি ও ভঙ্গীর মধ্যে কোনো লাবণ্য বা সুষমা নাই এবং অন্তর্নিহিত কোনো ভাব বা চিন্তা তাহাদের মুখশ্রীতে ফুটিয়া ওঠে নাই। যে সূক্ষ্ম সৌন্দৰ্য্যানুভূতি উচ্চ শিল্পের প্রাণ, এই সমুদয় মূর্ত্তিতে তাঁহার সম্পূর্ণ অভাব। কিন্তু উচ্চাঙ্গের সৌন্দৰ্যবোধ বা প্রকাশের ক্ষমতা না থাকিলেও সংসার ও সমাজের সহিত এই সমুদয় ভাস্করের ঘনিষ্ঠ পরিচয়, নিকট সম্বন্ধ ও নিবিড় সহানুভূতি ছিল, এবং তাহাদের শিক্ষা-দীক্ষা অপরিণত হইলেও পুরুষানুক্রমলব্ধ কৌশল ও স্বাভাবিক নিপুণতার সাহায্যে তাহারা সরল অকৃত্রিমভাবে ইহার পরিচয় দিতে সমর্থ হইয়াছে। সংখ্যায় অগণিত যে সমুদয় সাধারণ শ্রেণীর নর-নারী উচ্চতর শিল্প বা সৌন্দৰ্য্যবোধের দাবি করিত, তাহাদের জন্যই এই সমুদয় শিল্প রচনা। তাহারা যে এই দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পরিচিত দৃশ্যাবলী এবং কাল্পনিক ও বাস্তব জগতের চিত্র বিশেষভাবে উপভোগ করিত, তাহা নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে। এই হিসেবে পাহাড়পুরের এই দৃশ্যাবলী বাংলার প্রাচীন লোকশিল্পের চমৎকার দৃষ্টান্ত বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে।
কিন্তু বাংলায় যে উচ্চশ্রেণীর শিল্পীও ছিল পাহাড়পুরের দ্বিতীয় শ্রেণীর পাথরের ফলকে উত্তীর্ণ মূর্ত্তিগুলিই তাঁহার প্রমাণ। এগুলির সংখ্যা খুব বেশী নহে, এবং ইহারা প্রধানত কৃষ্ণ, বলরাম, শিব, যমুনা প্রভৃতি দেব-দেবীর মূর্ত্তি (চিত্র নং ৯)। ইহার মধ্যে একটি পুরুষ ও নারীর প্রণয়চিত্র (চিত্র নং ৮) অনেকেই রাধাকৃষ্ণের যুগলমূৰ্ত্তি বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন। মূর্ত্তির মস্তকের পশ্চাতে দিব্যজ্যোতির চিহ্ন আছে, অতএব ইহা সাধারণ মনুষ্যমূৰ্ত্তি নহে। কৃষ্ণের জীবনের অনেক দৃশ্য এই মন্দিরগাত্রে আছে। সুতরাং খুব সম্ভবত ইহা কৃষ্ণ ও তাঁহার প্রেয়সীর মূর্ত্তি। কিন্তু এই প্রেয়সী যে রাধা এরূপ মনে করিবার বিশেষ কোনো কারণ নাই। কৃষ্ণ-রাধার প্রেমের কাহিনী মহাভারত ও প্রাচীন পুরাণাদিতে পাওয়া যায় না এবং ইহা যে এই সময়ে প্রচলিত ছিল, তাঁহারও কোনো সন্তোষজনক প্রমাণ নাই। সুতরাং অনেকে মনে করেন যে, ইহা কৃষ্ণের পার্শ্বে রুক্মিণী অথবা সত্যভামার মূর্ত্তি।
এই মূর্ত্তির সহিত পূর্ব্বোক্ত প্রথম শ্রেণীর অন্তর্গত অনুরূপ কয়েকটি প্রণয়িযুগলের মূৰ্ত্তি তুলনা করিলেই শিল্প হিসাবে এ দুয়ের প্রভেদ বুঝিতে পারা যাইবে। মুখশ্রী, দাঁড়াইবার ভঙ্গি, নারীমূৰ্ত্তির ঈষৎ বক্র লীলায়িত দৃষ্টিভঙ্গী ও সলাজ-হাস্য-ফুরিতাধর, হস্তপদাদির গঠন-সৌষ্ঠব, পরিধেয় বসনের রচনাপ্রণালী, এবং সর্বোপরি নর-নারীর প্রেমের যে একটি মাধুৰ্য্য ও মহিমা এই মূর্ত্তির মধ্য দিয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে, এই সমুদয় বিষয় বিবেচনা করিলে, ইহার শিল্পীর শিক্ষা দীক্ষা ও সৌন্দৰ্য্যানুভূতি যে পূর্ব্বোক্ত শিল্পীগণের অপেক্ষা অনেক উচ্চস্তরের সে বিষয়ে সন্দেহ থাকে না। বলরাম ও যমুনার মূর্ত্তির সহিত যম, অগ্নি প্রভৃতির এবং দক্ষিণ প্রাচীরস্থিত শিবমূৰ্ত্তির সহিত অন্যান্য শিবমূর্ত্তির তুলনা করিলেও স্পষ্ট প্রতীয়মান হইবে যে, পাহাড়পুরের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর গুপ্তযুগের গঠন-সৌষ্ঠব, অঙ্গের লাবণ্য ও সুষমা, গতিভঙ্গীর বৈচিত্র্য ও সাবলীল ভাব, অন্তর্নিহিত ভাবের বিকাশে উদ্ভাসিত মুখশ্রী প্রভৃতির স্পষ্ট নিদর্শন দেখা যায়। বাংলার যে সমুদয় শিল্পী এগুলি গড়িয়াছিল গুপ্তযুগের শিল্পই তাহাদের আদর্শ ছিল, এবং স্বাভাবিক প্রতিভা ও কঠোর সাধনা দ্বারা তাহারা তদনুযায়ী শিক্ষা লাভ করিয়াছিল। প্রথম শ্রেণীর শিল্পীদের শিক্ষা ও আদর্শ ছিল সম্পূর্ণ পৃথক। বাংলার পল্লীতে পল্লীতে প্রাচীনকাল হইতে যে শিল্পধারা সহজ ও স্বাভাবিক বিবর্ত্তনের ফলে গড়িয়া উঠিয়াছিল, তাহারা শিশুকাল হইতেই অভ্যস্ত হইয়া তাহাকে রূপ দিয়াছিল।
পাহাড়পুরে কতকগুলি খোদিত প্রস্তর আছে যাহাতে প্রথম শ্রেণীর অপটুতা ও দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষা ও সৌন্দর্যবোধ উভয়ই আংশিকভাবে বর্ত্তমান। কৃষ্ণের কয়েকটি বাল্যলীলা ও কতকগুলি দেব-দেবী ও দিকপালের মূৰ্ত্তি এই শ্রেণীর অন্ত গত। কৃষ্ণের কেশীবধ (চিত্র নং ৭) ইহার একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। বালকৃষ্ণের মূর্ত্তি এবং ইহার সাবলীল গতিভঙ্গী দ্বিতীয় শ্রেণীর শিল্পীর অনুযায়ী, কিন্তু ইহার মুখ চোখের গঠনে পারিপাট্যের যথেষ্ট অভাব। ইন্দ্রের মূর্ত্তির মধ্যেও যথেষ্ট সৌষ্ঠব ও সৌন্দৰ্য্য আছে, কিন্তু ইহার চোখ ও মুখের গঠন অত্যন্ত অস্বাভাবিক। এই সমুদয় কারণে এই খোদিত প্রস্তরগুলি একটি পৃথক বা তৃতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা যাইতে পারে। সম্ভবত বাংলার প্রাচীন শিল্প ও গুপ্তযুগের নূতন আদর্শ এই দুয়ের সংমিশ্রণে ইহার উৎপত্তি হইয়াছিল।
প্রথম শ্রেণীর খোদিত পোড়া-মাটি ও পাথরগুলি যে পাহাড়পুর মন্দিরের সমসাময়িক, সে বিষয়ে সকলেই একমত; কিন্তু কেহ কেহ মনে করেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর খোদিত পাথরগুলি অপেক্ষাকৃত প্রাচীন। সম্ভবত এগুলি কোনো মন্দিরগাত্রে সংলগ্ন ছিল, পরে পাহাড়পুর মন্দিরে ব্যবহার করা হইয়াছে। কিন্তু এই বিভিন্ন শ্রেণীর শিল্প যে বিভিন্ন যুগের নিদর্শন তাহা নিঃসংশয়ে বলা কঠিন। কারণ একই সময়ে বাংলায় বিভিন্ন আদর্শের শিল্প প্রচলিত ছিল, ইহা অসম্ভব নহে। বাংলায় গুপ্তরাজত্ব প্রতিষ্ঠার পর হইতেই গুপ্তশিল্পের প্রভাবও যে এদেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল, এরূপ অনুমান করা যায়। তাঁহার ফলে একদল সম্পূর্ণভাবে এই নূতন আদর্শ গ্রহণ করিয়াছিল, আর একদল নূতন আদর্শ কতকাংশে গ্রহণ করিলেও প্রাচীন পন্থা একেবারে ত্যাগ করে নাই। এই দুই দল এবং অবিকৃত প্রাচীনপন্থিগণ একই সময়ে বর্ত্তমান থাকিতে পারে এরূপ কল্পনা একেবারে অযৌক্তিক নহে।
