.
গ। পোড়া-মাটির শিল্প
প্রাচীন বাংলায় পোড়ামাটির শিল্প খুবই উন্নতি লাভ করিয়াছিল। পাহাড়পুর ব্যতীত আরও অনেক স্থানে, বিশেষত কুমিল্লার নিকটবর্ত্তী ময়নামতী ও লালমাই পৰ্ব্বতে, অনেকগুলি পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গিয়াছে। ইহার মধ্যে কিন্নর (চিত্র নং ১০ ক), বিদ্যাধর (১৩ খ), বিবিধ ভঙ্গীর নারীমূৰ্ত্তি (১০ খ-গ, ১৩ গ-ঘ), অসি ও বর্শ্বহস্তে সৈনিক (১২ ক), ব্যাঘ্ৰ শিকারী (১২ খ), ব্যায়ামকারী (১১ ক), পদ্ম (১১ খ), নানারূপ প্রকৃত ও কাল্পনিক জন্তু ও দেব-দেবীর মূর্ত্তি প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইহার অধিকাংশই পাহাড়পুরের প্রথম শ্রেণীর ন্যায় লোকশিল্পের নিদর্শন বলিয়া গ্রহণ করা যায়। কিন্তু কয়েকটি রচনাভঙ্গি অপেক্ষাকৃত উচ্চাঙ্গের শিল্পজ্ঞানের পরিচায়ক (১০ খ-গ)। ইহাছাড়া অনেক খোদিত ইটও পাওয়া গিয়াছে।
প্রাচীন পুণ্ড্রবর্দ্ধন নগরীর ধ্বংসের মধ্যেও বহু পোড়ামাটির ফলক ও মূর্ত্তি এবং কারুকাৰ্য্য-খোদিত ইট পাওয়া গিয়াছে। ইহার মধ্যে গোবিন্দ-ভিটায় প্রাপ্ত একটি গোলাকৃতি ফলক অথবা চক্রকে খোদিত মিথুনমূৰ্ত্তি (১৫ খ) উৎকৃষ্ট শিল্পকলার নিদর্শন।
বাংলায় প্রস্তর খুব সুলভ না হওয়ায় মৃৎশিল্প খুব বেশী জনপ্রিয় ছিল এবং লোকশিল্প হিসেবে পালযুগে, এবং সম্ভবত তাঁহার বহু পূৰ্ব্বেও, বিশেষ উন্নতিলাভ করিয়াছে। মধ্যযুগেও বাংলার এই জাতীয় শিল্পপ্রতিভার কিছু কিছু নিদর্শন দেখিতে পাওয়া যায়।
.
ঘ। পালযুগের শিল্প
নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ-এই চারি শতাব্দের শিল্পকে পালযুগের শিল্প নামে অভিহিত করা যাইতে পারে। কারণ যদিও দ্বাদশ শতাব্দে সেনরাজগণ বাংলায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছিল এবং বৰ্ম্ম, চন্দ্র প্রভৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজবংশও এই যুগে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করিয়াছেন, তথাপি এই চারি শতাব্দের শিল্প মোটামুটি একই লক্ষণাক্রান্ত এবং পালরাজ্যেই ইহার অভ্যুদয় ও বিকাশ ঘটিয়াছিল।
এই যুগের প্রস্তর ও ধাতুশিল্পের যে সমুদয় নিদর্শন এযাবৎ পাওয়া গিয়াছে, তাঁহার বিষয়বস্তু কেবলমাত্র দেব-দেবীর মূর্ত্তি। বাস্তব সংসার ও সমাজের সহিত ইহার প্রত্যক্ষ কোনো সম্বন্ধ নাই। বিভিন্ন ধর্ম্মগ্রন্থে দেব-দেবীর যে ধ্যান আছে সৰ্ব্বতোভাবে তাঁহার অনুসরণ করিয়া শিল্পীকে এই সমুদয় নিৰ্মাণ করিতে হইত। সুতরাং শাস্ত্রের অনুশাসন নিগড়পাশের ন্যায় শিল্পীর স্বাধীন ইচ্ছা নিয়ন্ত্রিত করিত। শিল্পী বা শিল্পের কোনো অব্যাহত গতি ছিল না। প্রকৃত শিল্প মূর্ত্তির মধ্য দিয়ে তাঁহার কলানৈপুণ্য ও সৌন্দৰ্য্যবোধ প্রকাশ করিতে সমর্থ হইয়াছে ইহাই তাঁহার কৃতিত্ব।
উপকরণ বিষয়েও শিল্পীর খুব স্বাধীনতা ছিল না। অষ্টধাতু ও কালো কষ্টিপাথর, সাধারণত ইহাই ছিল মূর্ত্তি নির্মাণের প্রধান উপাদান। রৌপ্য এবং স্বর্ণও মূর্ত্তি নির্মাণে ব্যবহৃত হইত, কিন্তু এরূপ মূর্ত্তির সংখ্যা খুবই কম। কাষ্ঠনির্ম্মিত মূর্ত্তিও মাত্র কয়েকটি পাওয়া গিয়াছে।
পালযুগের চারিশত বৎসরে শিল্পের অনেক বিবর্ত্তন হইয়াছিল। কিন্তু এই বিবর্ত্তনের ইতিহাস সঠিকরূপে জানিবার উপায় নাই। অধিকাংশ মূৰ্ত্তিরই নির্মাণকাল মোটামুটিভাবেও জানা যায় না। এ পর্য্যন্ত আবিষ্কৃত বহু শত মূর্ত্তির মধ্যে মাত্র পাঁচখানিতে সময়বিজ্ঞাপক লিপি উৎকীর্ণ আছে। ইহার মধ্যে একখানি দশ, দুইখানি একাদশ ও দুইখানি দ্বাদশ শতাব্দের। কোনো এক শতাব্দীর মাত্র একখানি বা দুইখানি মূর্ত্তির সাহায্যে সেই শতাব্দীর বিশিষ্ট শিল্প-লক্ষণ স্থির করা দুঃসাধ্য। সুতরাং কেবলমাত্র শিল্পের ক্রমগতির সাধারণ রীতির দিক দিয়া বিচার করা ছাড়া বাংলার এই যুগের শিল্পবিবর্ত্তনের ইতিহাস জানিবার আর কোনো উপায় নাই। কিন্তু এই সাধারণ রীতিগুলি যথাযথভাবে স্থির করা সহজ নহে, এবং অনেক সময়ে শিল্পীর ব্যক্তিত্ব ও অন্য অনেক বিশিষ্ট কারণে সাধারণ রীতির ব্যতিক্রম বা বিপর্যয় ঘটে। সুতরাং কেবলমাত্র এই রীতি অবলম্বনে রচিত বিবর্ত্তনের ইতিহাস সৰ্ব্বথা নির্ভরযোগ্য নহে। বাংলার শিল্প সম্বন্ধে এইরূপ ইতিহাস রচনার চেষ্টা খুব বেশি হয় নাই। যে দুই-একজন করিয়াছেন তাহাদের মতামত খুব স্পষ্ট নহে এবং সর্ব্বসাধারণে গৃহীত হয় নাই।
রচনাবিন্যাস, গঠনপ্রণালী ও সৌন্দৰ্য্য বিকাশের দিক দিয়া বিচার করিলে এই সমুদয় মূর্ত্তির মধ্যে অনেক শ্রেণীভেদ করা যায়। কিন্তু এই সমুদয় প্রভেদ কতটা স্থান বা কালের প্রভাবে এবং কতটা শিল্পীর ব্যক্তিগত রুচি বা অন্য কোনো কারণে ঘটিয়াছে তাহা নির্ণয় করা কঠিন। এই সমুদয় কারণে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত সম্ভব না হইলেও বাংলার এ যুগের ইতিহাস আলোচনা করিতে গিয়া অনেকেই শিল্প বিবর্ত্তনের দুই-একটি মূলসূত্র অবলম্বন করিয়াছেন। বিবর্ত্তনের দিক দিয়া মূল্য খুব বেশী না হইলেও বিশ্লেষণের দিক হইতে এইগুলি ইতিহাস আলোচনায় প্রয়োজনীয় সন্দেহ নাই।
সাধারণত মূৰ্ত্তিগুলি একটি বড় প্রস্তরখণ্ডের মধ্যস্থল হইতে কাটিয়া বাহির করা হয়। মূল মূর্ত্তিটি কেন্দ্রস্থলে এবং পারিপার্শ্বিক মূৰ্ত্তিগুলি ও বিভূষণাদি এবং চালচিত্র ইহার দুই পার্শ্বে ও উপরে থাকে। প্রথমে মূৰ্ত্তিগুলির গভীরতার এক অৰ্দ্ধ মাত্র পাষাণের উপর উত্তীর্ণ হইত, কিন্তু ক্রমেই এই গভীরতার মাত্রা বৃদ্ধি হয়। পরিশেষে মূল মূর্ত্তিটি প্রায় সম্পূর্ণ আকার লাভ করে এবং এই উদ্দেশ্যে ইহার চতুম্পার্শ্বস্থ পাথর কতকটা একেবারে কাটিয়া ফেলিয়া দেওয়া হয়। আবার প্রথম প্রথম মূল মূর্ত্তিটিই শিল্পীর প্রধান লক্ষ্য থাকে ও দর্শকের প্রায় সমগ্র মনোযোগ আকৃষ্ট করে। ক্রমশ পারিপার্শ্বিক মূর্ত্তিগুলি ও নানাবিধ কারুকার্যে বিভূষিত চালচিত্র অধিকতর প্রাধান্য লাভ করে এবং সুদক্ষ শিল্পীর হস্তে মূল মূর্ত্তির শোভাবর্দ্ধন করে। কিন্তু সর্বশেষ কোনো কোনো স্থলে এইসব পারিপার্শ্বিক মূর্ত্তি ও অলঙ্কারের প্ৰাচুৰ্য্য এত বৃদ্ধি পায় যে মূল মূর্ত্তিটিই অপ্রধান হইয়া পড়ে। অনেকেই মনে করেন যে এই দুইটি পরিবর্ত্তনই খুব সম্ভব প্রধানত কালপ্রবাহের ফলে ঘটিয়াছে; অর্থাৎ উত্তীর্ণ মূৰ্ত্তির অতিরিক্ত গভীরতা এবং পারিপার্শ্বিক মূর্ত্তি ও চালচিত্রে অলঙ্কারের অতিরিক্ত ও অযথা বাহুল্য শিল্পীর অপেক্ষাকৃত অপ্রাচীনতার প্রমাণ। কিন্তু ইহা যে একটি সাধারণ সূত্র হিসেবে গ্রহণ করা যায় না, রাজা গোবিন্দচন্দ্রের নামাঙ্কিত লিপিযুদ্ধ বিষ্ণু ও সূৰ্য্যমূৰ্ত্তির সহিত রাজা তৃতীয় গোপালের চতুর্দ্দশ বৎসরে উত্তীর্ণ সদাশিব-মূৰ্ত্তির তুলনা করিলেই তাহা বুঝা যাইবে।
