প্রস্তর ও ধাতুশিল্প যে এদেশে কত দূর উন্নতি লাভ করিয়াছিল তাহা শিল্প অধ্যায়ে দেখানো হইয়াছে। মৃৎশিল্পেরও কিছু কিছু পরিচয় পাহাড়পুর প্রভৃতি স্থানের পোড়ামাটির কাজে এবং অসংখ্য তৈজসপত্রে পাওয়া যায়। সেকালে বিলাসিতার উপকরণ যোগাইবার জন্য স্বর্ণকার, মণিকার প্রভৃতির শিল্পও উন্নতি লাভ করিয়াছিল। কৰ্ম্মকার ও সূত্রধর গৃহ, নৌকা, শকট প্রভৃতি নিৰ্মাণ করিত এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার নানা উপকরণ যোগাইত। কাষ্ঠশিল্প যে একটি উচ্চ সূক্ষ্মশিল্পে উন্নীত হইয়াছিল, শিল্প অধ্যায়ে তাঁহার কিছু পরিচয় দেওয়া হইয়াছে। হস্তীদন্তের কাজও আর একটি উচ্চশ্রেণীর শিল্প ছিল।
বাংলার শিল্পীদের সংঘবদ্ধ জীবনের কিছু কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম-সার্থবাহ, প্রথম-কুলিক প্রভৃতি এইরূপ সংঘের প্রধান ছিলেন ইহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। বিজয়সেনের দেওপাড়া লিপিতে উক্ত হইয়াছে যে, রাণক শূলপাণি ‘বারেন্দ্র-শিল্পী-গোষ্ঠী-চূড়ামণি’ ছিলেন। বারেন্দ্রে শিল্পীগণের এই গোষ্ঠী যে এটি বিধিবদ্ধ সংঘ ছিল, এরূপ অনুমান করাই সঙ্গত। এইরূপ সংঘবদ্ধ শিল্পীজীবনের ফলেই বাংলা দেশের নানা শিল্পী ক্রমশ বিভিন্ন বিশিষ্ট জাতিতে পরিণত হইয়াছে। তন্তুবায়, গন্ধবণিক, স্বর্ণকার, কৰ্ম্মকার, কুম্ভকার, কংসকার, শংখকার, মালাকার, তক্ষক, তৈলকার প্রভৃতি প্রথমে বিভিন্ন শিল্পী-সংঘ মাত্র ছিল, পরে ক্রমে ক্রমে সমাজে এক একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিয়া এক একটি বিভিন্ন জাতিতে পরিণত হইয়াছে-সকলেই এই মত গ্রহণ করিয়াছেন। সুতরাং বাংলার এই সমুদয় জাতিবিভাগ হইতে তৎকালের বিভিন্ন শিল্প, বৃত্তি ও ব্যবসায়ের প্রকৃষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।
.
৩. বাণিজ্য
শিল্পের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় বাণিজ্যেরও প্রসার হইয়াছিল। বাংলায় বহু নদ-নদী থাকায় শিল্পজাত দ্রব্যাদি দেশের নানা স্থানে প্রেরণের যথেষ্ট সুবিধা ছিল। এই কারণে বাংলার নানা স্থানে হাট ও গঞ্জ এবং নতুন নতুন নগর গড়িয়া উঠিয়াছিল। স্থলপথে যাইবার জন্য বড় বড় রাস্তা ছিল এবং প্রাচীন নগরগুলিও বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হইয়াছিল। হট্টপতি, শৌল্কিক, তরিক প্রভৃতি কর্ম্মচারীদের নাম হইতে বুঝা যায় যে, শিল্প ও বাণিজ্য হইতে রাজ্যের যথেষ্ট আয় হইত।
বাংলার বাণিজ্য কেবল দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। স্থল ও জলপথে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের সহিত ইহার দ্রব্যবিনিময় হইত। খুব প্রাচীনকাল হইতেই সমুদ্রপথেও বাংলার বাণিজ্য-ব্যবসায় চলিত। খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দে একজন গ্রীক নাবিক লিখিত একখানি গ্রন্থ হইতে জানা যায় যে, গঙ্গা নদীর মোহনায় গঙ্গে নামক বন্দর ছিল,-বণিকেরা সেখান হইতে জাহাজ ছাড়িয়া হয় সমুদ্রের উপকূল ধরিয়া দক্ষিণ ভারত ও লঙ্কাদ্বীপ যাইত, অথবা সোজাসুজি সমুদ্র পাড়ি দিয়া সুবর্ণভূমি অর্থাৎ ব্রহ্মদেশ, মালয় উপদ্বীপ, যবদ্বীপ, সুমাত্রা প্রভতি দেশে যাইত। সূক্ষ্ম মসলিন কাপড়, মুক্তা ও নানা প্রকার গাছগাছড়া এদেশ হইতে চালান যাইত। পরবর্ত্তীকালে তাম্রলিপ্তি-বর্ত্তমান তমলুক-বাংলার প্রধান বন্দর হইয়াছিল। এখান হইতে বাঙ্গালীর জাহাজ দ্রব্যসম্ভার-পরিপূর্ণ হইয়া পৃথিবীর সুদূর প্রদেশে যাইত এবং তথা হইতে ধন ও দ্রব্যাদি সংগ্রহ করিয়া ফিরিত।
খৃষ্টপূৰ্ব দ্বিতীয় শতাব্দে অথবা তাঁহার পূর্ব্বে স্থলপথে আসাম ও ব্রহ্মের মধ্য দিয়া বাংলার সহিত চীন আসাম প্রভৃতি দেশের বাণিজ্য-সম্বন্ধ ছিল। দুর্গম হিমালয়ের পথ দিয়াও নেপাল, ভুটান ও তিব্বতের সহিত বাংলার বাণিজ্য চলিত।
এইরূপ শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারের ফলে বাংলার ধনসম্পদ ও ঐশ্বৰ্য্য প্রচুর বাড়িয়াছিল।
.
৪. প্রাচীন মুদ্রা
ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের ন্যায় সম্ভবত খৃষ্টজন্মের চারি-পাঁচশত বৎসর পূর্ব্বেই বাংলায় মুদ্রার প্রচলন আরম্ভ হইয়াছিল। কারণ ভারতবর্ষের সর্ব প্রাচীন ছাপ-কাটা (Punch marked) মুদ্রা বাংলায় অনেক পাওয়া গিয়াছে, এবং এখানকার সৰ্ব্বপ্রাচীন মৌর্যযুগের লিপিতে মুদ্রার উল্লেখ আছে।
বাংলায় কুষাণযুগের মুদ্রা অল্প কয়েকটি পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু গুপ্তযুগের স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা বহু-সংখ্যায় পাওয়া যায়। এই যুগে যে এই সমুদয় মুদ্রার বহুল প্রচলন ছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই। প্রাচীন লিপিতে দীনার ও রূপক এই দুই প্রকার মুদ্রার নাম পাওয়া যায়। সম্ভবত স্বর্ণমুদ্রার নাম ছিল দীনার ও রৌপ্যমুদ্রার নাম ছিল রূপক। ১৬ রূপক এক দীনারের সমান ছিল।
গুপ্তযুগের অবসানের পরে বাংলার স্বাধীন রাজগণ গুপ্তমুদ্রার অনুকরণে স্বর্ণমুদ্রা প্রচলিত করেন কিন্তু তাঁহাদের কোনো রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া যায় নাই। এই সমুদয় স্বর্ণমুদ্রার গঠন অনেক নিকৃষ্ট এবং ইহাতে খাদের পরিমাণও অনেক বেশি।
পালরাজগণ প্রায় চারিশত বৎসর এদেশে রাজত্ব করেন, কিন্তু তাঁহাদের মুদ্রা বড় বেশী পাওয়া যায় নাই। পাহাড়পুরে তিনটি তাম্রমুদ্রা পাওয়া গিয়াছে, ইহার একদিকে একটি বৃষ ও অপরদিকে তিনটি মাছ উৎকীর্ণ। কেহ কেহ অনুমান করেন যে, এগুলি পালসাম্রাজ্যের প্রথম যুগের মুদ্রা। ‘শ্রী বিগ্র’ এই নামযুক্ত কতকগুলি তামা ও রূপার মুদ্রা পাওয়া যায়। অনেকে মনে করেন যে, এগুলি বিগ্রহপালের মুদ্রা। পালযুগের লিপিতে দ্রম্ম নামক মুদ্রার উল্লেখ আছে, সেইজন্য ঐ মুদ্রাগুলি বিগ্রহদ্রম্ম নামে অভিহিত হয়। এই স্বল্পসংখ্যক মুদ্রা ব্যতীত পালযুগের আর কোনো মুদ্রা আবিষ্কৃত না হওয়ায় এই যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা আমাদের নিকট অনেকটা জটিল হইয়া উঠিয়াছে। সেনযুগের লিপিতে পুরাণ ও কপর্দকপুরাণ নামে মুদ্রার উল্লেখ আছে। সম্ভবত একই প্রকার মুদ্রা এই দুই নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু সেনরাজগণের কোনো মুদ্রা এ পর্য্যন্ত পাওয়া যায় নাই। মীনহাজুদ্দিন লক্ষ্মণসেনের দানশীলতার উল্লেখ করিয়া লিখিয়াছেন যে, তিনি কাহাকেও লক্ষ কৌড়ির কম দান করিতেন না। ইহা হইতে অনুমান হয় যে, তখন মুদ্রার পরিবর্তে কৌড়ি অথবা কড়ির প্রচলন ছিল। কিন্তু তাহা হইলে কপর্দক পুরাণের অর্থ কী? কেহ কেহ বলেন যে, ইহা কড়ির আকারে নির্ম্মিত রৌপ্যমুদ্রা। কিন্তু এরূপ একটি মুদ্রাও এযাবৎ পাওয়া যায় নাই। এইজন্য কেহ কেহ মনে করেন যে, কপর্দকপুরাণ বাস্তবিক কোনো মুদ্রার নাম নহে, একটি কাল্পনিক সংজ্ঞা মাত্র, এবং ইহাতে নির্দিষ্টসংখ্যক কড়ি বুঝাইত। এই রৌপ্যমুদ্রার পরিমাণে দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ হইত, কিন্তু বাস্ত বিক পক্ষে তদনুযায়ী কড়ি গুণিয়া দ্রব্যাদি কেনা হইত।
