পুরুষ বা স্ত্রী কেহই কোনোরূপ শিরোভূষণ ব্যবহার করিত না। কিন্তু উভয়ের সুদীর্ঘ কুঞ্চিত কেশদাম নিপুণ কৌশলে বিন্যস্ত হইত। পুরুষদের চুল বাবরির ন্যায় কাঁধের উপর ঝুলিয়া পড়িত, মেয়েরা নানা রকম খোঁপা বাঁধিত।
সেকালের সাহিত্যে চামড়ার জুতা, কাঠের খড়ম এবং ছাতার উল্লেখ আছে। বাংলার প্রস্তুরমূর্ত্তিতে কেবল যোদ্ধাদের পায়ে কখনো কখনো জুতা দেখা যায়। সম্ভবত ইহা সাধারণত ব্যবহৃত হইত না। কয়েকটি মূর্ত্তিতে ছাতার ব্যবহার দেখা যায়।
মেয়েরা বিবাহ হইলে কপালে সিন্দুর পরিত। তাছাড়া চরণদ্বয় অলক্তক, ও নিম্নাধর সিন্দুর দ্বারা রঞ্জিত করিত। কুঙ্কুমাদি নানা গন্ধ দ্রব্যের ব্যবহার ছিল।
সেকালে নানাবিধ ক্রীড়াকৌতুক ছিল। পাশা ও দাবা খেলা এবং নৃত্য-গীত অভিনয়ের খুব প্রচলন ছিল। চৰ্য্যাপদে নানাবিধ বাদ্যযন্ত্রের নাম আছে। পাহাড়পুরের খোদিত ফলকে নানা প্রকার বাদ্যযন্ত্র দেখিতে পাওয়া যায়। বীণা, বাঁশী, মৃদঙ্গ, করতাল, ঢাক-ঢোল প্রভৃতি তো ছিলই, এমনকি মাটির ভাণ্ডও বাদ্যযন্ত্ররূপে ব্যবহৃত হইত। পুরুষেরা শিকার, মল্লযুদ্ধ, ব্যায়াম ও নানাবিধ বাজীকরের খেলা করিত। মেয়েরা উদ্যান-রচনা, জলক্রীড়া প্রভৃতি ভালোবাসিত।
গরুর গাড়ি ও নৌকাস্থল ও জলপথের প্রধান যানবাহন ছিল। ধনী লোকেরা হস্তী, অশ্ব, রথ, অশ্ব-শকট প্রভৃতি ব্যবহার করিত। বিবাহের পর বর গরুর গাড়ীতে বধূকে লইয়া বাড়ী ফিরিতেন। গরুর গাড়ী কিংশুক ও শাল্মলী কাষ্ঠে নির্ম্মিত হইত। গ্রামের লোকেরা ভেলা ব্যবহার করিত।
১৯. অর্থনৈতিক অবস্থা
১৯. ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ – অর্থনৈতিক অবস্থা
১. কৃষি
বাংলা চিরকালই কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের লোকেরা বেশীর ভাগ গ্রামে বাস করিত এবং গ্রামের চতুস্পার্শ্বস্থ জমি চাষ করিয়া নানা শস্য ও ফলাদি উৎপাদন করিত। এখনকার ন্যায় তখনো ধান্যই প্রধান শস্য ছিল, এবং ইহার চাষের প্রণালীও বর্ত্তমানকালের ন্যায়ই ছিল। খুব প্রাচীনকাল হইতেই এখানে ইক্ষুর চাষ হইত। ইক্ষুর রস হইতে প্রচুর পরিমাণে চিনি ও গুড় প্রস্তুত হইত এবং বিদেশে চালান হইত। কেহ কেহ এরূপও অনুমান করিয়াছেন যে, অধিক পরিমাণে গুড় হইত বলিয়াই এদেশের নাম হইয়াছিল গৌড়। তুলা ও সর্ষপের চাষও এখানে বহুল পরিমাণে হইত। পানের বরজও অনেক ছিল। বহু ফলবান বৃক্ষের রীতিমতো চাষ হইত। ইহার মধ্যে নারিকেল, সুপারি, আম, কাঁঠাল, ডালিম, কলা, লেবু, ডুমুর প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
যাহারা চাষ করিত জমিতে তাহাদের স্বত্ব কিরূপ ছিল, রাজা অথবা জমিদারকে কী হারে খাজনা দিতে হইত, ইত্যাদি বিষয়ে কোনো সঠিক বিবরণ জানা যায় না। সম্ভবত রাজাই দেশের সমস্ত জমির মালিক ছিলেন এবং যাহারা চাষ করিত বা অন্য প্রকারে জমি ভোগ করিত তাহাদের কতকগুলি নির্দিষ্ট কর দিতে হইত। রাজা মন্দির প্রভৃতি ধৰ্ম্ম-প্রতিষ্ঠান এবং ব্রাহ্মণকে প্রতিপালন করিবার জন্য জমি দান করিতেন। এই জমির জন্য কোনো কর দিতে হইত না এবং গ্রহীতা বংশানুক্রমে ইহা চিরকাল ভোগ করিতেন। অনেক সময় ধনীরা রাজদরবার হইতে পতিত জমি কিনিয়া এইরূপ উদ্দেশ্যে দান করিতেন এবং তাহাও নিষ্কর ও চিরস্থায়ী বলিয়া গণ্য হইত।
তখনকার দিনে নল দিয়া জমি মাপ করা হইত। বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে নলের দৈর্ঘ্য ভিন্ন ভিন্ন রকমের ছিল। সমতটীয়-নল এবং বৃষভশঙ্ক নলে’র উল্লেখ পাওয়া যায়। সম্ভবত প্রথমটি সমতট প্রদেশ এবং দ্বিতীয়টি বৃষভশঙ্কর উপাধিধারী সেন-সম্রাট বিজয়সেনের নাম হইতে উদ্ভূত। প্রাচীন গুপ্তযুগে জমির পরিমাণ-সূচক কুল্যবাপ ও দ্রোণবাপ এই দুইটি সংজ্ঞা ব্যবহৃত হইত। কুল্যবাপ শব্দটি কুলা অর্থাৎ কুল্য হইতে উৎপন্ন এবং এক কুলা বীজ দ্বারা যতটুকু জমি বপন করা যায় তাহাকেই সম্ভবত কুল্যবাপ বলা হইত। অবশ্য ক্রমে ইহার একটি পরিমাণ নির্দিষ্ট হইয়াছিল। কুল্যবাপ শব্দটি এখনো একেবারে লোপ পায় নাই। কাছাড় জিলায় এখনো কুল্যবায় এই মাপ প্রচলিত আছে। ইহা ১৪ বিঘার সমান। কুল্যবায় যে কুল্যবাপেরই রূপান্তর সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই, কিন্তু প্রাচীনকালে কুল্যবাপের পরিমাণ কত ছিল তাহা বলা কঠিন। কেহ কেহ মনে করেন যে, ইহা প্রায় তিন বিঘার সমান ছিল। কিন্তু অনেকের বিশ্বাস যে কুল্যবায় ইহার অপেক্ষা অনেক বড় ছিল। কুল্যবাপের আট ভাগের এক ভাগকে দ্রোণবাপ বলা হইত। পরবর্ত্তীকালে কুল্যবাপের পরিবর্তে পাটক অথবা ভূপিটক শব্দের ব্যবহার দেখিতে পাওয়া যায়। এই পাটক ৪০ দ্রোণের সামন ছিল। এতদ্ব্যতীত আঢ়ক অথবা আঢ়বাপ, উম্মান অথবা উদান এবং কাক অথবা কাকিনিক প্রভৃতি শব্দ জমির পরিমাণ সূচিত করিবার জন্য ব্যবহৃত হইত-কিন্তু ইহার কোনটির কী পরিমাণ ছিল তাহা জানা যায় না।
.
২. শিল্প
বাংলা কৃষিপ্রধান দেশ হইলেও এখানে নানাবিধ শিল্পজাত দ্রব্য প্রস্তুত হইত। বস্ত্রশিল্পের জন্য এদেশ প্রাচীনকালেই প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে ক্ষৌম, দুকূল, পত্রোণ ও কাঁপাসিক এই চারি প্রকার বস্ত্রের উল্লেখ আছে। ক্ষৌম শণের সূতায় প্রস্তুত মোটা কাপড়; কাশী ও উত্তরবঙ্গে ইহা নির্ম্মিত হইত। এই জাতীয় সূক্ষ্ম কাপড়ের নাম দুকূল। কৌটিল্য লিখিয়াছেন, বঙ্গদেশীয় দুকূল শ্বেত ও স্নিগ্ধ, পুণ্ড্রদেশীয় দুকূল শ্যাম ও মণির ন্যায় স্নিগ্ধ। পত্রোর্ণ রেশমের ন্যায় একজাতীয় কীটের লালায় তৈরী। মগধ ও উত্তরবঙ্গে এই জাতীয় বস্ত্র প্রস্তুত হইত। কাঁপাসিক অর্থাৎ কাঁপাসতুলার কাপড়ের জন্যও বঙ্গ প্রসিদ্ধ ছিল। এইরূপে দেখা যায় যে, খুব প্রাচীনকালেই বাংলার বস্ত্রশিল্প যথেষ্ট উন্নতি লাভ করিয়াছিল। খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দে বাংলা হইতে বহু পরিমাণ উৎকৃষ্ট সূক্ষ্ম বস্ত্র বিদেশে চালান যাইত। বাংলার যে মসলিন ঊনবিংশ শতাব্দী পর্য্যন্ত সমগ্র জগতে বিখ্যাত ছিল, অতি প্রাচীন যুগেই তাঁহার উদ্ভব হইয়াছিল।
