বাংলায় যে সকল স্তূপ দেখা যায় তাহা সাধারণত ক্ষুদ্রাকৃতি। পুণ্য অর্জনের জন্য দরিদ্র ভক্তগণ এইগুলি নিৰ্মাণ করিত।
ঢাকা জিলার আসরফপুর গ্রামে রাজা দেবখগের তাম্রশাসনের সহিত যে ব্ৰঞ্জ বা অষ্টধাতুনির্ম্মিত একটি স্তূপ পাওয়া গিয়াছে তাহাই সম্ভবত বাংলার সর্বপ্রাচীন স্তূপের নিদর্শন (চিত্র নং ২৬)। ইহার চতুষ্কোণ অধোভাগ ও হৰ্ম্মিকা এবং গোলাকার মেধির চতুর্দিকে নানা দেব-দেবীর মূর্ত্তি উৎকীর্ণ। স্তূপটির মেধি ও অণ্ড একটি ঘণ্টার মতো দেখায়। পাহাড়পুর ও চট্টগ্রামের অন্তর্গত ঝেওয়ারিতে আরও দুইটি ধাতুনির্ম্মিত স্তূপ পাওয়া গিয়াছে।
১০১৫ অব্দে লিখিত একখানি বৌদ্ধ গ্রন্থের পুঁথিতে বরেন্দ্রের মৃগস্থাপন-স্তূপের একটি চিত্র আছে। চীনদেশীয় পরিব্রাজকগণ সপ্তম শতাব্দীতেও এই স্তূপটি দেখিয়াছিলেন। এই চিত্র হইতে সেকালেরর স্তূপের আকৃতি বেশ বোঝা যায়। এই স্তূপের অধোভাগ ছয়টি স্তরে বিভক্ত এবং প্রতিস্তরটি একটি প্রস্ফুটিত পদ্মের আকার। অণ্ড অংশ ঈষৎ দীর্ঘাকৃতি এবং ইহার চতুর্দিকে চারিটি কুলুঙ্গির অভ্যন্তরে চারিটি বুদ্ধমূর্ত্তি। চতুষ্কোণ হৰ্ম্মিকার উপর বহুসংখ্যক ছত্র।
বৌদ্ধ গ্রন্থের পুঁথিতে বাংলার আরও দুই-তিনটি স্থূপের ছবি আছে। ইহার একটি তুলাক্ষেত্রে ‘বর্দ্ধমান স্তূপ’। ইহার অধোভাগ নানা কারুকার্যে শোভিত ও চারিটি স্তরে বিভক্ত, এবং ইহার মেধি উৰ্দ্ধ ও অধোমুখ দুই দল বিকশিত পদ্মের আকৃতি।
পাহাড়পুর ও বহুলাড়ায় (বাঁকুড়া) বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইষ্টকস্থূপের অধোভাগ আবিষ্কৃত হইয়াছে (চিত্র নং ৩১)। এগুলি গোল, চতুষ্কোণ অথবা ক্রসের আকার। বিহারের প্রাচীন স্তূপ ও পূর্ব্বোক্ত বাংলার স্তূপের চিত্রের অধোভাগের সহিত ইহাদের অনেকের নিকট সাদৃশ্য দেখা যায়। সুতরাং এই সমুদয় অধোভাগের উপর যে সমুদয় স্তূপ নির্ম্মিত হইয়াছিল তাহা দেখিতে বিহারের স্তূপ এবং মৃগস্থাপন অথবা বর্দ্ধমান স্তূপের ন্যায় ছিল এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।
জোগী-গুফা নামক স্থানে পাথরের একটি ছোট স্তূপ পাওয়া গিয়াছে। ইহার মেধি ও অণ্ড অংশের উচ্চতা তাহাদের ব্যাসের তিন গুণ। সুতরাং মেধি অণ্ড ও ছত্রাবলী মিলিয়া ইহা একটি সুদীর্ঘ চূড়ার ন্যায় দেখায়, ইহাকে স্তূপ বলিয়া প্রথমে কিছুতেই মনে হয় না। ইহাকে বাংলার স্তূপের শেষ বিবর্ত্তন বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে।
.
খ। বিহার
সপ্তম শতাব্দীর পূর্ব্বেই যে বাংলায় বৌদ্ধ ভিক্ষুগণের বাসের জন্য অনেক বিহার ছিল এবং ইহার কোনো কোনোটি বেশ বড় ও কারুকার্যখচিত ছিল, চীনদেশীয় পরিব্রাজকগণের বিবরণ হইতে তাহা জানা যায়। স্তূপের ন্যায় এগুলিও ধ্বংস হইয়াছে। কিন্তু রাজসাহীর অন্তর্গত পাহাড়পুর নামক স্থানে একটি বিশাল বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হওয়ায় প্রাচীন বাংলার এই শ্রেণীর স্থাপত্যের সম্বন্ধে কতকটা ধারণা করা সম্ভবপর হইয়াছে।
একখানি তাম্রশাসন হইতে জানা যায় যে, পঞ্চম শতাব্দীতেও এখানে একটি জৈন বিহার ছিল। সম্ভবত কালক্রমে ইহা নষ্ট হইয়া যায়। অষ্টম শতাব্দীতে ধর্ম্মপাল এখানে যে প্রকাণ্ড বিহার নির্মাণ করেন, সোমপুর মহাবিহার নামে তাহা ভারতের সর্বত্র এবং ভারতের বাহিরেও বৌদ্ধজগতে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই প্রকাণ্ড বিহারের চতুষ্কোণ অঙ্গনটি প্রতিদিকে ২০০ গজ দীর্ঘ ছিল। (চিত্র নং ৩০)। অঙ্গনটি উচ্চ প্রাচীরে ঘেরা ছিল এবং অঙ্গনের চারিদিকেই এই প্রাচীরগাত্রে ভিক্ষুগণের বাসের জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কক্ষ নির্ম্মিত হইয়াছিল। এই সমুদয় কক্ষের সংখ্যা ১৭৭। প্রতি কক্ষ প্রায় সাড়ে তেরো ফুট দীর্ঘ ছিল। কক্ষগুলির সম্মুখ দিয়ে আট-নয় ফুট চওড়া প্রশস্ত বারান্দা সমস্ত অঙ্গনটি ঘিরিয়া বিস্তৃত ছিল; এবং চারিদিকে চারিটি সিঁড়ি দিয়া বারান্দা হইতে অঙ্গনে নামা যাইত। প্রাচীরের উত্তর দিকে এই বিহারের প্রধান প্রবেশপথ অথবা সিংহদরজা ছিল। ইহার পশ্চাতেই একটি প্রকাণ্ড স্তম্ভযুক্ত প্রশস্ত দালান ছিল। এই দালান হইতে আর একটি ক্ষুদ্রতম স্তম্ভযুক্ত দালানের মধ্য দিয়া পূর্ব্বোক্ত কক্ষ শ্রেণীর সম্মুখস্থ বারান্দায় পৌঁছানো যাইত। দক্ষিণ, পূর্ব্ব ও পশ্চিম বারান্দায় ঠিক মধ্যস্থলে, অঙ্গনে নামিবার সিঁড়ির পশ্চাতেও এইরূপ কয়েকটি অতিরিক্ত কক্ষ ছিল। সমুদয় কক্ষগুলি হইতে জল নিঃসারণের জন্য পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা ছিল। বিস্তৃত অঙ্গনের ঠিক মধ্যস্থলে একটি প্রকাণ্ড মন্দির ছিল (চিত্র নং ৩১)। এই মন্দির ও চতুস্পার্শ্বস্থ কক্ষগুলির মধ্যবর্ত্তী বিস্তৃত আঙ্গিনায় ছোট ছোট স্তূপ, মন্দির, কূপ, স্নানাগার, রন্ধনশালা ভোজনালয় প্রভৃতি ছিল। ভারতবর্ষে এ পর্য্যন্ত যত বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে তাঁহার মধ্যে এই সোমপুর বিহারই সর্বাপেক্ষা বৃহৎ। এই বিহারটি যখন সম্পূর্ণ ছিল তখন ইহার বিশালত্ব ও সৌন্দর্য্য লোকের মনে বিস্ময় উৎপাদন করিত। একখানি সমসাময়িক লিপিতে ইহা “জগতাং নেকৈবিশ্রাম-ভূ” (জগতে নয়নের একমাত্র বিরামস্থল অর্থাৎ দর্শনীয় বস্তু) বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। ইহার মহাবিহার নাম সার্থক ছিল।
সম্প্রতি কুমিল্লার নিকটবর্ত্তী ময়নামতী নামক অনুচ্চ পর্বতমালায় কয়েকটি বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে। উহার খননকার্য এখনো আরম্ভ হয় নাই, কিন্তু প্রাথমিক পরীক্ষার ফলে একজন পুরাতত্ত্ববিৎ সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে পাহাড়পুরের বিহার ও মন্দির অপেক্ষাও বৃহত্তর বিহার ও মন্দিরাদি এইখানে ছিল।
