এই সমুদয় ধ্বংসাবশেষ হইতেই প্রাচীন বাংলার বিহার সম্বন্ধে কতক ধারণা করা যায়।
.
গ। মন্দির
বাংলার প্রাচীনকালের মন্দির প্রায় সকলই ধ্বংস হইয়াছে এ কথা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। কিন্তু কোনো কোনো বৌদ্ধ গ্রন্থের পুঁথিতে কয়েকটি প্রাচীন মন্দিরের ছবি আছে। কতকগুলি প্রস্তরমূর্ত্তিতেও মন্দির উত্তীর্ণ হইয়াছে। এই সমুদয় প্রতিকৃতির সাহায্যে বাংলার প্রাচীন মন্দিরের গঠনপ্রণালী আলোচনা করিলে ছাদের আকৃতি অনুসারে ইহা নিম্নলিখিত চারি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়।
১। এই শ্রেণীর মন্দিরের ছাদ উপর্যুপরি কতকগুলি সামন্তরাল চতুষ্কোণ স্ত রের সমষ্টি। প্রতি দুই স্তরের মধ্যবর্ত্তী ভাগ অন্তর্নিবিষ্ট থাকায় এই স্তরগুলি বেশ পৃথক পৃথক দেখা যায়। স্তরগুলি যত ঊর্ধ্বে উঠিতে থাকে ততই ছোট হয়। গুপ্তযুগের ভাস্কর্যে এই শ্রেণীর মন্দির উত্তীর্ণ হইয়াছে। ইহার পরিণতি দেখা যায় উড়িষ্যার মন্দিরের সম্মুখস্থ জগমোহনে। উড়িষ্যার এই প্রকার ছাদযুক্ত মন্দির ভদ্র অথবা নীড় দেউল নামে অভিহিত হইয়াছে।
২। দ্বিতীয় শ্রেণীর মন্দিরের ছাদ উড়িষ্যার মন্দিরের ন্যায় শিখরে ঢাকা। চতুষ্কোণ গর্ভগৃহের প্রাচীরগাত্র হইতে উচ্চ শিখরের চারিটি ধার উঠিয়া ঈষৎ বাঁকা হইতে হইতে অবশেষে প্রায় সংলগ্ন হইয়া যায়। এই সংযোগস্থল একটি গোলাকার প্রস্তরখণ্ডে (আমলক শিলা) আবদ্ধ করা হয় এবং শিখরের গাত্রে কারুকার্যখচিত অনেক লম্বালম্বি পংক্তি থাকে। এই শ্রেণীর মন্দিরের নাম রেখ-দেউল।
৩-৪। প্রথম শ্রেণীর ভদ্র দেউলের সর্বোচ্চ স্তরের উপর একটি স্তূপ বা শিখর স্থাপিত করিয়া এই দুই শ্রেণীর মন্দিরের সৃষ্টি হইয়াছে। কোনো কোনো স্থলে এই স্তূপ বা শিখর কেবল সর্বোচ্চ স্তরের উপরে নহে, প্রতি স্তরের কোণে এবং সম্মুখ ভাগেও দেখা যায়।
বৌদ্ধ পুঁথির চিত্র ও প্রস্তরমূৰ্ত্তি হইতে জানা যায় যে, প্রাচীন বাংলায় এই চারি শ্রেণীর মন্দির ছিল। তবে শেষোক্ত দুই শ্রেণীর কোনো প্রাচীন মন্দির এ পর্য্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই। কিন্তু পরবর্ত্তীকালে নির্ম্মিত দিনাজপুরের অন্তর্গত কান্তনগরের মন্দির চতুর্থ শ্রেণীর মন্দিরের একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন বলিয়া গণ্য করা যাইতে যারে। ব্রহ্মদেশে এইরূপ মন্দির আছে। বাঁকুড়ার এক্তেশ্বর মন্দিরের অঙ্গনে নন্দীর যে ক্ষুদ্র একটি মন্দির আছে, প্রথম শ্রেণীর মন্দিরের তাহাই একমাত্র নিদর্শন। এতদ্ব্যতীত বাংলায় যে কয়েকটি প্রাচীন মন্দির আছে তাহা সকলই দ্বিতীয় শ্রেণীর। ইহার মধ্যে বর্দ্ধমানের অন্তর্গত বরাকরে একটি, ও বাঁকুড়ার অন্তর্গত দেহারে দুইটি, মোট তিনটি প্রস্তরে গঠিত, অবশিষ্ট ককেটি ইষ্টকনিৰ্মিত। এই মন্দিরগুলির শিখর পূর্ব্বোক্ত বর্ণনানুযায়ী ও উড়িষ্যার মন্দিরের অনুরূপ। হিন্দু যুগে এই শ্রেণীর মন্দির উত্তর ভারতের সর্বত্র দেখা যাইত।
বরাকরের ৪ নং মন্দিরটি (চিত্র নং ৩) ইহাদের মধ্যে সর্বপ্রাচীন। ইহার অপেক্ষাকৃত উচ্চ গর্ভগৃহ, অনুচ্চ শিখরভাগ এবং আমলক শিলার আকৃতি অনেকটা ভুবনেশ্বরের প্রাচীন পরশুরামেশ্বর মন্দিরের ন্যায়, এবং ইহা সম্ভবত ঐ সময় অর্থাৎ অষ্টম শতাব্দে নির্ম্মিত।
বড় বড় মন্দিরের অনুকরণে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মন্দিরও নির্ম্মিত হইত। রাজসাহী জিলার অন্তর্গত নিমদীঘি এবং দিনাজপুরের অন্তর্গত বাণগড়ে এইরূপ প্রস্তরনির্ম্মিত দুইটি এবং চট্টগ্রামের অন্তর্গত ঝেওয়ারিতে ব্ৰঞ্জনির্ম্মিত একটি মন্দির (চিত্র নং ৪) পাওয়া গিয়াছে। এগুলির গঠনপ্রণালী একই রকমের এবং সম্ভবত বরাকর মন্দিরের অনতিকাল পরেই এই সমুদয় নির্ম্মিত হয়। এই যুগের বৃহৎ শিখরযুক্ত মন্দির কিরূপ কারুকার্যখচিত ছিল এই সমুদয় দেখিলে তাহা অনেকটা অনুমান করা যায়। গর্ভগৃহের চতুর্দিকে চারিটি ত্রিভঙ্গিম খিলানযুক্ত কুলুঙ্গি, শিখরগাত্রে অলঙ্কাররূপে চৈত্যগবাক্ষের ব্যবহার, এবং শিখরের উপরিভাগে চারি কোণে সিংহমূৰ্ত্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পরবর্ত্তীকালের মন্দিরগুলিতে খোদিত কারুকাৰ্য্য অনেক বেশি। শিখরের কোণগুলি পালিশ করায় ইহা অধিকতর গোলাকার দেখা যায় এবং শিখরগাত্রে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিখরের প্রতিমূর্ত্তি উত্তীর্ণ করা হয়। মন্দিরের প্রবেশপথের সম্মুখস্থ পুরু দেওয়ালের মধ্যে একটু ছোট নাটমন্দিরের মতো কক্ষ যোগ করাও এগুলির আর একটি বিশেষত্ব। দেউলিয়ার (বর্দ্ধমান) মন্দির, বহুলারার (বাঁকুড়া) সিদ্ধেশ্বর মন্দির (চিত্র নং ২৭ ক), (সুন্দরবনের জটার দেউল) এবং দেহারের (বাঁকুড়া) সরেশ্বর ও সল্লেশ্বরের মন্দির বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথম তিনটি ইষ্টক ও শেষোক্ত দুইটি প্রস্তরে নির্ম্মিত। সিদ্ধেশ্বর মন্দিরের কারুকার্য বাংলার মন্দিরশিল্পের সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে।
পাহাড়পুরের বিহারের অঙ্গনের ঠিক কেন্দ্রস্থলে একটি বিশাল মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে (চিত্র নং ৩১)। ইহার ঊর্ধ্বভাগ বিলুপ্ত হওয়ায় এই মন্দিরটি কোন শ্রেণীর অন্তর্গত ছিল তাহা জানিবার উপায় নাই। কিন্তু ইহার নিচের যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাহা ভারতবর্ষের অন্যান্য মন্দির হইতে সম্পূর্ণ পৃথক।
