.
২. ভাস্কৰ্য্য
ভারতবর্ষে চিরকাল দেবমন্দিরই স্থাপত্য ও ভাস্কৰ্য্যশিল্পের প্রধান কেন্দ্র ছিল। প্রাচীন বাংলায় মন্দির ছিল, সুতরাং ভাস্কর্যের বহু উন্নতি হইয়াছিল। মন্দিরের সঙ্গে সঙ্গে ইহার অধিকাংশই লুপ্ত হইয়াছে। কিন্তু অনেক স্থলে মন্দির বিনষ্ট হইলেও তন্মধ্যস্থ দেবমূৰ্ত্তি রক্ষিত হইয়াছে। বাংলায় যে বহুসংখ্যক দেব-দেবীর মূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে পূর্ব্বেই তাঁহার উল্লেখ করিয়াছি। এই সমুদয় মূর্ত্তি হইতে বাংলার প্রাচীন চারুশিল্পের কতক পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু ইহার অধিকাংশই নবম শতাব্দীর পরবর্ত্তীকালের। ইহার পূর্ব্বে একমাত্র পাহাড়পুর মন্দিরগাত্রেই অনেক ভাস্কর্যের নিদর্শন একত্র পাওয়া যায়। যে সমস্ত ভাস্কর্যের নিদর্শন ইহারও পূৰ্ব্ববর্ত্তীকালে বলিয়া নিঃসন্দেহে গ্রহণ করা যায় তাঁহার সংখ্যা খুবই অল্প।
ক। প্রাচীন যুগ
চন্দ্রবর্ম্মার রাজধানী পুষ্করণা (বাঁকুড়া জিলার পোকৰ্ণা) ও সুপ্রসিদ্ধ প্রাচীন নগরী তাম্রলিপ্তিতে প্রাপ্ত কয়েকখানি উত্তীর্ণ পোড়ামাটি বাংলার সৰ্ব্বপ্রাচীন ভাস্কর্যের নিদর্শন। ইহার একখানিতে একটি যক্ষিনীর মূর্ত্তি আছে। ইহার গঠনপ্রণালী ও বসন-ভূষণ শুঙ্গযুগের মূর্ত্তির অনুরূপ (খৃ. পৃ. প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দী)। মহাস্থানে একটি পোড়ামাটির মূৰ্ত্তি কেহ কেহ মৌর্য যুগের বলিয়া মনে করেন, কিন্তু ইহা এতই অস্পষ্ট যে এ সম্বন্ধে কোনো সঠিক ধারণা করা কঠিন। মহাস্থানের আর একটি পোড়ামাটির মূর্ত্তি সম্ভবত শুঙ্গযুগের।
রাজসাহী জিলার অন্তর্গত কুমারপুর ও নিয়ামপুরে প্রাপ্ত দুইটি সূৰ্য্যমূর্ত্তি এবং মালদহ জিলার হাঁকরাইল গ্রামের বিষ্ণুমূর্ত্তির পোশাক-পরিচ্ছদ ও গঠনপ্রণালী কুষাণযুগের মূর্ত্তির অনুরূপ। বাণগড়ে প্রাপ্ত কয়েকটি পোড়ামাটির মূর্ত্তিতে কুষাণ অথবা তাঁহার অব্যবহিত পরবর্ত্তী যুগের শিল্প-লক্ষণ দেখিতে পাওয়া যায়।
বিহারৈলের বুদ্ধমুর্তি সারনাথের গুপ্তযুগের মূর্ত্তির অবিকল অনুকরণ বলিলেও চলে। কাশীপুরের (সুন্দরবন) ও দেওরার (বগুড়া) সূৰ্য্যমূৰ্ত্তি দুইটিতেও গুপ্তযুগের শেষকালের (ষষ্ঠ শতাব্দী) শিল্প-লক্ষণ বিদ্যমান। ইহাদের মধ্যে কাশীপুরের মূর্ত্তিটি (চিত্র নং ১৫ক) অধিকতর সৌষ্ঠবসম্পন্ন। গুপ্তযুগে পূৰ্ব্ব ভারতীয় মূর্ত্তিগুলিতে যেরূপ সংযম ও গাম্ভীর্য্যের সঙ্গে কমনীয়তা ও ভাবপ্রবণতার অপূৰ্ব্ব সমাবেশ দেখা যায়, এই মূর্ত্তিটিতে তাহা বেশ ফুটিয়া উঠিয়াছে। মহাস্থানের নিকটবর্ত্তী বলাইধাপ ভিটায় সোনার পাতে ঢাকা অষ্টধাতুনির্ম্মিত একটি মঞ্জুশ্রী মূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। এই মূর্ত্তিটি প্রাচীন বাংলার ভাস্কর্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। ইহার গঠনপ্রণালী গুপ্তযুগের আদর্শের অনুযায়ী। এই মূর্ত্তির কমনীয় অথচ শান্ত-সমাহিতভাবে পরিপূর্ণ মুখশ্রী, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের লাবণ্য ও সুষমা, করাঙ্গুলি, অধর-যুগলের ব্যঞ্জনা ও সমগ্র দেহের ভাবপ্রবণতা দেখিলে, প্রাচীন বাংলায় চারুশিল্পের কত দূর উৎকর্ষ হইয়াছিল, তাঁহার ধারণা করা যায়।
এই সমুদয় মূৰ্ত্তি হইতে প্রমাণিত হয় যে, খৃষ্টাব্দের আরম্ভ বা তাঁহার পূর্ব্ব হইতেই বাংলায় ভাস্কর্যের চর্চ্চা ছিল এবং বাংলার শিল্পী গুপ্তযুগ পৰ্য্যন্ত ভারতের সাধারণ শিল্পধারার সহিত যোগ রক্ষা করিয়াই চলিত। ষষ্ঠ শতাব্দীর পূর্ব্বে বাংলার ভাস্কর্যে কোনো বিশিষ্ট প্রণালী বা পরিকল্পনার পরিচয় পাওয়া যায় না। এই পরিচয় প্রথম পাওয়া যায় দেবখড়ের রাণী প্রভাবতীর লিপিযুক্ত সৰ্ব্বাণী ও তাঁহার সহিত প্রাপ্ত একটি ক্ষুদ্র সূৰ্য্যমূৰ্ত্তিতে। এই দুইটি সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে নির্ম্মিত। গুপ্তশিল্পের প্রভাব থাকিলেও, ইহাতে পরবর্ত্তী পালযুগের শিল্প-বৈশিষ্ট্যের সূচনা দেখিতে পাওয়া যায়। চব্বিশ পরগণার অন্তর্গত মণিরহাটে প্রাপ্ত একটি শিবমূৰ্ত্তিও এই শ্রেণীর অন্তর্গত। এই তিনটি মূর্ত্তিই ধাতুনির্ম্মিত।
.
খ। পাহাড়পুর
পাহাড়পুরের মন্দিরগাত্রে যে খোদিত প্রস্তর ও পোড়ামাটির ফলক আছে তাহা হইতে সর্বপ্রথমে বাংলার নিজস্ব ভাস্কৰ্য্যশিল্পের বৈশিষ্ট্যের পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায়। বিষয়বস্তু ও শিল্পকৌশলের দিক দিয়া বিচার করিলে, পাহাড়পুরের ভাস্কৰ্য্য দুই বা তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। প্রথমটি লোকশিল্প এবং দ্বিতীয়টি অভিজাত শিল্প। তৃতীয়টি এ দুয়ের মাঝামাঝি।
প্রস্তরের কয়েকটি ও পোড়া-মাটির সমুদয় ফলকগুলি প্রথম শ্রেণী অথবা লোকশিল্পের অন্তর্ভুক্ত। রামায়ণ-মহাভারতের অনেক কাহিনী ইহাতে খোদিত হইয়াছে। কৃষ্ণের জন্মকথা এবং যে সমুদয় লীলা বাঙ্গালীর চিরপ্রিয় এবং বাংলার প্রতি ঘরে পরিচিত, তাঁহার বহু দৃশ্য ইহাতে আছে (চিত্র নং ৭-৮)। পঞ্চতন্ত্র ও বৃহকথার জনপ্রিয় গল্প ইহার হাস্যরসের আধার যোগাইয়াছে। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও জীবনযাত্রার দৈনন্দিন কাহিনী ইহাতে বিশেষভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে। মেয়েরা নানা ভঙ্গীতে নৃত্য করিতেছে (চিত্র নং ৬), শিশুকে ক্রোড়ে লইয়া জননী কূপ হইতে জল তুলিতেছে অথবা জলের কলসীসহ গৃহে ফিরিতেছে, কৃষক লাঙ্গল কাঁধে করিয়া মাঠে যাইতেছে, বাজিকর কঠিন কঠিন বাজি দেখাইতেছে, শীর্ণকায় সাধু-সন্ন্যাসী কাঁধের উপর কাষ্ঠখণ্ডের সাহায্যে তৈজসপত্র বহন করিয়া লম্বা দাড়ি ঝুলাইয়া নজদেহে চলিয়াছে, পরচুলাপরা দারোয়ান লাঠি ভর দিয়া দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া ঝিমাইতেছে। (চিত্র নং ৫), প্রেমালাপে মত্ত যুবক-যুবতী, পুরুষ ও স্ত্রী বাদ্যকারগণ এবং তাহাদের বাদ্যযন্ত্র, পূজানিরত ব্রাহ্মণ, অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পুরুষ ও নারী, ধনুর্বাণহস্তে রথারোহী যোদ্ধা, পর্ণমাত্ৰ-পরিহিত শবর স্ত্রী-পুরুষের প্রেমালাপ, ধনুহস্তে শবর, মৃত জন্তু হস্তে লইয়া বীরদর্পে পদক্ষেপকারিণী শবর রমণী,-এইরূপ অসংখ্য দৃশ্য শিল্পী খোদাই করিয়াছে। সুপরিচিত পশুপক্ষী পত্রপুষ্প গাছপালাও শিল্পীর দৃষ্টি এড়ায় নাই। দৃশ্যমান জগতের বাহিরেও শিল্পীর কল্পনা বিস্তার লাভ করিয়াছে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, গণেশ, বোধিসত্ত্ব, পদ্মপাণি, মঞ্জুশ্রী, তারা প্রভৃতি দেব-দেবীর মূর্ত্তি আছে, কিন্তু ইহাদের সংখ্যা খুব বেশি নহে। দৈত্য, দানব, নাগ, কিন্নর, গন্ধৰ্ব্ব ও বহু কাল্পনিক জীবজন্তু শিল্পীর হস্তে মূর্ত্তি পরিগ্রহণ করিয়াছে।
