ব্যবসায়-বাণিজ্যে উন্নত বাংলা দেশে কড়ির ব্যবহার ছিল, ইহাতে আশ্চৰ্য্য বোধ করিবার কোনো কারণ নাই। ভারতবর্ষে কড়ি প্রচলনের কথা ফাহিয়ান উল্লেখ করিয়াছেন। বাংলার চর্যাপদেও ইহার উল্লেখ আছে। ১৭৫০ অব্দে কলিকাতা শহরে ও বাজারে কড়ির ব্যবহার প্রচলিত ছিল। কিন্তু তথাপি গুপ্তযুগের পরবর্ত্তী বাংলার প্রসিদ্ধ রাজবংশগুলির, বিশেষত পাল ও সেনরাজগণের আমলে মুদ্রার অভাবের প্রকৃত কারণ কী-এ প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর দেওয়া সম্ভবপর নহে।
২০. শিল্পকলা
বিংশ পরিচ্ছেদ – শিল্পকলা
১. স্থাপত্যশিল্প
প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যশিল্পের ইতিহাস লেখা অতিশয় কঠিন, কারণ হিন্দু যুগের প্রাসাদ, স্তূপ, মন্দির, বিহার প্রভৃতির কোনো চিহ্ন এক প্রকার নাই বলিলেই চলে। ফাহিয়ান ও হুয়েন সাংয়ের বিবরণ এবং প্রাচীন শিলালিপি ও তাম্রশাসনগুলি আলোচনা করিলে কোনো সন্দেহ থাকে না যে, হিন্দু যুগে বাংলায় বিচিত্র কারুকার্যখচিত বহু হৰ্ম ও মন্দির এবং স্তূপ ও বিহার প্রভৃতি ছিল। কিন্তু এ সমুদয়ই ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। প্রাচীন প্রশস্তিকারেরা উচ্ছ্বসিত ভাষায় যে সমুদয় বিশাল গগনস্পর্শী মন্দির ‘ভূ-ভূষণ’, ‘কুল-পৰ্বত-সদৃশ’ অথবা সূর্যের গতিরোধকারী’ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন, আজ তাঁহার চিহ্নমাত্রও নাই। দ্বাদশ শতাব্দীতেও সন্ধ্যাকরনন্দী বরেন্দ্রভূমিতে যে সমুদয় ‘প্রাংশু-প্রাসাদ’, মহাবিহার এবং কাঞ্চন-খচিত হৰ্ম্ম ও মন্দির দেখিয়াছিলেন, তাহা সবই কালগর্ভে বিলীন হইয়াছে। বাংলার স্থপতি-শিল্পের কীৰ্ত্তি আছে কিন্তু নিদর্শন নাই।
এদেশে প্রস্তর সুলভ নহে, তাই অধিকাংশ নির্মাণকার্য্যেই ইটের ব্যবহার হইত। আর্দ্র বায়ু, অতিরিক্ত বৃষ্টি, বর্ষা ও নদী প্লাবনের ফলে ইষ্টক শীঘ্রই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বৈদেশিক আক্রমণকারীর অত্যাচারেও অনেক বিনষ্ট হইয়াছে। প্রকৃতি ও মানুষ উভয়ে মিলিয়া বাংলার প্রাচীন শিল্পসম্পদ ভূপৃষ্ঠ হইতে বিলুপ্ত করিয়া দিয়াছে।
সামান্য কয়েকটি ভগ্নপ্রায় মন্দির এই বিশ্বগ্রাসী ধ্বংসের হস্ত হইতে কোনো রকমে আত্মরক্ষা করিয়া এখনো দাঁড়াইয়া আছে। জঙ্গল-পরিপূর্ণ মৃৎস্তূপ খনন করিয়া পুরাতত্ত্ব-অনুসন্ধিৎসুগণ কোনো কোনো অতীত কীৰ্ত্তির জীর্ণ ধ্বংসাবশেষ আবার লোকচক্ষুর গোছর করিয়াছেন। ইহারাই বাংলার অতীত শিল্প-সম্পদের শেষ নিদর্শন। ইহাদের উপর নির্ভর করিয়াই বাংলার স্থাপত্যশিল্পের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস রচনা করিতে হইবে। কিন্তু এ ইতিহাস নহে, ইতিহাসের কঙ্কাল মাত্র। বাংলার প্রাচীন শিল্প-সমৃদ্ধি এবং তাঁহার অতুলনীয় কীর্তি ও গৌরবের ক্ষীণ প্রতিধ্বনিও ইহার মধ্য দিয়ে ফুটিয়া উঠিবে কি না সন্দেহ।
.
ক। স্তূপ
বৌদ্ধস্তূপই ভারতের সর্বপ্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন। ভগবান বুদ্ধের অস্থি বা ব্যবহৃত বস্তু রক্ষা করিবার জন্যই প্রথম স্তূপের পরিকল্পনা হয়। পরে বিশেষ বিশেষ ঘটনা চিরস্মরণীয় করিবার জন্য যে যে স্থানে তাহা ঘটিয়াছিল সেখানে স্তূপ নির্ম্মিত হইত। বৌদ্ধদের পূর্ব্বেও হয়তো এই প্রথা ছিল-এবং পরে জৈনরাও স্তূপ নির্মাণ করিত। কিন্তু বৌদ্ধগণের মধ্যেই স্তূপ বিশেষ বিখ্যাত ছিল। বৌদ্ধগণ স্তূপকে পবিত্র মন্দিরের ন্যায় জ্ঞান করিত এবং পরবর্ত্তীকালে তাহারা স্তূপকেও পূজা ও অর্চনা করিত। স্তূপ নির্মাণ ও উৎসর্গ করা অতিশয় পুণ্য কাৰ্য্য বলিয়া বিবেচিত হইত। এই সমুদয় কারণে যেখানেই বৌদ্ধধর্ম্ম প্রসারলাভ করিয়াছে সেইখানেই ক্ষুদ্র ও বৃহৎ অসংখ্য স্তূপ নির্ম্মিত হইয়াছে। বাংলা দেশেও অনেক স্তূপ নির্ম্মিত হইয়াছিল।
স্তূপের তিনটি অংশ। সৰ্ব্বপ্রাচীন স্থূপে অনুচ্চ গোলাকৃতি অধোভাগের উপর গম্বুজাকৃতি মধ্যম অথবা প্রধান অংশ এমনভাবে নির্ম্মিত হইত যাহাতে অধোভাগের কতকটা স্থান মুক্ত থাকে এবং ইহার উপর দিয়া গম্বুজের চারিদিকে ঘুরিয়া আসা যায়। এই উন্মুক্ত অংশ ভক্তগণের প্রদক্ষিণপথস্বরূপ ব্যবহৃত হইত। গম্বুজের উপর প্রথমত চতুষ্কোণ হৰ্ম্মিকা ও তাঁহার উপর একটি গোলাকৃতি চাকা থাকিত।
কালক্রমে স্তূপের আকৃতি ক্রমশই দীর্ঘাকার হইতে থাকে। অধোভাগ অনেকটা পিপার আকার ধারণ করে এবং মধ্যভাগের অর্দ্ধবৃত্তাকার গম্বুজও ক্রমশ দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হয়। উপরের গোলচাকার সংখ্যাও বাড়িয়া যায় এবং পর পর ছোট হইতে হইতে সর্ব্বশেষ চাকাটি প্রায় বিন্দুতে পরিণত হয়। স্তূপের এই তিন অংশের নাম মেধি, অণ্ড ও ছত্রাবলী। ক্রমে এই তিন অংশের নীচে একটি অপোভাগ সংযুক্ত হয়। এই অধোভাগ চতুষ্কোণ, এবং ইহার প্রতি দিকের মধ্যভাগে খানিকটা অংশ সম্মুখে প্রসারিত থাকে। কোনো কোনো স্থলে এই প্রসারিত অংশের খানিকটাও আবার সম্মুখে প্রসারিত হয়। এইরূপ এক বা একাধিক প্রসারের ফলে অধোভাগ ক্রমশ ক্রসের আকার ধারণ করে। ক্রমশ নিচের এই ক্ৰসাকৃতি অধোভাগ ও মেধি এবং উপরের অসংখ্য ছত্রাবলীই প্রাধান্য লাভ করে, এবং এ দুয়ের মধ্যকার অংশ অণ্ড-এককালে যাহা স্তূপের প্রধান অংশ বলিয়া বিবেচিত হইত-আর দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে না। স্তূপগুলিও প্রায় মন্দির চূড়া বা শিখরের আকার ধারণ করে।
হুয়েন সাং লিখিয়াছেন যে পুণ্ড্রবর্দ্ধন, সমতট ও কর্ণসুবর্ণের যে যে স্থানে গৌতমবুদ্ধ ধর্মোপদেশ করিয়াছিলেন সেই সেই স্থানে মৌৰ্য্যসম্রাট অশোক নির্ম্মিত স্তূপগুলিও তিনি দেখিয়াছিলেন। ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে হুয়েন সাংয়ের সময়ও বাংলার এমন বহু প্রাচীন স্তূপ ছিল যাহা লোকে অশোকের তৈরি বলিয়া বিশ্বাস করিত। কিন্তু বাস্তবিকই গৌতমবুদ্ধ যে ঐ সমুদয় স্থান পরিদর্শন করিয়াছিলেন, এবং ইহার স্মরণার্থ অশোক ঐ সকল স্তূপ নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন, অন্য প্রমাণ না পাওয়া পর্য্যন্ত কেবল হুয়েন সাংয়ের উক্তির উপর নির্ভর করিয়া ইহার কোনোটিই বিশ্বাস করা যায় না। অশোকের কথা দূরে থাকুক, হুয়েন সাংয়ের সময়কার কোনো স্তূপের ধ্বংসাবশেষও অদ্যাবধি বাংলায় আবিষ্কৃত হয় নাই।
