মন্দিরটি ত্রিতল। ইহার ঠিক কেন্দ্রস্থলে একটি চতুষ্কোণ বর্গাকৃতি অংশ সোজা উপরে উঠিয়া গিয়াছে। ইহার চারিধারের প্রাচীর অতিশয় স্কুল ও দৃঢ় এবং প্রাচীরের অভ্যন্তরস্থ স্থান ফাঁকা হইলেও সেখানে প্রবেশ করিবার কোনো উপায় নাই। ত্রিতলে এই বর্গাকৃতি অংশের প্রতি প্রাচীরের সম্মুখভাগে একটী নাটমন্দির ও মণ্ডপ এমনভাবে নির্ম্মিত হইয়াছে যাহাতে ইহার দুই পার্শ্বে প্রাচীরের খানিক অংশ মুক্ত থাকে। ইহার ফলে এই চারিটি প্রসারিত অংশের মধ্যে বর্গাকৃতি অংশের চারিটি কোণ বাহির হইয়া আছে এবং সমস্তটা একটি ক্রসের আকার ধারণ করিয়াছে। এই ক্রসের সীমারেখা অনুযায়ী একটি প্রদক্ষিণপথ ও তাঁহার আবেষ্টনী মন্দিরের চারিদিকে ঘিরিয়া আছে। দ্বিতলের পরিকল্পনা ত্রিতলেরই অনুরূপ-কিন্তু ইহার প্রতিদিকের সম্মুখভাগ খানিকটা প্রসারিত করিয়া আরও দুইটি কোণের সৃষ্টি করা হইয়াছে। একতল দ্বিতলের অনুরূপ, কেবল ইহার উত্তর দিকের একটু অংশ বাড়াইয়া সিঁড়ির জায়গা করা হইয়াছে। সমগ্র মন্দিরটি উত্তর-দক্ষিণে ৩৫৬ ফুট এবং পূর্ব্ব-পশ্চিমে ৩২৪ ফুট দীর্ঘ। যে অংশ অবশিষ্ট আছে তাঁহার উচ্চতা ৭০ ফুট।
এই বিশাল মন্দিরের উপরিভাগ কিরূপ ছিল তাহা জানিবার উপায় নাই। কেহ কেহ অনুমান করেন যে বর্গাকৃতি অংশের উপরে মূল মন্দির ছিল। আবার কেহ কেহ বলেন যে সাধারণ মন্দিরের গর্ভগৃহের ন্যায় কোনো কক্ষ এই মন্দিরে ছিল না-কেবল বর্গাকৃতি অংশের সম্মুখস্থ চারিটি নাটমন্দিরে চারিটি দেবমূর্ত্তি ছিল। জৈন চতুর্মুখ মন্দির ও ব্রহ্মদেশের কোনো কোনো মন্দিরে এইরূপ ব্যবস্থা দেখিতে পাওয়া যায়।
সম্ভবত বর্গাকৃতি অংশের উপর এক উচ্চ শিখর ছিল, এবং যাহাতে এই বিশাল শিখরের ভার বহন করিতে পারে সেই জন্যই বর্গাকৃতি অংশ এমন সুদৃঢ়ভাবে একেবারে নীচ হইতে গাঁথিয়া ভোলা হইয়াছিল। যখন এই বিশাল মন্দিরের উপযোগী উচ্চ শিখর বিদ্যমান ছিল তখন ইহা বহুদূর হইতে গিরিচূড়ার ন্যায় দেখা যাইত, এবং ইহার সৌন্দৰ্য্য, বিশালতা ও গাম্ভীর্য লোকের মনে কিরূপ বিস্ময় উৎপাদন করিত, আজ আমরা কেবলমাত্র কল্পনায় তাহা অনুভব করিতে পারি।
মন্দিরটি ইট-কাদার গাঁথুনিতে তৈরী, অথচ সহস্রাধিক বৎসর পরে আজিও এই ইটের দেওয়াল ৭০ ফুট উঁচু পর্য্যন্ত অবশিষ্ট আছে ইহাই আশ্চর্যের বিষয়। দেওয়ালের মাঝে মাঝে কারুকার্যখোদিত ইটের কার্নিশ এবং দেওয়ালের গায়ে আবদ্ধ তিনটি সারিতে সাজানো পোড়ামাটি ও প্রস্তর ভাস্কর্যের ফলকগুলি এখনো ইহার অতীত শিল্পকলার নিদর্শনরূপে বর্ত্তমান। মন্দিরটি অষ্টম শতাব্দে নির্ম্মিত কিন্তু ইহার গাত্রসংলগ্ন কোনো কোনো ভাস্কৰ্য্য গুপ্তযুগের। সম্ভবত কোনো প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ হইতে এগুলি আহৃত হইয়া পরবর্ত্তীকালের মন্দিরগাত্রে সংলগ্ন করা হইয়াছে।
পাহাড়পুরের মন্দিরের পরিকল্পনা ভারতবর্ষে আর কোনো স্থানে দেখা যায় না, কিন্তু যবদ্বীপ ও ব্রহ্মদেশের কোনো কোনো মন্দির অনেকটা এইরূপ এবং ইহারই অনুকরণে নির্ম্মিত হইয়াছে বলিয়া মনে হয়। পূৰ্বোক্ত বাংলার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর মন্দিরের শিখরও ব্রহ্মদেশে দেখিতে পাওয়া যায়। সুতরাং বঙ্গদেশের অধুনা বিলুপ্ত মন্দিরশিল্প সুদূর প্রাচ্যের হিন্দু উপনিবেশগুলিতে বিশেষ প্রভাব বিস্ত রি করিয়াছিল এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত। বাংলায় প্রাচীন মন্দির খুব বেশি নাই, কিন্তু এই সমুদয় মন্দিরের অংশবিশেষ-স্তম্ভ, চৌকাঠ প্রভৃতি-নানা স্থানে পাওয়া গিয়াছে। দিনাজপুর রাজবাড়ীতে কারুকার্যখচিত একটি প্রস্তরস্তম্ভ আছে। ইহার গাত্রের উত্তীর্ণ লিপি হইতে জানা যায় যে স্তম্ভটি গৌড়াধিপ প্রতিষ্ঠিত একটি শিবমন্দিরের অংশ। এই মন্দিরটি নবম শতাব্দে নির্ম্মিত হইয়াছিল। বীরভূম জিলার অন্তর্গত পাইকোরে দুইটি এবং পাবনা জিলার হাণ্ডিয়াল গ্রামে চারিটি বিচিত্র কারুকার্যে শোভিত প্রস্তরস্তম্ভ পাওয়া গিয়াছে। দিনাজপুরের গরুড় স্তম্ভ ও কৈবৰ্ত্ত স্তম্ভও (চিত্র নং ২৮ ক) এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। বিক্রমপুরের নানা স্থানে প্রস্তর ও কাষ্ঠের স্তম্ভ পাওয়া গিয়াছে। কাষ্ঠের স্তম্ভগুলি জীর্ণ হইলেও তাঁহার গাত্রে উত্তীর্ণ বিচিত্র কারুকার্য এখনো দেখিতে পাওয়া যায়, এবং ইহার শিল্পকলা অতিশয় উচ্চশ্রেণীর। এইরূপ কয়েকটি কাষ্ঠের স্তম্ভ, ব্রাকেট প্রভৃতি ঢাকা যাদুঘরে। রক্ষিত আছে, এবং এইগুলি প্রাচীন বাংলার দারুশিল্পের উৎকৃষ্ট নিদর্শন (চিত্র নং ২৯)। ইহা হইতে আরও প্রমাণিত হয় যে বাংলায় কাষ্ঠনির্ম্মিত অনেক মন্দির ছিল। কালক্রমে সেগুলি ধ্বংস হইয়াছে, কিন্তু তাঁহার যে দুই-একটি ক্ষুদ্র অংশ প্রায় সহস্র বৎসর পরেও টিকিয়া আছে তাহা হইতেই এই মন্দিরগুলির সৌন্দর্য্য সম্বন্ধে কতকটা ধারণা করা যাইতে পারে। স্তম্ভগুলি বাস্তবিক বাংলার বিলুপ্ত মন্দিরশিল্পের স্মৃতিস্তম্ভ।
বাণগড়ের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে আবিষ্কৃত একটি বিশাল কারুকার্যখচিত পাথরের চৌকাঠ এখন দিনাজপুর রাজবাড়ীতে আছে। প্রাচীন গৌড়ে ও রাজসাহী জিলায় কয়েকটি পাথরের চৌকাঠের অংশ পাওয়া গিয়াছে। এগুলির কারুকার্য খুবই উচ্চদরের। স্তম্ভের ন্যায় এই সমুদয় চৌকাঠও প্রাচীন মন্দিরশিল্পের স্মৃতি বহন করিতেছে।
